‘টরন্টোর বিএমও স্টেডিয়ামে আজ (গতকাল) বিশ্বকাপ শেষ।’ অর্থাৎ কানাডার টরন্টোতে এবারের বিশ্বকাপে আর কোনো খেলা নেই। স্টেডিয়ামে প্রবেশের সময় লাউড স্পিকারে এই কথা বেশ কয়েকবার বলা হচ্ছিল। এই মাঠেই এবারের বিশ্বকাপ শেষ করে দেবে দুই তারকা ফুটবলার ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো অথবা লুকা মডরিচের। শেষ পর্যন্ত কার চোখে পানি ঝরবে আর কার বিজয়ের হাসিতে দাঁত চিকচিক করবে সেই উত্তর খোঁজার জন্য মুখোমুখি হয়েছিল পর্তুগাল ও ক্রোয়েশিয়া। বিশ্বকাপের গত দুই আসরের ফলাফল বিবেচনায় এগিয়ে ছিল ক্রোয়েশিয়া। বলকান অঞ্চলের এই দেশ ২০১৮ বিশ্বকাপের ফাইনালিস্ট ও ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের তৃতীয় হওয়া দল। তাই অনেকেরই ধারণা ছিল হয়তো টরন্টো ভেনুর বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার সাথে সাথে রোনালদোও শেষবারের মতো বিশ্বকাপ খেলে ফেলবেন। টানা ছয় বিশ্বকাপে গোল করলেও এবার সে অর্থে ফর্মে নেই সিআর সেভেন। তবে সবার ধারণা মিথ্যা প্রমাণ করলেন পর্তুগালের এই রাজপুত্র। নিজে গোল করলেন। দলও জিতল। প্রবল প্রতিপক্ষ সাবেক যুগোস্লাভিয়ার অংশ থাকা ক্রোয়েশিয়াকে ২-১ গোলে হারিয়ে শেষ ১৬তে উঠল পর্তুগাল। এতে টিকে থাকল রোনালদো এবং পর্তুগালের প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন। আর গত দুই বিশ্বকাপের সেরা চারে থাকা ক্রোয়েটদের বিদায় নিতে হলো সেরা ৩২ থেকেই।
ম্যাচে দুই দলেরই অফসাইডের কারণে গোল বাতিল হয়েছে। ক্রোয়েশিয়ার দু’টি। আর পর্তুগালের একটি। তবে মিসরের বিপক্ষে শেষ সময়ে ইরানের গোল বাতিল হওয়ার যে কষ্ট, কাল টরন্টোতে সেই যাতনায় পুড়তে হলো লুকা মডরিচ, ইভান প্যারিসিচদের। ১০ মিনিট ইনজুরি টাইমের বর্ধিত সময়ে তাদের করা গোল বাতিল হয় ভিএআর চেকের মাধ্যমে। আর এতেই নব্বইয়ের দশকে সার্ব ও বসনিয়ার মুসলমানদের সাথে যুদ্ধ করা দেশটির টানা বিশ্বকাপের সেমিতে খেলার সব আশার পরিসমাপ্তি ঘটে।
গোলের খেলা ফুটবলে যে দল গোল করবে এবং লিডটা ধরে রাখতে পারবে সে দলই জিতবে। সেই হিসেবে স্যালুট পর্তুগিজদের। তবে ভালো খেলে এবং বেশি চান্স পেয়েও ক্রোয়েশিয়ার হেরে যাওয়াটা বেশি কষ্টের।
পর্তুগালের আক্রমণের মধ্যমণি বলতে রোনালদোই। তাকে ওপরে রেখে তার অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে বারবারই আক্রমণে যাওয়ার চেষ্টা করেছে রবার্তো মার্টিনেজের দল। তবে কিছুই করতে পারছিলেন না তিনি। হেডে যেতে পারছিলেন না। গোলের চান্সগুলোও পুঁজি করে দলকে লিড এনে দিতে ব্যর্থ হচ্ছিলেন। আসলে বয়স বলে কথা। ৪১ বছর হয়ে গেছে। তিন মিনিটে ব্রুনো ফার্নান্দেজের শট ক্রোয়েশিয়ার গোলরক্ষক রুখে দেন। এরপর ৮ ও ২৯ মিনিটে দারুণ দুই ক্রস থেকে প্রথমে মাথা ও পরে পা ছোঁয়াতে পারেননি রোনালদো। ৩৩ মিনিটে ক্রোয়েশিয়া গোলবঞ্চিত হয়।
গোলশূন্য প্রথমার্ধ শেষে ৪৮ মিনিটে আবার গোলের দেখা পেল না ক্রোয়েশিয়া। এবার মাতেও কোভাচিচের শট পর্তুগালের গোলরক্ষক কর্নার করেন। এরপর ৫৩ মিনিটে বিশ্বকাপে নিজের ২১তম ম্যাচ খেলা ইভান প্যারেসিচ এগিয়ে নেন ক্রোয়েশিয়াকে। বাম দিক থেকে আসা বল রিসিভ করে এরপর বাম পায়ের ভলিতে পরাস্ত করেন পর্তুগালের গোলরক্ষক দিয়েগো কস্তাকে। এই গোলের পর তার ব্যবধান দ্বিগুণ করার চেষ্টা ব্যর্থ হয়। এবার তার শটে আর পরাস্ত হননি গোলরক্ষক কস্তা।
পিছিয়ে পড়া পর্তুগাল ৬৩ মিনিটে রোনালদোর কল্যাণে গোল পেলেও ভিএআরে চেকিংয়ে তা অফ সাইডে বাতিল হয়। এরপর তিনি দুই হাত তুলে দর্শকদের চাঙ্গা থাকতে বলেন। পর্তুগালের সমর্থকরাও সে ডাকে সাড়া দেন। পরবর্তীতে ৬৮ মিনিটে পেনাল্টি থেকে পর্তুগালকে খেলায় ফেরান অধিনায়ক রোনালদো। এই পেনাল্টি আদায়ের পেছনে বিশাল ভূমিকা পর্তুগালের কোচিং স্টাফ ও সাইড লাইনের ফুটবলাররা। তাদের দাবি ছিল ঠিক একটু আগে হওয়া কর্নার কিকের সময় বক্সে ফাউল করা হয়েছে। দুই হাত দিয়ে নিকোলা ভøাচিচ ফেলে দেন পর্তুগালের ফুটবলারকে। রেফারি বেশ কিছুক্ষণ পর ভিএআর দেখে পেনাল্টির বাঁশি বাজান। এতে ম্যাচে ফেরার আশা জাগে পর্তুগালের।
রোনালদো মাঠে থাকলে তিনিই নেন পেনাল্টি। ফলে এবারো তিনি বল হাতে নিয়ে বসান পেনাল্টি স্পটে। এরপর ডান পায়ের শটে ভেঙে দেন বিপক্ষ কিপার ডোমেনিখ লিভাকোভিচের প্রতিরোধ। ৬৮ মিনিটে খেলা ১-১ হওয়ার পর আবার এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায় ক্রোয়েশিয়া। এবার মাতেও কোভাচিচের শট পোস্টে লেগে ফিরে আসে। ফিরতি বলে তার নেয়া ভলি কর্নার করেন পর্তুগালের শেষ প্রহরী। এরপর ৮০ মিনিটে অফসাইডে ক্রোয়েশিয়ার গোল বাতিল। পরের মিনিটেই মাঠ থেকে তুলে নেয়া হয় রোনালদোকে। এতে ৬২ মিনিটে মাঠে নামা গঞ্জালো রামোস চলে আসেন মূল স্ট্রাইকারের পজিশনে। গোল করার দায়িত্বে এসে ৯৪ মিনিটে পর্তুগালকে জয়ের বন্দরে নিয়ে যান এসি মিলানের এই স্ট্রাইকার। রাফায়েল লিয়াওয়ের ক্রস থেকে আসা বলে লাফিয়ে হেডে তা জালে পাঠান তিনি।
টরন্টোর বিএমও স্টেডিয়ামে তখন পর্তুগালের সমর্থকদের উল্লাস। এরপর ইনজুরি টাইমের ১২তম মিনিটে ক্রোয়েশিয়া গোল করে উল্লাসে স্টেডিয়াম মাতিয়ে দিলেও পরক্ষণেই রেফারি ভিডিও দেখে অফসাইডের ঘোষণা দেন। এতে চূড়ান্ত হতাশা ক্রোয়েট শিবিরে। আর পর্তুগিজ শিবিরে শুরু হয়ে যায় বিজয়ের উল্লাসের শেষ প্রস্তুতি। শেষ পর্যন্ত রোনালদোর দল চলে গেল সেরা ১৬তে। আর মডরিচদের দেশে ফেরার প্রস্তুতি।
ক্রোয়েশিয়া অবশ্য গতকালের ম্যাচ ছাড়া সেভাবে দাপটের সাথে খেলতে পারেনি। ইংল্যান্ডের কাছে ২-৪ গোলে হারে তাদের শুরু। পরবর্তীতে ঘানাকে হারিয়ে তাদের নকআউটে আসা।



