পদ্মায় হঠাৎ পানি বৃদ্ধি

রাজবাড়ীর দেবগ্রামে নদীভাঙন ফসলিজমি বিলীন

Printed Edition

রাজবাড়ী প্রতিনিধি

পদ্মা নদীর পানি হঠাৎ বৃদ্ধি পাওয়ায় রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দেবগ্রাম ইউনিয়নের চরাঞ্চলে ভয়াবহ ভাঙন শুরু হয়েছে। কয়েক দিনের টানা ভাঙনে শতাধিক বিঘা ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। একই সাথে ঝুঁকিতে পড়েছে শতাধিক বসতবাড়ি, কয়েকটি শিাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, ঈদগাহ ও কবরস্থান। ভাঙনের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে কয়েক শ’ পরিবার।

গত বুধবার সরেজমিনে দেখা যায়, দেবগ্রাম ইউনিয়নের ৪ ও ৫ নম্বর ওয়ার্ডে পদ্মার তীর বরাবর প্রায় ১০০ ফুট এলাকাজুড়ে তীব্র ভাঙন চলছে। মুহূর্তের মধ্যে ধানতেসহ উর্বর জমি নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। কোথাও জমির কিনারা ধসে পড়ছে, কোথাও বসতভিটার পাশে তৈরি হয়েছে বড় বড় ফাটল।

স্থানীয় কৃষক হাবিজল সরদার জানান, তার প্রায় এক বিঘা জমির ধানতে পুরোপুরি নদীতে চলে গেছে। একইভাবে পেঁয়াজসহ অন্যান্য আবাদি জমিও হুমকির মুখে রয়েছে। তিনি বলেন, ‘সারা বছরের ভরসা ছিল এই জমি। চোখের সামনে সব নদীতে চলে গেল।’

ভাঙনের শিকার জুলহাস সরদার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার বাবার ১০০ বিঘা জমি ছিল। এখন ছয় ভাইয়ের ভাগে মাত্র পাঁচ বিঘা জমি আছে। এই জমি দিয়েই সংসার চলে। ধানের থোড় বের হয়েছে। এটুকুও যদি নদীতে চলে যায়, আমরা পুরোপুরি নিঃস্ব হয়ে যাব।’

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতি বছর বর্ষা মৌসুম এলেই এখানে নদীভাঙন শুরু হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ফেলে সাময়িক ব্যবস্থা নেয় বটে, কিন্তু স্থায়ী বাঁধ না থাকায় সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান হয় না। কিছু দিন ভাঙন বন্ধ থাকলেও পরে আবার নতুন করে শুরু হয়। এতে একের পর এক কৃষিজমি, বসতবাড়ি ও অবকাঠামো নদীতে বিলীন হয়ে যায়।

এলাকাবাসীর ভাষ্য, প্রায় ২৫ বছর ধরে এই এলাকায় পদ্মার ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। এর মধ্যে শত শত বিঘা কৃষিজমি, ঘরবাড়ি ও সামাজিক অবকাঠামো নদীতে চলে গেছে। বহু পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে অন্যত্র চলে গেছে।

দেবগ্রাম ইউপি চেয়ারম্যান হাফিজুল ইসলাম বলেন, ‘এবার অসময়ে ভাঙন শুরু হয়েছে। এখনই জিওব্যাগ ফেলে জরুরি ব্যবস্থা নেয়া দরকার। এখানে চারটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কয়েকটি মসজিদ, ঈদগাহ ও কবরস্থান রয়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে সব কিছু নদীতে চলে যাবে।’

একই এলাকার কৃষক আবদুল হামিদ মৃধা ও মজিদ ব্যাপারী বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে শুধু আশ্বাসই পাচ্ছি। প্রতিবার এমপি-মন্ত্রী আসেন, প্রতিশ্রুতি দিয়ে যান; কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না।’

নদীভাঙন রোধে স্থায়ী প্রকল্প নিয়েও নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে নদী রা বাঁধ নির্মাণে নিম্নমানের কাজ, বরাদ্দের অপচয় এবং দুর্নীতির ঘটনা বারবার সামনে এসেছে। জামালপুর, সিরাজগঞ্জ ও কুড়িগ্রামে পাউবোর একাধিক প্রকল্পে নিম্নমানের জিওব্যাগ ব্যবহার ও কাজের অনিয়ম নিয়ে দুদকের তদন্তও হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টেকসই পরিকল্পনা ও সঠিক তদারকি ছাড়া নদীভাঙন রোধ সম্ভব নয়।

গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাথী দাস বলেন, ‘অসময়ে পদ্মার ভাঙনের কারণে ফসলের বড় তির আশঙ্কা রয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। যৌথভাবে এলাকা পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

রাজবাড়ী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) মো: তাজমিনুর রহমান বলেন, ‘ইতোমধ্যে একটি টিম সেখানে পাঠানো হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয়া হবে। বিশেষ করে স্কুল, মসজিদ ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রায় দ্রুত পদপে নেয়া হবে।’

এ দিকে ভাঙন আতঙ্কে স্থানীয়রা নদীর পাড়ে ভিড় করছেন। কেউ কাঁচা পাট কেটে নিচ্ছেন, কেউ দ্রুত ফসল কেটে নেয়ার চেষ্টা করছেন। পদ্মা নদীতে হারিয়ে যাওয়ার আগে শেষ সম্বলটুকু বাঁচাতেই এখন তাদের মরিয়া চেষ্টা।