নতুন সরকারের তিন অগ্রাধিকার

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে প্রথম বৈঠক : নীতি, নির্দেশনা ও প্রতিশ্রুতির বার্তা

নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পরই প্রশাসনিক গতি ও নীতিগত অগ্রাধিকার স্পষ্ট করতে প্রথম দিনেই একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি ও বৈঠক সম্পন্ন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বাংলাদেশ সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার সদস্য ও উপদেষ্টাদের নিয়ে অনুষ্ঠিত প্রথম বৈঠকে সরকার প্রাথমিকভাবে তিনটি জরুরি অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেছে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং বিদ্যুৎ-জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা।

ইকবাল মজুমদার তৌহিদ
Printed Edition
সচিবালয়ে নতুন মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান : নয়া দিগন্ত
সচিবালয়ে নতুন মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান : নয়া দিগন্ত

নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পরই প্রশাসনিক গতি ও নীতিগত অগ্রাধিকার স্পষ্ট করতে প্রথম দিনেই একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি ও বৈঠক সম্পন্ন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বাংলাদেশ সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার সদস্য ও উপদেষ্টাদের নিয়ে অনুষ্ঠিত প্রথম বৈঠকে সরকার প্রাথমিকভাবে তিনটি জরুরি অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেছে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং বিদ্যুৎ-জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা।

শপথের পরদিনই এমন দ্রুত কার্যক্রম সরকারের তাৎক্ষণিক সমস্যা মোকাবেলা ও জনজীবনে স্বস্তি ফেরানোর প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রথম বৈঠক : তিন অগ্রাধিকার, ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা

বুধবার বিকেলে সচিবালয়ের এক নম্বর ভবনে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে নতুন মন্ত্রিসভার সদস্য ও উপদেষ্টাদের প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, আগামী ১৮০ দিনের জন্য একটি অগ্রাধিকারভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হবে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখা, জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহে কোনো বিঘœ না ঘটানো।

বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সরকারের প্রথম দায়িত্ব মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে স্বস্তিদায়ক করা। দ্রব্যমূল্য ও সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরো উন্নত করা এবং বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাই এখন তাৎক্ষণিক লক্ষ্য।

তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন জানান, সামনে পবিত্র রমজান থাকায় ইফতার ও তারাবির সময় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং বাজারদর নিয়ন্ত্রণে বিশেষ নজর দেয়া হবে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা দু-এক দিনের মধ্যে নিজ নিজ খাতভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করবেন।

সচিবদের প্রতি নির্দেশনা : ‘অ্যাফিলিয়েশন নয়, মেধাই বিবেচ্য’

মন্ত্রিসভার বৈঠকের পরপরই প্রধানমন্ত্রী সব সচিবের সাথে আলাদা বৈঠক করেন। সেখানে তিনি স্পষ্ট বার্তা দেন জনগণ নির্বাচনী ইশতেহারের ভিত্তিতে রায় দিয়েছে, তাই সংবিধান ও আইনের কাঠামোর মধ্যে থেকে দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য উদ্যোগ নিতে হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী সচিবদের উদ্দেশে বলেছেন, “কে কোন দলের, কার কী সম্পৃক্ততা- এসব নয়, কাজের ক্ষেত্রে মেধা ও পেশাদারিত্বই হবে একমাত্র মানদণ্ড।”

ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এ এস এম সালেহ আহমেদও জানান, নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে প্রশাসনের সমন্বিত ও পেশাদার ভূমিকা নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী সহযোগিতা চেয়েছেন।

শ্রদ্ধা ও শপথের প্রতীকী সূচনা

প্রধানমন্ত্রীর প্রথম কর্মদিবস শুরু হয় জাতীয় ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর মধ্য দিয়ে। সকালে তিনি ও মন্ত্রিসভার সদস্যরা সাভারে অবস্থিত জাতীয় স্মৃতিসৌধে মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

স্মৃতিসৌধের পরিদর্শন বইয়ে প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘ মন্তব্যে লেখেন- ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের পর জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে প্রতিষ্ঠিত গণতন্ত্রের এই নতুন যাত্রা শহীদদের স্বপ্ন পূরণের ধারাবাহিকতা। তিনি দেশের সার্বভৌমত্ব, মানবিকতা ও গণতন্ত্র রক্ষার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন এবং শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন।

এরপর রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে জিয়াউর রহমানের মাজারে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন তিনি। সেখানে নীরবতা পালন ও দোয়া-মুনাজাতে অংশ নেন। বিএনপির ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় এ কর্মসূচিকে দলীয় ও রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলেও দেখছেন পর্যবেক্ষকরা।

প্রথম অফিস, প্রথম নির্দেশ

দুপুরের পর সচিবালয়ে নিজ দফতরে যোগ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী প্রশাসনিক কাজ শুরু করেন। বিকেলে মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে তিনি স্পষ্টভাবে নির্দেশ দেন- নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে, অপ্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা কমিয়ে বাস্তব কাজে মনোযোগ দিতে হবে।

অর্থ প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি জানান, প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির ব্যাপারে ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি ঘোষণা করেছেন। তাঁর ভাষায়, সরকারকে ‘ক্লিন গভর্নমেন্ট’ হিসেবে গড়ে তুলতে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের ক্ষমতার অপব্যবহার কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে।

তিনি আরো বলেন, রমজান উপলক্ষে বাজার নিয়ন্ত্রণ, বিদ্যুৎ সরবরাহ, জনস্বস্তি নিশ্চিত করা- এসব এখন তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার। পাশাপাশি কৃষকদের জন্য ফ্যামিলি কার্ড, ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের ভাতা, স্থানীয় নির্বাচনসহ মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বার্তা

প্রধানমন্ত্রীর প্রথম দিনের কর্মসূচি কয়েকটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে- জনগণের নিত্যজীবনকেন্দ্রিক সমস্যা সমাধানে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ; প্রশাসনে পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহিতা; দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সময়সীমাভিত্তিক পরিকল্পনা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকারের সাফল্য নির্ভর করবে ঘোষিত অগ্রাধিকারগুলো কত দ্রুত দৃশ্যমান ফল দিতে পারে তার ওপর। বিশেষ করে দ্রব্যমূল্য ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতিতে দ্রুত উন্নতি এলে সরকারের প্রতি জন-আস্থা বাড়বে।

প্রথম দিনেই দ্রুত সিদ্ধান্ত ও কর্মতৎপরতা দেখিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পষ্ট করেছেন- নতুন সরকারের লক্ষ্য কেবল ক্ষমতায় বসা নয়, বরং কার্যকর শাসন প্রতিষ্ঠা করা। এখন দেখার বিষয়, এই ঘোষিত অগ্রাধিকার কত দ্রুত বাস্তবে প্রতিফলিত হয়।