৭ বছরে নির্মাণ ব্যয় ৬০ শতাংশ বেড়েছে

গ্রামীণ সড়ক অবকাঠামো উন্নয়ন

Printed Edition

হামিদুল ইসলাম সরকার

বছর গড়ালেই দেশের উন্নয়ন প্রকল্পের খরচ বৃদ্ধি পায়। গত ৭ বছরে গ্রামীণ সড়ক অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যয় গড়ে প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়েছে। গতকাল অনুমোদন দেয়া মানিকগঞ্জের ও সাতক্ষীরার গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের খরচ বিশ্লেষণে এই তথ্য পাওয়া গেছে। সেখানে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে সড়ক (বিসি) নির্মাণ খরচ একই হলেও গ্রামের সড়ক নির্মাণে খরচ ওই দুই এলাকার সাথে কিলোমিটারে ব্যবধান ২৮ লাখ টাকা। প্রতি কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণে খরচ এক কোটি ৩৩ লাখ টাকা। যেখানে ২০১৮ সালে দেশের উত্তর-মধ্যমাঞ্চলের গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে খরচ ৬৫ থেকে ৮০ লাখ টাকা ছিল প্রতি কিলোমিটারে। ২০১৮ সালে নেয়া গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে নির্মাণ খরচের তুলনায় মানিকগঞ্জের প্রকল্পের ব্যয় কিলোমিটারে গড়ে ৫০ লাখ টাকা বেড়েছে। মানিকগঞ্জের গ্রামীণ এই অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫০ কোটি টাকা। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ (এলজিইডি) এই প্রকল্পের জন্য পরামর্শক খাতে প্রতি মাসে চার লাখ টাকা বেশি হবে বলে প্রকল্পের প্রস্তাবিত ব্যয় থেকে জানা গেছে।

স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রস্তাবনা থেকে জানা গেছে, দেশের প্রায় মধ্যভাগে অবস্থিত ঢাকা বিভাগের মানিকগঞ্জ জেলার জিডিপিতে অবদান দেশের অন্যান্য জেলার তুলনায় অনেক বেশি। এ জেলায় একই সাথে শিল্প, কৃষি, পর্যটন ও বিভিন্ন ধরনের অকৃষিজাত পণ্য উৎপাদিত হয়। এ জেলার এলাকাগুলো ক্রমশ শিল্পসমৃদ্ধ শহরে রূপ নিচ্ছে। ঢাকা মহানগরকে কেন্দ্র করে, ঢাকা সংলগ্ন জেলাগুলোতে বিশাল কৃষি ও অকৃষি পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে যার মধ্যে মানিকগঞ্জ অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। মানিকগঞ্জ জেলা ৭টি উপজেলা নিয়ে গঠিত যার আয়তন এক হাজার ৩৭৮.৯৯ বর্গকিলোমিটার। ‘জনশুমারি ও গৃহগণনাকৃত ২০২২’ এ প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী মানিকগঞ্জ জেলার গণনাকৃত মোট জনসংখ্যা ১৫ লাখ ৫৮ হাজার ২৪ জন। যার মধ্যে পুরুষ সাত লাখ ৫১ হাজার ৭৮৪ জন, নারী আট লাখ পাঁচ হাজার ৮৯০ জন ও হিজড়া ১০৭ জন। এ জেলায় ১৩৭টি হাট বা বাজার, ২৮টি গ্রোথ সেন্টার, ৮৬৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রায় তিন হাজারটি শিল্প-প্রতিষ্ঠান ও কলকারখানা রয়েছে। কাজেই এ অঞ্চলের অবকাঠামো উন্নয়ন হলে অধিকতর কর্মসংস্থান ঘটবে। শিল্প এবং কৃষি-অকৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং দেশের জিডিপি বৃদ্ধিতে তা প্রভাবক হিসেবে কাজ করবে। মানিকগঞ্জ জেলার ৪৪.৯০ শতাংশ অর্থাৎ উপজেলাগুলোতে ইতোমধ্যে এক হাজার ৫৭৫.৭০ কিমি সড়ক উন্নয়ন করা হয়েছে। যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। বাস্তব প্রয়োজনের নিমিত্তে গ্রামীণ যোগাযোগব্যবস্থাকে উন্নতকরণ তথা প্রকল্প এলাকার আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নের নিমিত্তে প্রস্তাবিত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের গুরুত্ব রয়েছে। চার বছরে এই প্রকল্পটি সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়নের জন্য একনেকে গতকাল অনুমোদন দেয়া হয়েছে।

আর সাতক্ষীরার গ্রামীণ সড়ক উন্নয়নে ব্যয় অনুমোদন দেয়া হয়েছে এক হাজার ৯৩০ কোটি টাকা। এটিও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর বাস্তবায়ন করবে। এই প্রকল্পে পরামর্শক খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ২১২ জনমাসের জন্য ৪ কোটি ৯০ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

খরচের বিশ্লেষণ

মানিকগঞ্জে উপজেলা পর্যায়ে এই প্রকল্পের আওতায় ২৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৮.২৮ কিলোমিটার সড়ক নতুন করে নির্মাণ করা হবে। এখানে প্রতি কিলোমিটারে খরচ হবে এক কোটি ৩৩ লাখ টাকা। আর ইউনিয়ন পর্যায়ে ১৩ কোটি ৩ লাখ টাকা ব্যয়ে ৯.৮ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করা হবে নতুন করে। এতে প্রতি কিলোমিটারে খরচ হবে এক কোটি ৩২ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। এখানে গ্রামীণ নতুন সড়ক নির্মাণ করা হবে ১৬০.২৮ কিলোমিটার। যার খরচ ১৬৯ কোটি ১০ লাখ ৬০ হাজার টাকা। ফলে এখানে প্রতি কিলোমিটারে খরচ পড়বে এক কোটি ৫ লাখ টাকা। ইউনিয়ন ও উপজেলার সাথে গ্রামীণ সড়ক তৈরিতে ব্যয় ব্যবধান ২৮ লাখ টাকা।

সদ্য অনুমোদনপ্রাপ্ত সাতক্ষীরার গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পেও একই চিত্র। সেখানে উপজেলা পর্যায়ে এক কিলোমিটার রাস্তা বানাতে ব্যয় এক কোটি ৪১ লাখ টাকা। ৯.৮৪ কিলোমিটার রাস্তা তৈরিতে খরচ ১৩.৮৮ কোটি টাকা। ইউনিয়ন পর্যায়ে ৪০.০৯২ কিলোমিটার রাস্তা তৈরির জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৬ কোটি ৯০ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। এখানে কিলোমিটারে ব্যয় হচ্ছে এক কোটি ১৬ লাখ টাকা। আবার গ্রামের রাস্তা নির্মাণেও একই খরচ, এক কোটি ১৬ লাখ টাকা। ৪৬৩ কিলোমিটারের বেশি রাস্তা বানাতে খরচ ধরা হয়েছে ৫৪২ কোটি টাকার বেশি।

তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, উত্তর-মধ্যাঞ্চল অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প নামে ২০১৮ সালে যে নেয়া হয়েছিল তাতে প্রতি কিলোমিটার রাস্তা বানাতে ৭২ লাখ থেকে ৯১ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় ধরা হয়। ওই সময়ে নেয়া রাজশাহী ও সিলেটের গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের খরচও একই ধরনের ছিল। প্রভাতী প্রকল্পে গ্রাম সড়ক উন্নয়নের পরিকল্পনা রাখা হয়েছে ২৩৫ কিলোমিটার। এখানে ব্যয় ধরা হয়েছিল ২০৩ কোটি ৯ লাখ টাকা। প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হচ্ছে ৮৬ লাখ ৪২ হাজার টাকার বেশি। সিলেটে এই ব্যয় ৬৫ লাখ টাকা, রাজশাহীতেও ৬৫ লাখ টাকা। রেট সিডিউল পরিবর্তনে এখন সাত বছর পর কিলোমিটারে ব্যয় বেড়েছে গড়ে ৫০ লাখ টাকা।

পরিকল্পনা কমিশনের পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনেক সময় সমীক্ষাগুলো সঠিকভাবে বা সঠিক প্রতিষ্ঠান দিয়ে করা হয় না। যার কারণে ব্যয়ও সঠিকভাবে নির্ধারণ করা হয়। এতে করে রাষ্ট্রের অর্থের অপচয় হয়।