মোহাম্মদ আব্দুল্লা হেল বাকী
রাজা মশাই ঘরে-বাইরে তুমুল জনপ্রিয়। তিনি ইনসাফের রাজা নামে পরিচিত। ঘরে যেমন ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করেছেন, তেমনি রাজ্যেও। তার চার রানী। রানীদের মধ্যে কোনো কলহ-বিবাদ নেই। আছে চরম সখিত্ব।
এক প্রাসাদেই চার রানী নিয়ে রাজা মশাই বাস করেন। চার রানী রাজা মশাইয়ের খুব যতœ নেয়। রাজা মশাইও চার রানীকে খুব ভালোবাসেন। তাদের ভালোবাসা নিয়ে রাজ্যে অনেক জনশ্রুতি আছে। রানীদের মধ্যে এমন সখিত্ব দৃষ্টান্ত হওয়ার মতো। রাজপ্রাসাদে উপচে পড়া সুখ। তার প্রজারাও অনেক সুখে আছে। রাজ্যে কোনো হাহাকার নেই। রাজা মশাই খুব শৌখিন। শিল্পমনা। চার রানীকে নিয়ে হইহুল্লেøাড় করেই তার দিন কাটে। রাজপ্রাসাদের কাছেই দৃষ্টিনন্দন একটি মসজিদ নির্মাণ করেছেন। এই মসজিদে তিনি সাধারণ প্রজাদের সাথে নামাজ পড়েন। তিনি সুখে গা ভাসিয়ে দেন না। তিনি প্রায়ই বলেন, ‘দুনিয়ার সুখ ক্ষণস্থায়ী, পরকালের সুখ চিরস্থায়ী। ধনী-গরিবে তার কাছে কোনো ভেদাভেদ নেই। একদিন জোহরের নামাজের সময় রাজা মশাইয়ের একটু দেরি হয়ে যায়। তিনি দ্রুত মসজিদে যান। সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠে হাঁপিয়ে যান। জামাত তখনো শুরু হয়নি। তিনি ইমাম সাহেবকে বললেন, ‘জামাত এখনো শুরু করেননি কেন?’
‘আলমপনা, আমরা আপনার জন্য অপেক্ষা করছিলাম।’ জবাব দিলেন ইমাম সাহেব। ‘দুনিয়ার কোথাও নিয়মের বালাই না থাকলেও মসজিদে থাকবে। এখানে সবার জন্য একই নিয়ম চালু থাকবে। এ কথা বলে নামাজ শুরুর আদেশ দিলেন। নামাজে দাঁড়ানোর সাথে সাথে তার অস্থির লাগা শুরু হলো। ভয়াবহ অস্থিরতা। নামাজ পড়ে বাসায় চলে এলেন। রানীরা ঘিরে ধরল। তার কোনো কিছুই ভালো লাগছে না। খিদে নেই। যখন কোনো সমস্যার সমাধান বের করতে পারেন না, তখন চরম অস্থির লাগে। আজ থেকে ২৫ বছর আগে, এক মেলায় গিয়ে, এক শিশুকে কোলে নিয়ে আদর করেছিলেন। আজ সে কোথায় আছে? জীবিত আছে, না কি মরে গেছে? তাকে কি খুঁজে বের করা সম্ভব? এরকম নানা ঘটনা উপঘটনা মনে ভিড় করছে আর অস্থিরতা বাড়াচ্ছে। এ এক ভয়াবহ মানসিক বিপর্যয়। জীবনকে খুব দুর্বিষহ মনে হচ্ছে। রাজার বয়স ৫০। তিনি ভাবলেন আরো যদি ২৫-৩০ বছর বেঁচে থাকেন- এ জীবন উনি কেমনে বয়ে বেড়াবেন। এত যন্ত্রণা সইবেন কীভাবে! তার মনে হচ্ছে এ রোগের কোনো চিকিৎসা নেই। একমাত্র মৃত্যুই তাকে এ যন্ত্রণার হাত থেকে বাঁচাতে পারে। তার সাধের অমরাবতী নরকপুরীতে পরিণত হলো।
রাজা মশাই জানালার ধারে বসে দূর দিগন্তের দিকে তাকিয়ে আছেন। এক লোক কাঁধে বাঁক নিয়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি গাওয়াল করছে। আরেক লুলা ফকির ফকিরানির কাঁধে হাত রেখে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে। তাদের দেখে মনে হলো নিশ্চয় তারা তার চেয়ে সুখী। তাদের তো তার মতো অস্থিরতা নেই! তার মনে হলো সুখ আসলে কী? ওই যে, ফকির আর ফকিরানী ভিক্ষা করে দিনশেষে তাদের কুঁড়েঘরে ফেরে। দুজনে মিলে রান্নাবান্না করে। খেয়ে দেয়ে সারাদিনের ক্লান্তি নিয়ে গভীর ঘুম দেয়। সকাল বেলা আবার খাবার তালাশে বের হয়। এ নিয়ে তাদের মনে কোনো খেদ না থাকলে সে সুখী। আমার চারদিকে ঐশ্বর্য ছড়ানো। যেদিকে তাকাই মনে হয় অনাবিল সুখ ছড়ানো। কোনো কিছুর অভাব নেই। কিন্তু আমার মনে শান্তি নেই। মনে হয় জীবন থেকে বিদায় নিতে পারলেই বাঁচি! একে কি আমি সুখ বলব? সুখ কি সোনার খাটে থাকে? না কি সোনার চামচে? আসলে সুখের বাড়ি মানুষের মনে।



