১০ স্কুলের স্বপ্ন : ধীরগতির চক্রজালে বন্দী

রাজধানীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ কমিয়ে ঢাকার আশপাশের এলাকায় মানসম্মত সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে নেয়া হয় প্রকল্পটি। তিন বছরের প্রকল্প শুরুর প্রায় ৯ বছর পার হলেও ১০টি বিদ্যালয়ের একটি ভবনও সম্পূর্ণ নির্মাণ শেষ হয়নি। আট বছর ১০ মাসে প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি মাত্র ৬৮ শতাংশ। তিনটি বিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবনের নির্মাণকাজ এখনো শুরুই করা যায়নি। একই সাথে শিক্ষক নিয়োগ, আসবাবপত্র, ল্যাব, কম্পিউটার ও শিক্ষা উপকরণ সংগ্রহেও কার্যত কোনো অগ্রগতি নেই।

হামিদুল ইসলাম সরকার
Printed Edition
  • ব্যয় বেড়েছে ১৯ শতাংশ, মেয়াদ ৮৪ মাস
  • ৯ বছরে কাজই শুরু করতে পারেনি ৩টি স্কুল ভবনের
  • ৩ বছরের প্রকল্প ৯ বছরে ৬৮ শতাংশ অগ্রগতি

সমীক্ষা না করা, দীর্ঘসূত্রতা, ব্যয় বৃদ্ধি ও বাস্তবায়ন ধীরগতির চক্রে আটকা পড়েছে ঢাকা শহর সন্নিকটবর্তী এলাকায় ১০টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন (দ্বিতীয় সংশোধিত) প্রকল্প। রাজধানীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ কমিয়ে ঢাকার আশপাশের এলাকায় মানসম্মত সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে নেয়া হয় প্রকল্পটি। তিন বছরের প্রকল্প শুরুর প্রায় ৯ বছর পার হলেও ১০টি বিদ্যালয়ের একটি ভবনও সম্পূর্ণ নির্মাণ শেষ হয়নি। আট বছর ১০ মাসে প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি মাত্র ৬৮ শতাংশ। তিনটি বিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবনের নির্মাণকাজ এখনো শুরুই করা যায়নি। একই সাথে শিক্ষক নিয়োগ, আসবাবপত্র, ল্যাব, কম্পিউটার ও শিক্ষা উপকরণ সংগ্রহেও কার্যত কোনো অগ্রগতি নেই। ব্যয় বেড়েছে ১৯ শতাংশ আর মেয়াদ বেড়েছে ২৩৩.৩৩ শতাংশ। আইএমইডির পান্না কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে। আবারো খরচ ও সময় বৃদ্ধির আশঙ্কা করছেন পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্টরা।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প দলিল এবং আইএমইডির তথ্য বলছে, ঢাকা মহানগরীতে বর্তমানে তিনটি শাখা বা ফিডারসহ মোট ৪৪টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে। সুষ্ঠু ভর্তিকার্যক্রম ও লটারির সুবিধার জন্য বিদ্যালয়গুলোকে ‘ক’ ‘খ’ এবং ‘গ’- এই তিনটি গ্রুপে বিভক্ত করা হয়েছে। রাজধানীর আশপাশের এলাকাগুলোতে মানসম্মত সরকারি শিক্ষাসুবিধা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে ১০টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন (দি¡তীয় সংশোধিত) প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পটি ২০১৭ সালের জুলাই মাসে শুরু হয়ে তিন বছরের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও ভূমি অধিগ্রহণসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক ও কারিগরি জটিলতার কারণে এর বাস্তবায়ন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করা সম্ভব হয়নি। ফলে প্রকল্পটির মেয়াদ একাধিকবার বৃদ্ধি করতে হয়েছে।

যেভাবে বাড়ে প্রকল্প খরচ ও সময়

প্রকল্প দলিলের তথ্যানুযায়ী, শিক্ষার এই প্রকল্পটি সম্পূর্ণ জিওবি অর্থায়নে মোট ৬৭৩ কোটি ৪৬ লাখ ৪৬ হাজার টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে তিন বছর মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৭ সালের ১৭ অক্টোবর একনেক সভায় অনুমোদিত হয়। পরবর্তীতে কোভিড-১৯ মহামারী পরিস্থিতিতে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্দেশনা মোতাবেক প্রথম বার ব্যয় বৃদ্ধি ছাড়া মেয়াদ এক বছর বৃদ্ধি করে জুন ২০২১ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা করা হয়। এরপর কাজে অগ্রগতি না হওয়ায় মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ ২০২১ সালের জুনে আবার দ্বিতীয় বার ব্যয় বৃদ্ধি ছাড়া মেয়াদ বৃদ্ধি করে। এতে প্রকল্পের মেয়াদ জুন ২০২২ পর্যন্ত, নির্ধারণ করা হয়। তাতেও প্রকল্পের কাজ শেষ হয় না। পরবর্তীতে পিডব্লিউডির রেট শিডিউল পরিবর্তন, কিছু খাতের ব্যয় হ্রাস বা বৃদ্ধির কারণে প্রকল্পের মেয়াদ আরো আড়াই বছর বৃদ্ধিসহ মোট ব্যয় ৭৫০ কোটি ৪০ লাখ ১০ হাজার টাকায় উন্নীত করা হয়। মেয়াদ বাড়িয়ে ডিসেম্বর ২০২৪ পর্যন্ত সাত বছরে অনুমোদন দেয়া হয়, যা প্রথম সংশোধন নামে গত ২০২৩ সালের ৪ এপ্রিল একনেক কর্তৃক অনুমোদিত হয়। সর্বশেষ, দ্বিতীয় সংশোধিত ডিপিপি অনুযায়ী প্রকল্পটির অনুমোদিত মেয়াদকাল ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত এবং মোট অনুমোদিত প্রাক্কলিত ব্যয় ৮০৩ কোটি ৭৪ লাখ ৮৫ হাজার টাকা, যা সম্পর্ণ জিওবি অর্থায়নে বাস্তবায়িত হবে। ফলে প্রকল্প এখন ১০ বছরে বা ২৩৩.৩৩ শতাংশ, আর খরচ বেড়েছে ১৯.৩৫ শতাংশ।

প্রকল্পের অগ্রগতি ৯ বছরে ৬৮ শতাংশ:

আইএমইডির সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ৪৪৩ কোটি ৮৬ লাখ ৫৪ হাজার টাকা, যা সংশোধিত ব্যয়ের মাত্র ৫৫ দশমিক ৪৫ শতাংশ। ভৌত অগ্রগতি বা কাজ হয়েছে ৬৮ শতাংশ। তবে এখানে কোনো খাতের কাজই গত আট বছর ১০ মাসে শতভাগ করতে পারেনি।

৩টির কাজই শুরু হয়নি:

সমীক্ষায় দেখা গেছে, ১০টি বিদ্যালয়ের প্রতিটির জন্য ১০ তলা একাডেমিক ভবন, জিমনেসিয়াম, শহীদ মিনার, অভ্যন্তরীণ সড়ক ও সীমানা প্রাচীর নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও কোনো প্রতিষ্ঠানের কাজ শতভাগ সম্পন্ন হয়নি। মাত্র চারটি ভবনের নির্মাণ অগ্রগতি ৮৮ থেকে ৯৩ শতাংশে পৌঁছেছে। দু’টি ভবনের কাজ ৩০ থেকে ৩৩ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। একটি ভবনের অগ্রগতি মাত্র ১০ শতাংশ। অন্য তিনটি ভবনের নির্মাণকাজই শুরু হয়নি। এর মধ্যে একটি বিদ্যালয়ের জমি হস্তান্তর সম্পন্ন হলেও দরপত্র মূল্যায়নের কাজ চলছে। বাকি দু’টি বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে এখনো জমি হস্তান্তরই সম্পন্ন হয়নি। যদিও প্রকল্পের জন্য প্রায় ২০ একর জমি অধিগ্রহণের লক্ষ্য প্রায় শতভাগ অর্জিত হয়েছে, তবে পূর্ব-নরসিংহপুর এলাকায় জমির মূল্য পরিশোধের পরও সংশ্লিষ্ট জমি এখনো প্রকল্প কর্তৃপক্ষের কাছে বুঝিয়ে দেয়া হয়নি।

অবকাঠামোর পাশাপাশি শিক্ষা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও পিছিয়ে রয়েছে। বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগের জন্য নতুন পদ সৃষ্টির বিষয়ে ২০২৫ সালের ১২ আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হলেও এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এদিকে ভবন নির্মাণ শেষ না হওয়ায় বিদ্যালয়ের জন্য প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র, কম্পিউটার, ল্যাব সরঞ্জাম, অফিস যন্ত্রপাতি, খেলাধুলার সামগ্রী ও বই-পুস্তক সংগ্রহের কাজও শুরু হয়নি।