নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আরো ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং এক হাজার ৫৭১ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চলতি বছরে এক দিনে ডেঙ্গুতে মৃত্যু ও হাসপাতালে ভর্তির- দুই ক্ষেত্রেই এটি সর্বোচ্চ সংখ্যা।
গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত পাওয়া স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, নতুন ৯ মৃত্যু নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩০ জনে। একই সময়ে নতুন এক হাজার ৫৭১ রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় এ বছর মোট আক্রান্ত ও হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৫ হাজার ৪৭৫ জনে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন তিন হাজার ২১৮ জন।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় মৃতদের মধ্যে তিনজন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকার, দুজন করে ঢাকা ও খুলনা বিভাগের এবং একজন করে বরিশাল ও ময়মনসিংহ বিভাগের বাসিন্দা।
এক দিনের ব্যবধানে পরিস্থিতির আরো অবনতি
ডেঙ্গুর ঊর্ধ্বগতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে নতুন রেকর্ড গড়ছে।
৭ সেপ্টেম্বর সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় এক হাজার ৩১৪ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন এবং চারজনের মৃত্যু হয়। তার আগের দিন ৬ সেপ্টেম্বর ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন এক হাজার ৫৫৮ জন, যা তখন পর্যন্ত চলতি বছরের সর্বোচ্চ ছিল।
অর্থাৎ এক দিনের ব্যবধানে হাসপাতালে নতুন ভর্তির সংখ্যা আরো ১৩ জন বেড়ে এক হাজার ৫৭১-এ পৌঁছেছে। একই সাথে দৈনিক মৃত্যুও চার থেকে বেড়ে ৯ জন হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের ডেঙ্গু ড্যাশবোর্ডেও সাম্প্রতিক সময়ে আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা স্পষ্ট। ৬ সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, ওই ২৪ ঘণ্টায় এক হাজার ৫৫৮ জন হাসপাতালে ভর্তি এবং চারজনের মৃত্যু হয়েছিল।
সেপ্টেম্বরে বাড়ছে ঝুঁকি
চলতি বছরের ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে সেপ্টেম্বর মাসটি বিশেষভাবে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। আগস্টেই দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা গত ২৬ বছরের মধ্যে ওই মাসের হিসাবে তৃতীয় সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। সেপ্টেম্বরের শুরুতে পরিস্থিতি আরো দ্রুত অবনতি হয়েছে।
১ সেপ্টেম্বর এক দিনেই পাঁচজনের মৃত্যু এবং এক হাজার ৩২৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। এরপর ৬ সেপ্টেম্বর দৈনিক হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা বেড়ে এক হাজার ৫৫৮-এ পৌঁছায়।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষা-পরবর্তী জমে থাকা পানি, উচ্চ তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা এডিস মশার প্রজননের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। ফলে সেপ্টেম্বরজুড়ে সংক্রমণ আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। হাসপাতালগুলোতেও রোগীর চাপ ক্রমেই বাড়ছে।
শুধু ঢাকায় নয়, ছড়াচ্ছে দেশজুড়ে
ডেঙ্গুর বর্তমান প্রবণতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো- সংক্রমণ এখন শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক নয়। ঢাকা শহরের পাশাপাশি খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন বিভাগে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন।
৬ সেপ্টেম্বরের ২৪ ঘণ্টায় নতুন ভর্তি রোগীদের মধ্যে খুলনা বিভাগে ৩৩৪ জন, ঢাকা বিভাগের সিটি করপোরেশন-বহির্ভূত এলাকায় ৩১৬ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ১৬৯ জন, বরিশালে ১৩৭ জন, ময়মনসিংহে ৮৪ জন, রাজশাহীতে ১১২ জন, রংপুরে ৫৬ জন এবং সিলেটে ৯ জন ছিলেন। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকাতেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোগী ভর্তি হন।
গত বছরের তুলনায় এখনো কম, কিন্তু গতি উদ্বেগজনক
পরিসংখ্যানের দিক থেকে চলতি বছরের মোট আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা গত বছরের তুলনায় এখনো কম। ২০২৫ সালে দেশে এক লাখ দুই হাজার ৮৬১ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত এবং ৪১৩ জন মারা যান। ২০২৪ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল এক লাখ এক হাজার ২১৪ জন এবং মৃত্যু হয়েছিল ৫৭৫ জনের।
তবে এবারের উদ্বেগের জায়গা মোট সংখ্যার চেয়ে বেশি হলো আক্রান্তের বৃদ্ধির গতি। আগস্টের শেষ থেকে সেপ্টেম্বরের শুরুতে দৈনিক হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় বিশেষজ্ঞরা পরিস্থিতিকে নতুন করে গুরুত্ব দেয়ার কথা বলছেন।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গু পরিস্থিতির আরো বড় অবনতির আশঙ্কা রয়েছে এবং হাসপাতালগুলোতে শয্যার ওপর চাপ বাড়ছে। বিশেষ করে ঢাকার বাইরে বিভিন্ন এলাকায়ও রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।
হাসপাতাল প্রস্তুত রাখার নির্দেশ
ডেঙ্গুর ঊর্ধ্বগতি মোকাবেলায় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ দেশের সিভিল সার্জনদের হাসপাতাল প্রস্তুত রাখা, রোগী ব্যবস্থাপনা জোরদার এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে। একই সাথে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু উড়ন্ত মশা নিধন করে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এডিস মশার লার্ভার উৎস- জমে থাকা পানি, পরিত্যক্ত পাত্র, নির্মাণাধীন ভবনের পানি, ছাদ ও বিভিন্ন জলাধার- নিয়মিত চিহ্নিত করে ধ্বংস করতে হবে।
ডেঙ্গুর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দিক হলো, অনেক রোগীর ক্ষেত্রে জ্বর কমে যাওয়ার পরও জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই জ্বর হলেই অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা করা জরুরি।
বর্তমানে দেশে তিন হাজার ২১৮ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ফলে দৈনিক নতুন রোগী ভর্তির সংখ্যা এভাবে বাড়তে থাকলে আগামী দিনগুলোতে হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এখন তিনটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং হাসপাতালের প্রস্তুতি বাড়ানো। চলতি সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহের পরিসংখ্যানই ইঙ্গিত দিচ্ছে, পরিস্থিতিকে আর মৌসুমি রোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি এখন জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় সতর্কসঙ্কেত।
সিলেটে ডেঙ্গুতে ২য় মৃত্যু : শনাক্ত আরো ৮
সিলেট ব্যুরো জানায়, ডেঙ্গুতে আরো একজনের মৃত্যু দেখলো সিলেট। গত ২৪ ঘণ্টায় একজনের মৃত্যুর পাশাপাশি নতুন করে আটজন ডেঙ্গুরোগী শনাক্ত হয়েছেন। এ নিয়ে চলতি বছরে সিলেট বিভাগে ডেঙ্গুতে দু’জন মারা গেলেন। আর শনাক্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ২৩৮ জন।
মঙ্গলবার এর সত্যতা নিশ্চিত করেছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক ডা: মো: মাহবুবুল আলম।
স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ তথ্যমতে, সিলেটের জালালাবাদ রাগিব রাবেয়া মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুবরণকারী কৃষ্ণ দাস (৪৫) হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার বাসিন্দা। চলতি মৌসুমে এর আগে সিলেট বিভাগে ডেঙ্গুতে আরো একজনের মৃত্যু হয়েছিল।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, নতুন শনাক্ত আট রোগীর মধ্যে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে দুই, জালালাবাদ রাগীব-রাবেয়া মেডিক্যাল হাসপাতালে এক, মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে তিন এবং লাখাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দুজন রয়েছেন।
১ জানুয়ারি থেকে ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সিলেট বিভাগে ২৩৮ জন ডেঙ্গুরোগী শনাক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে সিলেটে ৪৬, সুনামগঞ্জে ৫২, হবিগঞ্জে ১০৮ ও মৌলভীবাজারে ২৪ জন। এ ছাড়া অন্য জেলা থেকে এসে চিকিৎসা নেয়া আটজন রয়েছেন।
বর্তমানে বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে ২৪ জন ডেঙ্গুরোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এর মধ্যে সিলেটের হাসপাতালগুলোতে ১০, হবিগঞ্জে আট, সুনামগঞ্জে তিন এবং মৌলভীবাজারে তিনজন ভর্তি রয়েছেন।
প্রসঙ্গত- এর আগে গত ২ আগস্ট সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আফিয়া খানম (৫৪) নামের ডেঙ্গু আক্রান্ত এক নারী। এটি ছিল মৌসুমে সিলেট বিভাগে ডেঙ্গুতে ১ম মৃত্যু।



