দক্ষিণ প্লাজায় নতুন এমপি ও মন্ত্রিসভার শপথ কাল

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের অপেক্ষা শেষ হতে চলেছে। আগামীকাল মঙ্গলবার, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সকাল ১০টায় শপথ নেবেন। এরপর দুপুর ১২টায় জাতীয় সংসদ ভবনের সরকারি দলের সভাকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের সভায় সংসদ নেতা নির্বাচিত হবেন। একই দিনে বিকেল ৪টায় প্রধানমন্ত্রীসহ নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যরাও শপথগ্রহণ করবেন। সাধারণত বঙ্গভবনে শপথ অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। তবে, রীতি ভেঙে নতুন সরকারের শপথ বঙ্গভবনের বাইরে সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় আয়োজন করা হয়েছে।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বিএনপির ইচ্ছাতেই এই ব্যতিক্রমী আয়োজনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে বলে জানা যায়। কারণ এই সংসদ সব রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। যেখানে ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগ এবং গণ-অভ্যুত্থানের ত্যাগ, কষ্ট ও বেদনার স্মৃতি রয়েছে। সেখানে জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। এর আগে জুলাই ঘোষণাপত্র এখানেই পাঠ করা হয়। এখানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও সাবেক বিরোধীদলীয় নেতা বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা হয়েছিল। বিভিন্ন কারণে স্মরণীয় দক্ষিণ প্লাজাটি বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের শপথ অনুষ্ঠান আরেক নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

সংসদ সচিবালয় সূত্র জানায়, শপথগ্রহণের জন্য ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী সংসদ সদস্যদের গতকাল রোববার আমন্ত্রণপত্র পাঠানো হয়েছে। তাদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। আগামীকাল মঙ্গলবার সকাল ১০টায় জাতীয় সংসদ ভবনের শপথকক্ষে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পাঠ করাবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এস এম নাসির উদ্দীন। এরপর সংসদ সদস্যরা শপথ বইয়ে স্বাক্ষর করবেন, ছবি তুলবেন এবং অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নিবেন।

নিয়ম অনুযায়ী, সংসদ সদস্যদের শপথের পর দুপুর ১২টায় নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বিএনপির সংসদীয় দলের সভা অনুষ্ঠিত হবে। সেখান থেকে দলনেতা নির্বাচিত হবেন। তারপর দলের নেতা রাষ্ট্রপতির সাথে দেখা করে বলবেন, সংসদে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে। তাকে সরকারপ্রধান করার জন্য রাষ্ট্রপতির প্রতি অনুরোধ জানাবেন তিনি। রাষ্ট্রপতি দলনেতাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেবেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী তার মন্ত্রিসভায় সদস্যদের নির্বাচিত করবেন। প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ পাঠ করাবেন রাষ্ট্রপতি।

সংশ্লিষ্টরা জানান, আগামীকাল মঙ্গলবার বর্ণাঢ্য আয়োজনের মাধ্যমে দেশ পরিচালনা ও ত্রয়োদশ সংসদের কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হবে। বিকেল ৪টায় উৎসবমুখর পরিবেশে সংসদের দক্ষিণপ্লাজায় উন্মুক্ত মঞ্চে হাজারো অতিথির উপস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি মো: শাহাবুদ্দিন প্রথমে প্রধানমন্ত্রীকে শপথ পড়াবেন। এরপর পর্যায়ক্রমে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের শপথ পড়াবেন। শপথের পর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে দফতর বণ্টন করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। আর নতুন সরকারের শপথগ্রহণের মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের বিলুপ্তি ঘটবে।

অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল জানান, দীর্ঘ প্রতীক্ষিত জাতীয় নির্বাচনের পর এখন রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তান্তরের চূড়ান্ত প্রস্তুতি চলছে। মঙ্গলবার একদিনেই সম্পন্ন হতে যাচ্ছে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য এবং নতুন মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ। ঐতিহ্যের ব্যত্যয় ঘটিয়ে এবার বঙ্গভবনের পরিবর্তে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠান আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সাধারণত বঙ্গভবনে মন্ত্রিসভার শপথ হয়। কিন্তু এবার সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় এই অনুষ্ঠান আয়োজনের ইচ্ছা প্রকাশ করেছে বিজয়ী দল বিএনপি। সেই অনুযায়ী প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। তিনি আরো জানান, সাধারণত বিদায়ী স্পিকার নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ান, কিন্তু এবার স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে সংবিধান অনুযায়ী সিইসি এই দায়িত্ব পালন করবেন।

এ দিকে, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনের ২৯৯ আসনের মধ্যে ২৯৭ আসনের ফল গেজেট আকারে প্রকাশ করেছে। নির্বাচনে বিএনপি ২০৯ আসনে জয় পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। আর জামায়াতে ইসলামী ৬৮ আসন নিয়ে প্রধান বিরোধী দলে বসতে যাচ্ছে। ছয়টি আসন নিয়ে তৃতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে সংসদে যাচ্ছে ২০২৪-এর জুলাই-আগস্টে অনুষ্ঠিত ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মধ্যে জন্ম নেয়া তরুণদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। সংসদ নির্বাচনের গেজেট প্রকাশের পর থেকেই শপথ আয়োজনের প্রস্তুতি শুরু করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও সংসদ সচিবালয়। নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের স্বাগত জানাতে জাতীয় সংসদ ভবনকে প্রস্তুত করা হয়েছে। সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় শপথ অনুষ্ঠানসহ অধিবেশনের প্রস্তুতির কাজ চলছে। শপথ গ্রহণকে কেন্দ্র করে কঠোর নিরাপত্তাব্যরবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব কানিজ মওলা জানিয়েছেন, আগামী মঙ্গলবার শপথ অনুষ্ঠানের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। সংসদীয় গণতন্ত্রের এই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তকে সুশৃঙ্খল, মর্যাদাপূর্ণ ও সফল করতে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। সংসদ ভবনের সংস্কারকাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। শপথ কক্ষ ও সেখানকার সাউন্ড সিস্টেম প্রস্তুত রাখা হয়েছে। অনুষ্ঠানের লাইভ সম্প্রচার করার জন্য বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেশাদারত্ব, আন্তরিকতা ও দায়িত্বশীলতার সাথে নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

সংসদ সচিবালয় সূত্র জানিয়েছে, নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের জন্য জাতীয় সংসদ ভবন নতুনভাবে সাজানো হচ্ছে। ভবনের অভ্যন্তরে ধোয়া-মোছার কাজ চলছে এবং সবকিছু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে। সংসদের বাইরে সদস্যদের বরাদ্দ করা কক্ষগুলো সাজানোর কাজও চলছে। গণ-অভ্যুত্থানের সময় যেসব অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, সেগুলো মেরামত করা হয়েছে। সংসদের শপথ কক্ষ প্রস্তুত করা হয়েছে। নবনির্বাচিত সদস্যদের স্বাক্ষর গ্রহণ ও পরিচয়পত্র দেয়ার জন্য ছবি তোলার বুথ স্থাপন করা হয়েছে।