পেঁয়াজের দাম হঠাৎ কেন বাড়ছে?

মূল্য নিয়ন্ত্রণে আমদানির সুপারিশ ট্যারিফ কমিশনের

Printed Edition
পেঁয়াজের দাম হঠাৎ কেন বাড়ছে?
পেঁয়াজের দাম হঠাৎ কেন বাড়ছে?

বিশেষ সংবাদদাতা

ঢাকায় গত কয়েক দিনেই পেঁয়াজের খুচরা দাম প্রতি কেজি ৭০-৮০ টাকা থেকে ১০০-১২০ টাকায় লাফ দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পেঁয়াজের হঠাৎ দামবৃদ্ধি একক কারণের ফল নয়- মৌসুমি সরবরাহ সঙ্কট, আবহাওয়া-ঘটিত ফসলক্ষতি, আমদানির জট এবং মধ্যস্বত্বদের অভ্যাসের সমন্বিত ফল হিসেবে এটি ঘটেছে বলে জানা যাচ্ছে। বাজার পযবেক্ষকদের মতে, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনতে তাৎক্ষণিক আমদানি, গুদাম-মুক্তি ও বাজার-মনিটরিং জরুরি; মাঝারি ও দীর্ঘমেয়াদে সাপ্লাই-চেইন ও সংরক্ষণ-প্রণালি শক্ত করলে ভবিষ্যতে এমন অবস্থা একই শক থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।

মৌসুমি সরবরাহ সঙ্কট মূলচালিকা শক্তি : পেঁয়াজের স্থানীয় মজুদ অক্টোবরের শেষ থেকে দ্রুত কমে যায়; কৃষকরা মাঠ থেকে স্টক শেষ করে ফেলেছেন এবং নতুন ফসল বাজারে আসতে এখনও সময় লাগে। ফলে পাইকারি-স্তরেই সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হয়েছে; মাঝারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা সেই ঘাটতি তুলে দাম বাড়াচ্ছেন। এ ধরনের মৌসুমি চাপ প্রতি বছরই নভেম্বর-ডিসেম্বরে দেখা যায়।

আবহাওয়া : মাঠে বন্যা/বৃষ্টির ক্ষতি : পেঁয়াজ উৎপাদন এলাকায় (পাবনা, রাজশাহী, ফারিদপুর, কুষ্টিয়া প্রভৃতি) সাম্প্রতিক ভারী বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে বিক্রির যোগ্য পেঁয়াজ নষ্টের খবর এসেছে ফলশ্রুতিতে বাজারে ঘাটতি বেড়েছে ও পাইকারি দাম দ্রুত বেড়ে গেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন শুধুমাত্র দুই-তিন দিনে পাইকারি বাজারে প্রতি কেজিতে ২০-৩০ টাকা বাড়ে।

আমদানির শিথিলতা ও সীমান্ত-জট : বাংলাদেশের বড় অংশ কিছু সময়ে পেঁয়াজ আমদানির ওপর নির্ভরশীল বিশেষ করে ভারতের মুক্ত বাজার থেকে এ পেঁয়াজ আসে। সীমান্তে লজিস্টিক জট বা ভারতের রফতানি-নিয়ন্ত্রণ/বিলম্ব^ থাকলে তা দ্রুত চরকায় পড়ে। সম্প্রতি আমদানি প্রবাহে বিঘœ সৃষ্টি বাজার-ওপর চাপসৃষ্টি করেছে; আমদানির স্থায়ী আনুষ্ঠানিকতার কারণে অভ্যন্তরীণ মজুদই অতিরিক্ত গুরুত্ব পায়।

মধ্যস্বত্বদের ভূমিকা : পাইকারি পর্যায়ে গুদামজাত করে রাখা ও মূল্য-প্রবণতা সৃষ্টি করার জন্য কৃত পরিকল্পিত স্টক ব্যবহার এসব অভিযোগ আলোচনায় এসেছে। বাজার-পর্যবেক্ষণ বলছে : ‘যখন কৃষকের মজুদ শেষ, তখন মজুদদাররা দাম বাড়িয়ে বিক্রি করে।’ এ আচরণ ক্রেতাদের ওপর তাৎপর্যপূর্ণ চাপ ফেলে।

মূল-চেইন বিশ্লেষণ : মাঠ- পাইকারি আড়ত- খুচরা বিক্রেতা- গ্রাহক। মাঝের ধাপে পাইকারি আড়ত/মজুদদাররা সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে এসে মূল্য প্রভাবিত করতে পারে। বাণিজ্যিক আমদানির শৃঙ্খলা ভাঙলে স্থানীয় মজুদ দ্রুত ফুরিয়ে যায়, তখন দাম নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ে।

দরকারি পদক্ষেপ : সরকার ও নিয়ন্ত্রকরা এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে ঘাটতি কাটাতে দ্রুত ভারত বা তৃতীয় দেশ থেকে জরুরি পেঁয়াজ আনার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। মধ্যস্বত্বভোগীর মজুদ থেকে বাজারে সরবরাহ বাড়ানোর জন্য সরকারি মজুদ বা খাদ্য করপোরেশন/বাজার মনিটরের মাধ্যমে বড় আড়তকে মজুদ ছাড়তে বাধ্য করা যেতে পারে। দাম-মানিটরিং টাস্কফোর্সের মাধ্যমে বাজারে মনিটরিং ও অস্থায়ী মূল্য-নিরীক্ষণ; জালিয়াতি বা মজুদ প্রমাণিত হলে জরিমানা বা কড়া ব্যবস্থা।

এক থেকে ছয় মাসের মধ্যম মেয়াদে আমদানির উৎস ও সরবরাহ-চেইন মজবুত করার পদক্ষেপ নিতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ফসল পুনরুদ্ধারে টেকনিক্যাল ও আর্থিক সহায়তা দিলে স্থানীয় উৎপাদন দ্রুত স্থিতিশীল হতে পারে।

মূল্য নিয়ন্ত্রণে আমদানির সুপারিশ ট্যারিফ কমিশনের

অভ্যন্তরীণ বাজারে দাম অস্বাভাবিক বাড়ায় পেঁয়াজ আমদানির সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি)। সম্প্রতি স্থানীয় বাজারে পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধিতে সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যালোচনাপূর্বক পেঁয়াজ আমদানির সুপারিশ করে গত বৃহস্পতিবার বাণিজ্য সচিব ও কৃষিসচিবকে সংস্থার পক্ষ থেকে চিঠি দেয়া হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

জানা গেছে, প্রতি বছর অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে পেঁয়াজের দাম বাড়ে। সে বিবেচনায় এক কেজি পেঁয়াজের দাম সর্বোচ্চ ১১০-১২০ টাকা ওঠায় সীমিত পরিমাণে ও দ্রুত আমদানির সুপারিশ করেছে কমিশন। ট্যারিফ কমিশন মনে করছে, পেঁয়াজের এ দাম স্বাভাবিক নয়। এটি কারসাজির কারণে হতে পারে।

প্রসঙ্গত, শুক্রবার ( ৭ নভেম্বর) রাজধানীর বাজার ভেদে প্রতি কেজি পেঁয়াজ ১১০-১২০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।

ট্যারিফ কমিশনের চিঠিতে বলা হয়েছে, পেঁয়াজের উচ্চ দামের সুবিধা কৃষক পাচ্ছেন না। মধ্যস্বত্বভোগীরা এ সুযোগ নিচ্ছেন। তাই পেঁয়াজ আমদানির সুযোগ দিলে বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমে যাবে। ভোক্তারা যৌক্তিক মূল্যে পেঁয়াজ কিনতে পারবেন।

বাজার সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো মতে, কিছু মধ্যস্বত্বভোগী কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করে বাজার অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। প্রতি কেজি পেঁয়াজ এ সময়ে ৯০ টাকার মধ্যে থাকার কথা থাকলেও তা বেড়ে এখন ১১৫ টাকার ওপরে বিক্রি হচ্ছে। অথচ পার্শ্ববর্তী দেশে এ পেঁয়াজের দাম এখন ৩০ টাকার মধ্যে রয়েছে। জানা যায়, গত অর্থবছরে দেশে ৪৪ লাখ ৪৮ হাজার টন পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়েছে। তবে সংরক্ষণ সমস্যাসহ নানা কারণে পেঁয়াজ নষ্ট হয়। তাই গত অর্থবছরে ৩৩ লাখ টনের মতো পেঁয়াজ বাজারে এসেছে।

ট্যারিফ কমিশন বলেছে, বাংলাদেশের পেঁয়াজ আমদানি প্রধান উৎস দেশ ভারত। পেঁয়াজের মোট আমদানির ৯৯ শতাংশই করা হয় ভারত থেকে। এ ছাড়া তুরস্ক, পাকিস্তান, মিয়ানমার, চীন ও মিসর থেকেও পেঁয়াজ আমদানি হয়। গত অর্থবছরে মোট চার লাখ ৮৩ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানি হয়। বর্তমানে পেঁয়াজের ওপর মোট ১০ শতাংশ শুল্ককর প্রযোজ্য রয়েছে।

জানা গেছে, বাজার নিয়ন্ত্রণে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় খুব দ্রুত পেঁয়াজ আমদানির বিষয়ে একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।