নেপথ্যে দেশী-বিদেশী চক্র জড়িত

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করে উগ্রবাদী কর্মকাণ্ড চালাতেন আল আমিন

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের একটি মাদরাসায় বিস্ফোরণের পর ধ্বংস্তূপে পরিণত হওয়ার ঘটনায় পলাতক প্রধান আসামি আল আমিনের বিষয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে। গোয়েন্দাদের তথ্যানুযায়ী আল আমিন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করে উগ্রবাদী কর্মকাণ্ড চালাতেন। দেশকে অস্থিতিশীল করে তুলতে দেশী-বিদেশী চক্রের সাথে আঁতাত করে বিস্ফোরকদ্রব্য মজুদের পর ভয়ঙ্কর পরিকল্পনায় লিপ্ত থাকার একাধিক যোগসূত্র পেয়েছে গোয়েন্দারা।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছে, ঘটনার পর থেকে আল আমিন পলাতক থাকলেও এখন পর্যন্ত সাতজনকে গ্রেফতার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তার মধ্যে আলা আমিনের এক ঘনিষ্ঠ সহযোগীও রয়েছে।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, গত শনিবার রাতে আহসান উল্লাহ ওরফে হাসান নামে একজনকে র‌্যাব আটকের পর গতকাল পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে। গত শনিবার কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদের মাদরাসায় যখন বিস্ফোরণ ঘটে তখন সেখান থেকে সটকে বেলা দেড়টায় হাসানের বাসায় উঠেন আল আমিন। বিকেল ৫টা পর্যন্ত হাসানের বাসায় সময় কাটান। সেখান থেকে পালিয়ে যান। মাঝে এই সাড়ে তিন ঘণ্টা হাসান মোবাইলে বিভিন্ন জায়গায় যোগোযোগ করেছেন।

গোয়েন্দা সূত্র আরো জানায়, ভারতের কোনো উগ্রবাদীর সংশ্লিষ্টতায় দীর্ঘদিন পরিকল্পনার পর দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে বড় নাশকতার সৃষ্টি করতে চেয়েছিল। পলাতক আল আমিনের মোবাইল ফোন বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে রয়েছে। মোবাইলে ভারতের উগ্রবাদী সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ভিডিও ও সন্দেহভাজন নম্বর পাওয়া গেছে। এ ছাড়াও অতীতে যারা সন্ত্রাস দমন আইনে গ্রেফতার হয়ে বর্তমানে কারামুক্ত আছেন তাদের সাথেও নিয়োমিত যোগাযোগ রয়েছে আলামিনের।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, হাসানের মোবাইলেও বিভিন্ন সন্ত্রাসী কার্যকলাপের তথ্য পাওয়া গেছে। তার বিরুদ্ধে স্ত্রীকে হত্যার অভিযোগে মামলা রয়েছে। ওই মামলায় সে গ্রেফতার হওয়ার পর জেলখানায় বসেই পরিচয় হয় আল আমিনের সাথে। সেখান থেকে জামিনে বেরিয়ে হাসানের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। জানা গেছে, আহসান উল্লাহ ওরফে হাসান দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে ফুটপাথের ব্যবসায়ী ছিলেন। হাসানসহ আরো তিনজনকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। অন্যরা হলেন, আবু বক্কর সিদ্দিক (২৮) ও দর্জি আমিন (৪২)। এই দুইজনের গ্রামের বাড়ি বাগেরহাটে ফকিরহাট এলাকায়। এ ছাড়াও শফিউর রহমান নামে (৪৫) একজনকে মুগদা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

স্বজনদের সাথে ছিল না যোগাযোগ : আল আমিনের গ্রামের বাড়ি বাগেরহাটের মোল্লারহাটের সারুলিয়া বারইগাতীতে। গ্রামে বৃদ্ধ বাবা-মা থাকলেও সেখানে যাতায়াত ছিল কম। বাবা কৃষক এবং মা গৃহিণী। আল আমিনের শ্বশুরবাড়িতেও তেমন যাতায়াত ছিল না। স্ত্রীর সাথে সম্পর্কের অবনতি থাকলেও ওই মাদরাসায় তিনি নিয়মিত থাকতেন। তবে স্ত্রী মাদরাসার ছাত্রী এবং পর্দানশীল হওয়ায় আল আমিনের সাথে বনিবনা ছিল কম। নামাজের কথা বলা হলে স্ত্রীর ওপর নির্যাতন চালাতেন। বিভিন্ন নারীদের সাথে অনৈতিক সম্পর্ক ছিল। নামাজে ছিলেন না বিশ্বাসী। মুখে দাঁড়ি রাখার পরামর্শ দিলে এবং ইমানের পথে আসার কথা বলা হলে স্ত্রীকে বলতেন তোমার ধর্ম সঠিক নয়, তুমি আমার সাথে আধুনিক পথে আসো। এই নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে টানাপড়েন চলত। স্বজনদের সাথেও প্রায় বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ছিলেন।

কেরানীগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো: সাইফুল ইসলাম জানান, বিস্ফোরণের ঘটনায় আল আমিন শেখসহ মোট সাতজনের নাম উল্লেখ এবং আরো কয়েকজন অজ্ঞাতনামা আসামির বিরুদ্ধে থানা একটি মামলা করা হয়েছে। গত শুক্রবার সকালে হাসনাবাদ হাউজিং এলাকায় উম্মাল কুরা ইন্টারন্যাশনাল মাদরাসা ভবনে ভয়াবহ এই বিস্ফোরণ হয়। এতে ভবনের দু’টি কক্ষের দেয়াল ও ছাদের কিছু অংশ বিধ্বস্ত হয়েছে। এ ঘটনায় দুই শিশু আহত হয়েছে। পলাতক আল আমিনের আট মাসের শিশুর অবস্থা সঙ্কটাপন্ন। তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।

পুলিশ জানায়, ২০২২ সাল থেকে বাগেরহাটের আল আমিন ওই ভবনের দু’টি কক্ষে মাদরাসা পরিচালনা করতেন। মাদরাসায় ২৫-৩০ জন শিক্ষার্থী ছিল। বিস্ফোরণে আল আমিন ও তার স্ত্রী আসিয়ার দুই শিশু সন্তান আহত হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। তাদের প্রথমে স্থানীয় আদ-দ্বীন হাসপাতাল ও পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

গত শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) মিজানুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, বিস্ফোরণের পর পুলিশ সেখানে গিয়ে রাসায়নিক দ্রব্য, চারটি ককটেল সদৃশ বস্তু, একটি ল্যাপটপ ও দু’টি মনিটর জব্দ করে। সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট ও অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিট ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে বলেও জানান তিনি। এ ঘটনায় সে সময় আল আমিনের স্ত্রী আছিয়া, আছিয়ার ভাবী ইয়াছমিন আক্তার ও আসমানী খাতুন ওরফে আসমাকে আটক করে পুলিশ।

পুলিশ সুপার বলেন, ‘ধ্বংসস্তূপ থেকে ৪০০ লিটারের মতো হাইড্রোজেন-পার-অক্সাইড জাতীয় রাসায়নিক পদার্থ পাওয়া গেছে। ধারণা করা যায় তারা রাসায়নিক দ্রব্য দিয়ে কিছু একটা করছিল। কোথা থেকে এসব আনা হয়েছে, কী করা হচ্ছিল পরিবারের লোকজনের কাছে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

ওই ভবনের মালিক পারভিন বেগম বলেন, ২০২২ সালের এপ্রিলে আমি বাসাটি ভাড়া দেই হারুনের কাছে। তার পর থেকে তারা সেখানে মাদরাসা পরিচালনা করছিল। আমাকে প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা বুঝিয়ে দিত আল আমিন।