আহসান হাবীব শিবচর (মাদারীপুর)
আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত মাদারীপুর-১ (শিবচর) আসনে আসন্ন সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মাঠ এখন বেশ সরগরম। জামায়াত, বিএনপি, ইসলামী আন্দোলন ও একাধিক স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যাপক গণসংযোগ ও প্রচারণায় নেমেছেন। জনসভা, কর্মিসভা, হাটবাজার ও সামাজিক অনুষ্ঠানকে ঘিরে প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপে নির্বাচনী আমেজ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী শিবচর উপজেলা আমির সারোয়ার হোসাইন মৃধাকে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করেছে। ইসলামী আন্দোলন থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন শিবচর উপজেলা ওলামা-তোলাবা ঐক্য পরিষদের সভাপতি মাওলানা আকরাম হোসাইন (হাফেজ)। দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র প্রভাব ও সাবেক এমপি নূর-ই-আলম (লিটন) চৌধুরীর কর্তৃত্বে বিরোধীদের রাজনীতি করার সুযোগ ছিল না বললেনই চলে। জুলাই বিপ্লবের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে পরিস্থিতি বদলে যায়। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়ায় দলটির নেতাকর্মীদের অনেকে আত্মগোপনে রয়েছেন। ফলে বিরোধী দল ও নতুন প্রার্থীদের জন্য মাঠ এখন উন্মুক্ত।
মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থীরা শিবচরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়াচ্ছেন। ভোটারদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ, আগাম ভোট প্রার্থনা এবং সমর্থক জোগাড় করতে গ্রাম থেকে উপজেলা পর্যন্ত রাজনৈতিক তৎপরতা এখন চোখে পড়ার মতো।
জামায়াত প্রার্থী সারোয়ার হোসাইন মৃধা ইতোমধ্যে গ্রাম, ওয়ার্ড, ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে গণসংযোগ শুরু করেছেন। ভোটকেন্দ্রভিত্তিক নির্বাচন পরিচালনা কমিটিও গঠন করা হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে তার প্রচারণায় ইতিবাচক সাড়া মিলছে বলে দাবি দলটির। ইসলামী আন্দোলনও সমানতালে সক্রিয় রয়েছেন মাঠে। এ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন শিল্পপতি কামাল জামান মোল্লা ও সাজ্জাদ হোসেন সিদ্দিকী (লাবলু)।
এ ছাড়া বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মাওলানা সাঈদ উদ্দিন আহমেদ হানজালা, গণ-অধিকার পরিষদের রাজীব মোল্লা, লেবার পার্টির হাফিজুর রহমান এবং কমিউনিস্ট পার্টির আব্দুল আলী নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন। তবে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এ আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত না করায় তাদের কোনো মনোনয়ন জমা পড়েনি। জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক জহিরুল ইসলাম মিন্টুও নিয়মিত গণসংযোগ ও বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন।
জামায়াত প্রার্থী সারোয়ার হোসাইন মৃধা বলেন, ভোটারদের কাছে ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের আহ্বান জানানো হচ্ছে। দুর্নীতি ও অনিয়মমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে জামায়াতকে সুযোগ দেয়ার দাবি জানান তিনি।
বিএনপি মনোনীত প্রার্থী নাদিরা আক্তার বলেন, আওয়ামী লীগ আমলে তিনি ও তার পরিবার চরম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। বিএনপির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, শিবচর আসনটি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে উপহার দিতে চান তিনি। অন্য দিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী কামাল জামান মোল্লা (নুরুদ্দিন) অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন বিএনপির জন্য ত্যাগ স্বীকার করলেও শেষ পর্যন্ত তাকে মনোনয়ন দেয়া হয়নি। তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে থেকে যাওয়ার ঘোষণা দেন।
স্বতন্ত্র প্রার্থী সাজ্জাদ হোসেন সিদ্দিকী (লাবলু) বলেন, জনগণই তার শক্তি। অতীত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, ভোটাররা তাকে সংসদে পাঠাবেন। ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মাওলানা আকরাম হোসাইন বলেন, ইসলামী শাসনব্যবস্থার সুযোগ পেলে শিবচরকে মাদকমুক্ত ও শিক্ষা-চিকিৎসা ক্ষেত্রে উন্নত করা হবে।
খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মাওলানা সাঈদ উদ্দিন আহমেদ হানজালা শিবচরকে ‘মডেল উপজেলা’ হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেন।
মাদারীপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট জাফর আলী মিয়া বলেন, দলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান তিনি।
সব মিলিয়ে আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত মাদারীপুর-১ আসনে এবারের নির্বাচন যে কঠিন ও বহুমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপ নিতে যাচ্ছে, তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।



