আলি জামশেদ বাজিতপুর (কিশোরগঞ্জ)
কিশোরগঞ্জের নিকলীতে ঘোড়াউত্রাসহ একাধিক নদীর বুক থেকে রাতের আঁধারে অবৈধ বালু উত্তোলনের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সীমাহীন এসব অনিয়মের পরও থামছে না বালুখেকোদের দৌরাত্ম্য। এতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, হাওরের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী একটি চক্র এর পেছনে সক্রিয় থাকলেও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ না থাকায় তাদের তৎপরতা দিন দিন বাড়ছে। এবার এসব অপকর্মের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে নিকলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের গোপনীয় শাখার (সিএ) পদে কর্মরত মোহাম্মদ পারভেজ মিয়ার নাম।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পারভেজ মিয়া ২০১৯ সাল থেকে একই কর্মস্থলে কর্মরত রয়েছেন। গুরুত্বপূর্ণ এই পদে দীর্ঘসময় অবস্থানের কারণে তাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের সাথে সমন্বয়ের সুযোগ নিয়ে তিনি প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। যদিও পারভেজ মিয়া এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
স্থানীয়দের দাবি, তাকে দ্রুত নিকলী থেকে সরিয়ে জেলার বাইরে দূরে কোথাও স্থানান্তরের পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধানী তদন্ত হওয়া দরকার। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিনের এই চাকরির সুবাদে তিনি কৌশল ও ধূর্ততার আশ্রয় নিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার গুজাদিয়া ইউনিয়নের হাইধনখালী গ্রামে তার জন্ম।
নিকলীর বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ বালু উত্তোলন ও পাইপ স্থাপনের বিষয়ে অনুসন্ধানে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। জারইতলা ইউনিয়নের জালালাবাদ এলাকায় বালু ভরাট ও পাইপ স্থাপন নিয়ে যখন আলোচনা চলছে, তখন সেখানে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার গাড়িচালকসহ পারভেজ মিয়াকে দেখা যায়। বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি দাবি করেন, অবৈধ পাইপ উচ্ছেদের জন্যই তিনি পরিদর্শনে গেছেন। এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেহেনা মজুমদার মুক্তির সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বালু উত্তোলনের ঘটনায় জব্দ করা ড্রেজার নদী থেকে রহস্যজনকভাবে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। জারইতলার বিভিন্ন স্থানে বালু পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত আট ইঞ্চি লোহার পাইপ রাস্তার পাশে পড়ে থাকলেও তা অপসারণ করা হয়নি। ফলে নতুন করে চুক্তির মাধ্যমে বালু ভরাটের আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া নিকলী সদরের কৈবতহাটি ঘাট থেকে কুমাড়চড়ার সামনে দিয়ে দরগাবাড়ি কবরস্থানের দক্ষিণ পাশের প্রাচীন পুকুর ভরাটের লক্ষ্যে সপ্তাহখানেক ধরে পাইপ স্থাপনের দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিকল্পিত ও অবৈধভাবে নদী থেকে বালু উত্তোলন করলে নদীর তলদেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়। এর ফলে নদীর গতিপথ পরিবর্তন, তীব্র নদীভাঙন এবং আশপাশের বসতি ও কৃষিজমি ঝুঁঁকিতে পড়ে। নিকলীর মতো হাওর অঞ্চলে এর প্রভাব আরো গভীর। কারণ জলাশয়গুলো শুধু পানির প্রবাহ ধরে রাখে না, এগুলো দেশীয় মাছের প্রধান প্রজনন ক্ষেত্রও বটে। অতিরিক্ত বালু উত্তোলনের ফলে মাছের আবাসস্থল ধ্বংস হলে বংশবিস্তার বাধাগ্রস্ত হয়, যা হাওরের সাধারণ মানুষের জীবিকাকে মারাত্মক সঙ্কটের মুখে পড়ে।
এ ব্যাপারে স্থানীয়রা হাওর ও নদী রক্ষায় কিছু সুনির্দিষ্ট দাবি জানিয়েছেন। দাবিগুলো হলো : অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে নিয়মিত ও কঠোর অভিযান পরিচালনা করা। নদী ও সড়ক থেকে ব্যবহৃত ড্রেজার ও পাইপ স্থায়ীভাবে অপসারণ করা। সুনির্দিষ্ট অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রশাসনের সব পর্যায়ে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। নদী ও হাওরের পরিবেশগত জরিপ পরিচালনা করা এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে শক্তিশালী নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের সিএ মোহাম্মদ পারভেজ মিয়া বলেন, ‘আমি ২০১৯ সাল থেকে নিকলীতে কর্মরত থাকলেও কোনো ধরনের অনিয়মের সাথে জড়িত নই। অপরাধীদের সাথে আমার কোনো যোগসাজশ নেই এবং অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও সত্য নয়।’



