আগামীকাল শুক্রবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইশতেহার দেবে বিএনপি। বেলা ৩টায় রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এই ইশতেহার তুলে ধরবেন। ইশতেহার প্রকাশ অনুষ্ঠানে কূটনীতিকসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার বিশিষ্টজনদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। বিএনপি চেয়ারম্যানের প্রেসসচিব সালেহ শিবলি গত রাতে এ তথ্য জানিয়েছেন।
দলীয় সূত্র জানিয়েছে, এবারের ইশতেহার তৈরি হয়েছে বিএনপি ঘোষিত ৩১ দফা, জুলাই সনদ, নির্বাচনী জনসভায় দেয়া তারেক রহমানের বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক দিকনির্দেশনার সমন্বয়ে। ইশতেহারে তরুণ, কৃষক ও শ্রমিকদের স্বার্থ বেশি প্রাধান্য দেয়া হয়েছে । দুর্নীতি নির্মূল, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তিই হবে দলটির মূল লক্ষ্য। নতুন ভোটারদের কাছে টানতে বিশেষ কর্মসূচিও থাকবে ইশতেহারে।
জানা গেছে, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ বিএনপির মূল প্রতিশ্রুতি মূলত আটটি। সামাজিক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, যুব ও নারীর ক্ষমতায়ন, চাহিদাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা এবং পরিবারবান্ধব নীতিমালা এগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে বাস্তবমুখী এসব কর্মসূচি বিএনপি এরই মধ্যে জনগণের সামনে উন্মুক্ত করেছে। ইশতেহারে এগুলো সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে। এ ছাড়া সুদসহ কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করা, ভারতের ফারাক্কার বিপরীতে ‘পদ্মা ব্যারাজ’ নির্মাণ, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নসহ অঞ্চলভিত্তিক বিদ্যমান বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের নানা প্রতিশ্রুতিও থাকছে।
নির্বাচনী শাসনব্যবস্থা পুনর্গঠন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ, মানবাধিকার রক্ষা ও দুর্নীতিবিরোধী কাঠামো শক্তিশালীকরণ ইশতেহারের কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। দলের নীতিনির্ধারকরা জানিয়েছেন, জনগণকে রাষ্ট্রের মালিকানা ফিরিয়ে দেয়া এবং দলীয় প্রভাবমুক্ত প্রশাসন গড়ে তোলাই হবে বিএনপির অঙ্গীকার।
বিএনপি নেতারা আশা করছেন, ৩১ দফা, জুলাই সনদ ও টার্গেট গ্রুপভিত্তিক প্রতিশ্রুতি-এ তিনের সমন্বিত ইশতেহার জনাকাক্সক্ষা পূরণে সক্ষম হবে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের বিষয়টি সরাসরি তত্ত্বাবধান করেছেন তারেক রহমান। ইশতেহারের স্লোগান হিসেবে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ গুরুত্ব পেয়েছে।
বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ এ বিষয়ে বলেন, মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে বাস্তবমুখী বিভিন্ন কর্মসূচি আমরা ইতোমধ্যে জনগণের সামনে উন্মুক্ত করেছি। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে এগুলো গুরুত্ব পাবে। ইশতেহারের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে দেশের ভেঙে পড়া রাষ্ট্রকাঠামো ও শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণ এবং সাংবিধানিক সংস্কারের মধ্য দিয়ে আমাদের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও গণতন্ত্রকে সুসংহত করা; সর্বোপরি দেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করা।
সংবিধান ও রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কার এবং অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে ২০২৩ সালের ১৩ জুলাই ৩১ দফা রূপরেখা ঘোষণা করে বিএনপি। ইশতেহারে বিএনপির এই ৩১ দফার মূল বিষয় হিসেবে অবাধ নির্বাচন, নির্দলীয় সরকারের অধীনে ভোট, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, মানবাধিকার সুরক্ষা, বাকস্বাধীনতা, স্বচ্ছ প্রশাসন এবং জাতীয় অর্থনীতি পুনরুদ্ধার বিশদভাবে অন্তর্ভুক্ত হবে। এ ছাড়া জুলাই সনদের আলোকে নির্বাচন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে পূর্ণ স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা দেয়ার পরিকল্পনাও ইশতেহারে গুরুত্ব পাবে।
দলটির ইশতেহারে কওমি মাদরাসা উন্নয়ন, ইসলামিক গবেষণা তহবিল গঠন, ধর্মীয় শিক্ষার আধুনিকায়ন ও ধর্মচর্চার বাধাহীন পরিবেশ নিশ্চিত করার অঙ্গীকার থাকবে। ইশতেহারে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের সম্পত্তি দখল রোধে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল, নিরাপত্তা সেল, উৎসবে রাষ্ট্রীয় সহায়তা এবং সাম্প্রদায়িক হামলা প্রতিরোধে কঠোর কার্যক্রম চালুর প্রতিশ্রুতি যুক্ত হবে।
যুবসমাজকে টার্গেট করে বিএনপি বড় পরিসরে কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি যুক্ত করেছে ইশতেহারে। এর মধ্যে রয়েছে- সরকারে গেলে প্রথম ১৮ মাসে এক কোটি নতুন চাকরি, স্টার্টআপ ফান্ড, আইটি প্রশিক্ষণ, বিদেশে নতুন শ্রমবাজার ও মাদকবিরোধী টাস্কফোর্স। তারেক রহমানের ভাষায়, নতুন বাংলাদেশ গড়বে যুবসমাজ; চাকরির সঙ্কট নয়, দক্ষতার ভিত্তিতে বৈশ্বিক সুযোগ সৃষ্টি করবে বিএনপি।
কৃষি ও কৃষককে গুরুত্ব দিয়ে ইশতেহার চূড়ান্ত করা হচ্ছে। এর মধ্যে কৃষি উপকরণের দাম কমানো, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত, কৃষিঋণ সহজ করা এবং ধান-চাল কেনার স্বচ্ছ ব্যবস্থা থাকবে। তারেক রহমান কিছুদিন আগে বলেছেন, কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ফসল বিক্রি করবে- এটা আর হবে না।
নারীনিরাপত্তা, কর্মক্ষেত্রে সমান সুযোগ, নারী উদ্যোক্তা তহবিল, মাতৃত্বকালীন ভাতা বৃদ্ধি এবং সহিংসতা প্রতিরোধে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল- এগুলোও ইশতেহারের অংশ হচ্ছে। এ ছাড়া ইশতেহারে গুরুত্ব সহকারে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বিএনপির আট মূল প্রতিশ্রুতি। দলের ঘোষিত এই আট অগ্রাধিকারভিত্তিক সামাজিক নীতির কাঠামো এরই মধ্যে কূটনৈতিক সম্প্রদায় ও উন্নয়ন সহযোগীদের জানিয়েছে বিএনপি। দলটি রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ক্রীড়া, পরিবেশ, কর্মসংস্থান এবং মসজিদ-মাদরাসাভিত্তিক ধর্মীয় নেতাদের জনকল্যাণমুখী কর্মকাণ্ড কিভাবে এগিয়ে নেবে ইতোমধ্যে বিশদভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। গত ২১ জানুয়ারি রাজধানীর বনানীর হোটেল শেরাটনে ‘পলিসি ডিসেমিনেশন অন প্রায়োরিটি সোশ্যাল পলিসিজ’ শীর্ষক আলোচনায় এই আটটি খাতের ওপর আলোকপাত করে বিএনপি। অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, ভারত, পাকিস্তান, রাশিয়াসহ ৩০ দেশের রাষ্ট্রদূত ও কূটনৈতিক উপস্থিত ছিলেন।



