ফিরে দেখা জুলাই ’২৪

ইন্টারনেট ফিরলেও থামেনি অভিযান দেয়ালজুড়ে প্রতিবাদ

Printed Edition
ইন্টারনেট ফিরলেও থামেনি অভিযান দেয়ালজুড়ে প্রতিবাদ
ইন্টারনেট ফিরলেও থামেনি অভিযান দেয়ালজুড়ে প্রতিবাদ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের উত্তাল সময়ের ২০২৪ সালের ২৮ জুলাই ছিল এক বৈপরীত্যের দিন। টানা প্রায় ১০ দিনের অচলাবস্থার পর দেশে মোবাইল ইন্টারনেট চালু হলেও রাষ্ট্রীয় দমন অভিযান, গ্রেফতার এবং আন্দোলনের সমন্বয়কদের বিরুদ্ধে অভিযান থামেনি। রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে চলতে থাকে কথিত ‘ব্লক রেইড’, আর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও শহরের দেয়ালজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে প্রতিবাদের ভাষা।

বেলা প্রায় ৩টার দিকে দেশে ৪জি মোবাইল ইন্টারনেট চালু হয়। তবে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, টিকটকসহ জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তখনো বন্ধ ছিল। ফলে যোগাযোগব্যবস্থা আংশিকভাবে স্বাভাবিক হলেও তথ্যপ্রবাহ ও অনলাইন কার্যক্রম পুরোপুরি সচল হয়নি।

এ দিন কোটা সংস্কার আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় দেয়াল লিখন ও গ্রাফিতি নতুন ধরনের প্রতিবাদের মাধ্যম হয়ে ওঠে। শিক্ষার্থী, শিল্পী ও কার্টুনিস্টরা রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে দেয়ালে আঁকেন আন্দোলনের প্রতীকী চিত্র ও প্রতিবাদী স্লোগান। এর আগে আন্দোলনের সমন্বয়করা সংসদে কোটা সংস্কার-সংক্রান্ত আইন পাস-সহ তিন দফা দাবিতে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম ঘোষণা করে ২৮ জুলাই দেয়াল লিখন ও গ্রাফিতি কর্মসূচি দিয়েছিলেন। রাজধানীর পলাশীতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এলাকায় চারুকলার শিক্ষার্থী ও কার্টুনিস্টরা দেয়াল লিখন শুরু করলেও পুলিশি বাধার অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, পুলিশ তাদের রঙ ও তুলি জব্দ করে। একই সময়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইস্ট-ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দেয়াল লিখন ও গ্রাফিতি আঁকা হয়।

দেয়ালজুড়ে ফুটে ওঠে নানা প্রতিবাদী স্লোগান ‘সোনার বাংলা আজ মৃত্যুপুরী কেন?’, ‘আমার ভাইদের মারলি কেন?’, ‘পুলিশি হত্যার বিচার চাই’, ‘৫২ দেখিনি, ২৪ দেখেছি’, ‘সম্পদের হিসাব পরে, লাশের হিসাব আগে’সহ অসংখ্য বাক্য। গ্রাফিতিতে স্থান পায় গুলিবিদ্ধ শিশু রিয়া এবং রংপুরে পুলিশের গুলির সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আবু সাঈদের প্রতীকী চিত্র। শাবিপ্রবির শিক্ষার্থীরাও দেয়ালে আবু সাঈদের সেই দৃশ্য অঙ্কন করেন।

এ দিকে আন্দোলনের সমন্বয়কদের বিরুদ্ধে অভিযান আরো জোরদার হয়। পরিবারের অভিযোগ, ভোরে সমন্বয়ক নুসরাত তাবাসসুমকে রাজধানীর মিরপুরের একটি বাসা থেকে ডিবি পরিচয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। একইভাবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ক আরিফ সোহেলকে ডিবি ও সিআইডি পরিচয়ধারী ব্যক্তিরা আটক করেন বলেও অভিযোগ ওঠে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সে সময় এসব আটকের বিষয় আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি।

এর আগে গোয়েন্দা পুলিশের হেফাজতে থাকা অবস্থায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম একটি ভিডিও বার্তায় কর্মসূচি প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। তবে আন্দোলনের অন্য সমন্বয়করা দাবি করেন, নির্যাতন ও জিম্মি অবস্থায় তাকে এ বক্তব্য দিতে বাধ্য করা হয়েছে। পরে সমন্বয়ক আব্দুল কাদেরের পাঠানো বার্তায় ২৯ জুলাই দেশব্যাপী ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশের নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। ডিবি কার্যালয়ে সমন্বয়কদের পরিবারের সদস্যরা গেলেও তাদের সাথে দেখা করার সুযোগ পাননি। পরে ডিবি কার্যালয়ে অতিরিক্ত কমিশনার হারুন-অর-রশীদের সাথে খাবারের টেবিলে বসা সমন্বয়কদের একটি ছবি প্রকাশিত হলে তা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তাবাহিনীর ‘ব্লক রেইড’ অব্যাহত ছিল। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ও আবাসিক পাড়াগুলোতে রাতভর অভিযান পরিচালিত হয়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলনের সমন্বয়কদের খোঁজে চালানো এসব অভিযানে বহু শিক্ষার্থীকে আটক করা হয়।

ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার বলেন, সরকারি স্থাপনায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগে জড়িতদের গ্রেফতার না হওয়া পর্যন্ত রাজধানীতে অভিযান চলবে। তার দাবি, সাধারণ শিক্ষার্থীদের নয়, সহিংসতায় জড়িতদের বিরুদ্ধেই অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।

এ দিন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা সমাবেশ ও বিক্ষোভ করে সমন্বয়ক আরিফ সোহেলের মুক্তি দাবি করেন। রাতে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিবৃতি দিয়ে জানান, সমন্বয়কদের জিম্মি করে বিবৃতি আদায়ের অভিযোগের প্রতিবাদে তারা পরদিন আবার রাজপথে নামবেন। একই সাথে ৯ দফা দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়া হয়। আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর ব্যবহৃত অস্ত্র নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) এম সাখাওয়াত হোসেন এক সাক্ষাৎকারে বলেন, নিরস্ত্র বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

আন্তর্জাতিক পর্যায়েও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ অব্যাহত থাকে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, সাম্প্রতিক সহিংসতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ সরকার অবগত রয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি ডোনাল্ড লু বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সাথে শান্তিপূর্ণ সমাধান নিয়ে যোগাযোগের কথা জানান এবং কারফিউ ও গুলি চালানোর অভিযোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। সে দিন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী প্রথমে রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে আহত পুলিশ সদস্যদের দেখতে যান। পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন আহতদের খোঁজ নেন। এর আগে গণভবনে আন্দোলনে নিহত আবু সাঈদসহ ৩৪টি পরিবারের সদস্যদের হাতে আর্থিক সহায়তা তুলে দেন।

দেশজুড়ে গ্রেফতার অভিযানও অব্যাহত ছিল। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২৮ জুলাই পর্যন্ত রাজধানীসহ সারা দেশে ১০ হাজার ২৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়। শুধু ঢাকাতেই সহিংসতার ঘটনায় নতুন ২২টি মামলা দায়ের হয়। এতে রাজধানীতে মোট মামলার সংখ্যা দাঁড়ায় ২২৯টি এবং গ্রেফতার হন দুই হাজার ৭৬৪ জন। এ দিকে বাম গণতান্ত্রিক জোট, ফ্যাসিবাদবিরোধী বাম মোর্চা ও বাংলাদেশ জাসদ নিহত-আহতদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ এবং হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করে। একই দিন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান জানান, কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে সঙ্ঘাত-সংঘর্ষে এ পর্যন্ত ১৪৭ জন নিহত হয়েছেন। অন্য দিকে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সঙ্কলিত তথ্য অনুযায়ী, ১৬ থেকে ২৮ জুলাই পর্যন্ত সহিংসতায় অন্তত ২১০ জন নিহত হন, যাদের মধ্যে ৪৫ জন ছিলেন শিক্ষার্থী। একই সময়ে দেশের ১৮টি জেলা থেকে অন্তত ২৫৩ জন শিক্ষার্থী গ্রেফতার হওয়ার তথ্যও প্রকাশিত হয়। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশও এক বিবৃতিতে নির্বিচার হত্যা, মামলা ও গ্রেফতার বন্ধের দাবি জানায়।

২৮ জুলাই তাই শুধু মোবাইল ইন্টারনেট ফিরে পাওয়ার দিন ছিল না; এটি ছিল এমন এক দিন, যখন দেয়ালজুড়ে প্রতিবাদের ভাষা আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কিন্তু একই সাথে অব্যাহত থাকে গ্রেফতার, সমন্বয়কদের আটকের অভিযোগ, রাতভর অভিযান এবং রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন। যোগাযোগব্যবস্থা আংশিকভাবে স্বাভাবিক হলেও আন্দোলনের সঙ্কটের অবসান হয়নি; বরং পরের দিন আরো বৃহত্তর ছাত্র-জনতার কর্মসূচির ভিত্তি তৈরি হয় এই দিনের ঘটনাপ্রবাহে।