নয়া দিগন্ত ডেস্ক
গত ১২ ফেব্রুয়ারি সারা দেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচন মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হলেও ফল ঘোষণার পর দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। এতে মুন্সীগঞ্জে এক যুবক নিহত হয়েছেন। বিভিন্ন স্থানে আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক। এ ছাড়া বাড়িঘর ভাঙচুরসহ বাড়ি ও মোটরসাইকেলে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে।
মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, মুন্সীগঞ্জে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতায় মো: জসিম নায়েব (৩০) নামে এক যুবক নিহত হয়েছেন। তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী মো: মহিউদ্দিনের সমর্থক ছিলেন। শুক্রবার দুপুরে সদর উপজেলার আধারা ইউনিয়নের চর আব্দুল্লাহ গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নিহত জসিম নায়েব ওই এলাকার মাফিক নায়েবের ছেলে।
নিহতের বড় ভাই মো: মশিউর রহমান অভিযোগ করেন, ডা: নাসিরের ছেলে সাকিবের নেতৃত্বে প্রায় দুই শতাধিক সমর্থক তাদের বাড়িতে হামলা চালায়। হামলায় তার ভাই গুরুতর আহত হন। অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঢাকায় নেয়া হলেও শেষ পর্যন্ত বাঁচানো যায়নি।
ঝালকাঠি প্রতিনিধি ও কাঁঠালিয়া সংবাদদাতা জানান, ঝালকাঠির কাঁঠালিয়ায় জামায়াতের কর্মী সমর্থকদের চারটি বাড়ি, দু’টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং ইউনিয়ন জামায়াতের অফিসে হামলা ও ভাঙচুর করেছে বিএনপির নেতাকর্মীরা। এ সময় দুই নারী আহত হন। এ ঘটনায় দুই বিএনপি কর্মীকে গ্রেফতার করেছে কাঁঠালিয়া থানা পুলিশ।
গতকাল দুপুরে জামায়াত কর্মী জহিরুল ইসলাম দুলাল বাদি হয়ে পাটিখালঘাটা ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক ইউপি সদস্য মো: মিজানুর রহমান কালাম মেম্বারকে প্রধান আসামি করে ১৯ জনের বিরুদ্ধে কাঁঠালিয়া থানায় মামলা করেছেন।
উপজেলার পাটিখালঘাটা ইউনিয়নের বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক ইউপি সদস্য মো: মিজানুর রহমান কালাম মেম্বারের নেতৃত্বে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের একদল নেতাকর্মী পাটিখালঘাটা গ্রামের জামায়াতে ইসলামীর সমর্থক সাবেক অধ্যক্ষ হারুন অর রশিদের বাড়িতে, তার ভাই মরিচবুনিয়া গ্রামের কামাল জমাদ্দারের বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। হামলাকারীরা হারুন অর রশিদের কুড়ের কুট (গরুর খাবার) আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। হামলায় কামাল জমাদ্দারের স্ত্রী রানু বেগম (৫৬) ও মেয়ে সাবিনা (৩০) আহত হন। একই ইউনিয়নের মোস্তফা মাস্টার, ৪ নম্বর ওয়ার্ড বর্তমান ইউপি সদস্য মো: রিপনের বাড়িতে ভাঙচুর ও হামলা চালায়। পাটিখালঘাটা বাজারের ওষুধ ব্যবসায়ী দুলালের ফার্মেসি এবং আব্দুর রবের চায়ের দোকানে হামলা করে। পাটিখালঘাটা ইউনিয়ন জামায়াত অফিসে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট করে বিএনপির নেতাকর্মীরা। এসব ঘটনায় পাটিখালঘাটা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মো: ফুয়াদ জমাদ্দার (৪২) ও ছাত্রদল নেতা জনি হাওলাদারকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
এ দিকে কাঁঠালিয়ায় নবনির্বাচিত এমপি বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম জামালের নির্বাচন পরবর্তী মতবিনিময় সভা থেকে বাড়ি ফেরার পথে ছাত্রদল কর্মী ইমরান হোসেন (২৭) ও হাসান হাওলাদার (৩০) নামে দুইজনকে মারধর ও মোটরসাইকেল ভাঙচুরের অভিযোগ পাওয়া গেছে। শুক্রবার সন্ধ্যায় উপজেলার আমুয়া ইউনিয়নের ছোনাউটা মাদরাসা বাজারে এ ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে যৌথ বাহিনী ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) ঝালকাঠি-১ (কাঁঠালিয়া-রাজাপুর) আসনের নবনির্বাচিত এমপি রফিকুল ইসলাম জামালের নির্বাচন পরবর্তী মতবিনিময় সভা কাঁঠালিয়া সরকারি পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভায় ইমরান ও হাসান অলির নেতৃত্বে না গিয়ে একারা যাওয়ায় ক্ষিপ্ত হয় ওলি ও তার লোকজন। এর পর বাড়ি ফেরার পথে স্থানীয় ছোনাউটা মাদারাসা বাজারে পৌঁছলে অলি হাওলাদারের নেতৃত্বে ১২-১৪ জন তাদের মোটরসাইকেল থামিয়ে ভাঙচুর ও তাদের মারধর এবং সাথে থাকা টাকা ছিনিয়ে নেয়।
তবে হামলা-ভাঙচুরের অভিযোগ অস্বীকার করে অলি হাওলাদার জানান, ইমরানের সাথে সামান্য তর্কবির্তক হয়েছে। এর বেশি কিছু নয়।
অপর দিকে রাজাপুর উপজেলায় জামায়াতের পক্ষে ভোট চাওয়ায় মো: আসাদ নামে এক যুবককে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে আহত এবং তার বসতঘর ভাঙচুর চালানোর অভিযোগ উঠেছে বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। গতকাল দুপুরে উপজেলার কাঠিপাড়ায় এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। আহত মো: আসাদ শুক্তাগর ইউনিয়নের কাঠিপাড়া এলাকার বাসিন্দা।
নরসিংদী প্রতিনিধি জানান, নরসিংদীর মাধবদীতে বিএনপি-জামায়াতের সংঘর্ষের ঘটনায় সেনা ও পুলিশের যৌথ অভিযানে গতকাল ১১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
এর আগে শুক্রবার রাতে মাধবদী থানার কাঁঠালিয়া ইউনিয়নের ডৌকাদি এলাকায় নির্বাচনী ব্যানার অপসারণ করা নিয়ে দুই দলের স্থানীয় নেতা-কর্মীরা বাগি¦তণ্ডায় জড়ান। পরে তা হাতাহাতিতে রূপ নেয়। এরপর উভয় পক্ষ শক্তি বাড়িয়ে রাত সাড়ে ১১টার দিকে সংঘর্ষে জড়ান। এ সময় উভয় পক্ষের ৩ জন আহত হয় এবং বেশ কয়েকটি ঘরে হামলা করা হয়। আহতদের পাশ্ববর্তী আড়াইহাজার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হলে গুরুতর মুক্তার হোসেনকে ঢামেক হাসপাতালে পাঠানো হয়।
সংঘর্ষের খবর পেয়ে নরসিংদী আর্মি ক্যাম্পের কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল শামীমের নেতৃত্বে পুলিশ, র্যাবের সমন্বয়ে যৌথ বাহিনী ওই এলাকায় রাতভর অভিযান চালিয়ে সংঘর্ষে জড়িত দুই পক্ষের ১১ জনকে গ্রেফতার করেছে।
দাউদকান্দি (কুমিল্লা) সংবাদদাতা জানান, কুমিল্লা-২ সংসদীয় আসনের হোমনা উপজেলার ভাষানিয়া ইউনিয়নের ৯ নং ওয়ার্ডের ডহর গোপ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের বাইরে মারধরের জেরে ফলাফল পরবর্তী ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে, এতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিকার চেয়েছে।
হামলার শিকার নসু মিয়া, জসিম ও শাহ আলম জানান, বৃহস্পতিবার দুপুরে তাতুয়াকান্দির লোকজন জাল ভোট দিতে এলে কেন্দ্রের মূল সীমানায় তাদের সাথে প্রথমে বাগি¦তণ্ডা পরে তিনজনেই হামলার শিকার হয়। এই ঘটনায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে কর্তব্যরত ম্যাজিস্ট্রেট ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে খবর দেয়া হয়।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো হলো- মোহনপুরের ডা: আবুল খায়ের, ডহর গোপের কামরুজ্জামান, ডহরগোপের ভোটার ও পাশ্ববর্তী আলীরচরের নসু মিয়া, ডহর গোপের সৃষ্টি মিয়া, ফাহাদ, নুর জাহান, মানিক, শেফালী, তাহের, মুক্তিযোদ্ধা সামছুলহক, শাহজালাল, জসিম, হবি, ফারুক, রিপন, শাহীন, আলাউদ্দিন, রনি, সেলিম, ভুট্টু, নজরুল, মহিউদ্দিন, মানিক নসু, জুলাস, হানিফ, ইনু, সবুজ, আমির হোসেন ও শফিক। ভাঙচুর ও লুটপাটে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩০ লাখ টাকা হবে।
জামালপুর প্রতিনিধি জানান, জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতার সংবাদ সংগ্রহকালে দেওয়ানগঞ্জের যুবদল নেতার বিরুদ্ধে এক সাংবাদিককে মারপিটের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
আহত সাংবাদিক দৈনিক সংবাদের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা প্রতিনিধি শামছুল হুদা (রতন) জানান, পৌর যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ফারুক আহম্মেদের নেতৃত্বে বিভিন্ন এলাকায় সন্ত্রাসী ও নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতা চালাচ্ছে জিন্নাহ, বাবু, রিপন, সিফাত ও উপজেলার বালুগ্রামের সুমন মিয়াসহ বেশ কিছু যুবদল নেতাকর্মী। শনিবার সকালে তারা দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার চিকাজানি ইউনিয়নের মণ্ডল বাজার জামায়াত নেতা-কর্মীদের বাড়িতে এই সহিংসতা চালায়। খবর পেয়ে আমরা কয়েক জন সাংবাদিক সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে দুর্বৃত্তরা আমাকে মারধর করে। এ সময় উপস্থিতি দেওয়ানগঞ্জ পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আতিকুর রহমান সাজুর পরিবেশ শান্ত করেন। তবে তিনি (সাজু) বিষয়টি নিয়ে আর আগে না বাড়ার নিষেধ করেছেন।
রামগঞ্জ (লক্ষ্মীপুর) সংবাদদাতা জানান, উপজেলার ভাদুর ইউনিয়নের উত্তর সমেষপুর গ্রামে গভীর রাতে দুর্বৃত্তদের দেয়া আগুনে এক জামায়াত কর্মীর বসতবাড়ি ও ভেতরে থাকা ফার্নিচারসহ মালামাল পুড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার রাত আনুমানিক ৩টার দিকে এ ঘটনা ঘটে।
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী নুর হোসেন জানান, ঘটনার সময় তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা বাড়িতে ছিলেন না। এই সুযোগে দুর্বৃত্তরা জানালার গ্লাস ভেঙে ভবনের ভেতরে আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুনে ভবনের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ফার্নিচারসহ মালামাল পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এতে প্রায় ৫ লাখ টাকারও বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
গলাচিপা (পটুয়াখালী) সংবাদদাতা জানান, গলাচিপায় নির্বাচন পরবর্তী সংঘর্ষে দুই নারীসহ ২০ জন আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে গুরুতর আহত ৮ জনকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। এ ব্যাপারে গলাচিপা থানায় ১টি মামলায় ২ জন গ্রেফতার হয়েছেন।
জানা গেছে উপজেলার চর বিশ^াস, চর কাজল, গলাচিপা সদর, ডাকুয়া, বকুলবাড়িয়া ইউনিয়নে এই নির্বাচন পরবর্তী সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে আহতরা হলেন- পারুল (৫০), তানজিলা (১৪), আ: জলিল (৪৫), অমৃত চন্দ্র শীল (৩৫), মনি শংকর(২৯), মো.সরওয়ার (২৫), সজিব সিকদার (২৪), মো: ইসমাইল(৪৫), শামিম হাওলাদার (২৮)-সহ ২০ জন।
টাঙ্গাইল প্রতিনিধি জানান, টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) আসনে বিজয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থীর নেতাকর্মীদের ওপর হামলা ও তাদের বাড়ি ঘর ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে বিএনপির পরাজিত প্রার্থী ওবায়দুল হক নাসিরের বিরুদ্ধে। গতকাল দুপুরে টাঙ্গাইল প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে এসব অভিযোগ করেন বিজয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক প্রতিমন্ত্রী লুৎফর রহমান খান আজাদ। এছাড়া মিথ্যা মামলা দিয়ে নেতাকর্মীদের হয়রানির অভিযোগ তুলে এর প্রতিবাদ জানান তিনি। সংবাদ সম্মেলনে তার আহত নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার রূপগঞ্জ ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের শিমুলিয়া ঘাট এলাকায় বিএনপির কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ করেছে দুর্বৃত্তরা। গতকাল ভোরে এ অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। আগুনে কার্যালয়ের ভেতরে থাকা বেগম খালেদা জিয়া, তারেক রহমান ও নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য মোস্তাফিজু রহমান ভুঁইয়ার ছবি, চেয়ার-টেবিল, টেলিভিশন ও আসবাবপত্রসহ কার্যালয়টি পুড়ে যায়। তাতে ১০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে স্থানীয় বিএনপি নেতারা দাবি করছেন।
দাগনভূঞা (ফেনী) সংবাদদাতা জানান, ফেনীর দাগনভূঞা ছেলে আহত হওয়ার খবর শুনে স্ট্রোক করে মারা গেছেন মা রৌশন আরা বেগম (৬৫)। গতকাল দুপুরে জায়লস্কর ইউনিয়নের পূূর্ব হীরাপুর গ্রামের ইসমাইল হাজী বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। রৌশন আরা ওই বাড়ির মৃত জামাল উদ্দিনের স্ত্রী।
স্থানীয়রা জানান, আবুধাবি প্রবাসী জামাল উদ্দিন দুলাল (৪৩) একনিষ্ঠ জামায়াত কর্মী। তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দেয়ার জন্য দেশে আসেন। ভোট শেষে জামায়াত প্রার্থী মোহাম্মদ ফখরুদ্দিন মানিক হেরে জান। পরে শুক্রবার রাতে সিলোনিয়া বাজারে গেলে যুবদল কর্মী খোনার ফকির হাসানের (৩৯) সাথে দুলালের ভোট নিয়ে বাগি¦তণ্ডা হলে হাসান হাতে ও চোখে মারাত্মক জখমপ্রাপ্ত হন। পরে স্থানীয়রা দুলালকে উদ্ধার করে প্রথমে দাগনভূঞা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেন। সেখান থেকে ফেনী সদর হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করেন। এ বিষয়টি শনিবার সকালে দুলালের মা জানতে পেরে বিমর্ষ হয়ে জান হারান, পরে দুপুর বারোটার দিকে তিনি মারা যান।
সিংড়া (নাটোর) সংবাদদাতা জানান, নাটোরের সিংড়ায় ধানের শীষে ভোট করার অপরাধে এছাতন (৩০) নামের এক নারীর হাতের আঙুল ভেঙে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে পরাজিত স্বতন্ত্র প্রার্থী দাউদার মাহমুদের ঘোড়া প্রতীকের কর্মীদের বিরুদ্ধে। তাকে উদ্ধারে এসে ওই ওয়ার্ডে দায়িত্ব পালনকারী ধানের শীষের এজেন্টসহ আরো আটজনকে মারধর করা হয়েছে। শনিবার সকাল ১০টায় সিংড়া পৌরসভার পারসিংড়া (সাপুড়ে পাড়া) মহল্লায় এই ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার পর অভিযুক্ত স্বতন্ত্র প্রার্থীর কর্মী নিয়ামুল ইসলাম নেহালকে আটক করেছে পুলিশ।
জানা যায়, ধানের শীষের বিজয় ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর পরাজয়ের পর থেকেই সিংড়া পৌর শহরের পারসিংড়া মহল্লায় দু’পক্ষের মধ্যে একাধিকবার তর্কবিতর্ক হয়। এরই জের ধরে শনিবার সকালে ধানের শীষে ভোট করার অপরাধে এছাতন নামে এক নারীকে পিটিয়ে তার হাতের আঙুল ভেঙে দেন পরাজিত স্বতন্ত্র প্রার্থী দাউদার মাহমুদের কর্মী নিয়ামুল ইসলাম ওরফে নেহাল ও তার লোকজন। পরে তাকে উদ্ধারে এসে স্থানীয় সিংড়া চলনবিল মহিলা কলেজে ভোটের দিন দায়িত্ব পালনকারী ধানের শীষের এজেন্ট সুবিনাসহ (৩০) আরো সাত ধানের শীষের কর্মীর ওপর হামলা চালায় স্বতন্ত্র প্রার্থীর কর্মীরা। আহত অন্যরা হলেন- রুপসি (৩০), মুছাম্মা (২৫), তাসলিমা (৩০), পিয়সি (৭০), ফরিদা (৫০), আছলিমা (৬০) ও ইরিনা (১৫)। আহতদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।
এদিকে গুরুদাসপুরে নির্বাচন পরবর্তীপৃথক সহিংসতায় তিনজন আহত হয়েছেন। তাদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষে থানায় অভিযোগ দেয়া হয়েছে।
জানা গেছে, উপজেলার ধারাবারিষা ইউনিয়নের ওয়ার্ড জামায়াতের সভাপতি রাজেদুল ইসলাম বিন্যাবাড়ি বাজারে জামায়াতকর্মী ওমর ফারুকের ওয়ার্কসপে বসে ছিলেন। গতকাল দুপুরে বিএনপিকর্মী মামুন, আয়নাল, ইসলাম, নয়ন, মোনায়েমের নেতৃত্বে ১০-১২ জন ওই ওয়ার্কশপে ঢুকে তাকে মারধর শুরু করেন। হামলাকারীরা মোবাইল ছিনিয়ে নিয়ে ও মোটরসাইকেল ভাঙচুর করে চলে যায়। পরে স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে গুরুদাসপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন।
একই ইউনিয়নের দক্ষিণ নারিবাড়ী গ্রামের আনছার আলীর ছেলে জামায়াত কর্মী সাইদুল ইসলাম দুপুর ২টার দিকে জাদুর মোড়ে চায়ের দোকানে হামলার শিকার হন। হামলাকারী তারেক, ইয়াকুব ও কদম আলী একই গ্রামের বাসিন্দা। তাদের বিরুদ্ধে আহত সাইদুলের ছেলে শাহিন আলম বাদী হয়ে থানায় অভিযোগ দিয়েছেন।
আহত সাইদুল জানান, তিনি দৈনিক হাজিরায় মাইকসহ ভ্যান গাড়িতে জামায়াত প্রার্থীর প্রচারণা চালিয়েছিলেন। এ অপরাধে তাকে মারধর করা হয়েছে।
এ ছাড়া নাটোরের বড়াইগ্রামের ধানাইদহ গ্রামে বিএনপি ও জামায়াত সমর্থকদের সংঘর্ষে ১০ জন আহত, ১২টি বাড়ি ও দোকান ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। আহতদের মধ্যে একজন বিএনপি ও ৯ জন জামায়াতের নেতাকর্মী। সংঘর্ষের সময় কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। খবর পেয়ে জেলা প্রশাসক আসমা শাহীন, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আবদুল ওয়াহাব ও ইউএনও জান্নাতুল ফেরদৌস ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। সংঘর্ষের পর পুলিশ ঘটনায় সাথে জড়িত সন্দেহে চারজনকে আটক করেছে।
সংঘর্ষে আহতরা হলেন- নগর ইউনিয়ন জামায়াতের আমীর হাসিনুর রহমান, ওয়ার্ড বিএনপি নেতা আসাব সরকার, জামায়াত কর্মী রফিকুল ইসলাম, সাকিব, সাব্বির, ইব্রাহীম খলিল সৈয়দ, মনির হোসেন, সাইদুল ইসলাম ও জসিম উদ্দিনের স্ত্রী গৃহবধু নাজমা বেগমসহ ১০জন। এরমধ্যে গুরুতর আহত হাসিনুর রহমানসহ দুইজনকে রামেক হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে এবং অন্যদের ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।
শ্রীনগর (মুন্সীগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার কোলাপাড়া ইউনিয়নের দক্ষিণ পাইকসা পূর্বপাড়া এলাকায় নির্বাচন-পরবর্তী বিরোধকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার বিকেলে এ ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে ধানের শীষ ও ফুটবল প্রতীকের সমর্থকদের মধ্যে আগের উত্তেজনা থেকে কথা কাটাকাটির সূত্রপাত হয়। একপর্যায়ে তা হাতাহাতি ও মারামারিতে রূপ নেয়। সংঘর্ষে উভয় পক্ষের অন্তত আটজন আহত হন।
আহতদের মধ্যে ধানের শীষের সমর্থক পরশ মেম্বার, স্বপন ও অপু এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী আলহাজ মমিন আলীর সমর্থক ওহাব দেওয়ান (৭৫), আলামিন (২৭) ও শুভ মাঝির (২৭) নাম জানা গেছে। এ ছাড়া আরো কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। আহতদের স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে।
ফরিদপুর প্রতিনিধি ও বোয়ালমারী (ফরিদপুর) সংবাদদাতা জানান, ফরিদপুরের সালথা ও বোয়ালমারী উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় আধিপত্য বিস্তার এবং নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক বিরোধের জেরে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। সংঘর্ষ চলাকালে বেশ কিছু বাড়িঘর ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে।
গতকাল সকাল ১০টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত সালথা উপজেলার খারদিয়া ও বোয়ালমারী উপজেলার ময়েনদিয়া বাজার এলাকায় এই সঙ্ঘাত চলে। প্রাথমিকভাবে আহতদের পরিচয় জানা সম্ভব হয়নি।
পুলিশ ও স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ও নির্বাচনে ভোট দেয়া নিয়ে বোয়ালমারী উপজেলার পরমেশ্বরদী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মান্নাস মাতুব্বরের সমর্থকদের সাথে সালথা উপজেলার খারদিয়া গ্রামের টুলু মিয়া ও জিহাদ মিয়ার সমর্থকদের মধ্যে দীর্ঘ দিন ধরে বিরোধ চলে আসছিল। এর জের ধরে শনিবার সকাল ১০টার দিকে এই সংঘর্ষ বাধে। এ সময় বাড়িঘর ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে সংঘর্ষকারীরা। খবর পেয়ে সেনাবাহিনী ও পুলিশ ঘটনাস্থালে গিয়ে সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণ করে।
গৌরনদী (বরিশাল) সংবাদদাতা জানান, বরিশাল-১ (গৌরনদী-আগৈলঝাড়া) আসনে নির্বাচন-পরবর্তী উত্তেজনাকে কেন্দ্র করে দুই উপজেলায় পৃথক ঘটনায় নারীসহ অন্তত তিনজন আহত হয়েছেন। তাদের উদ্ধার করে গৌরনদী ও আগৈলঝাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।
শুক্রবার দুপুরে গৌরনদী উপজেলার মাহিলাড়া এলাকায় ধানের শীষের কর্মী মনির ফকিরকে হাতুড়ি দিয়ে মারধরের অভিযোগ ওঠে একই দলের বেল্লাল খানের বিরুদ্ধে। স্থানীয় সূত্র জানায়, বেল্লাল খানকে স্বতন্ত্র প্রার্থীর ফুটবল প্রতীকের সমর্থক বলে মন্তব্য করেন মনির ফকির। এ নিয়ে কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে বেল্লাল ও তার লোকজন মনিরকে মারধর করেন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে গৌরনদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। তবে বেল্লাল খান হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
অপর দিকে স্বতন্ত্র প্রার্থীর ফুটবল প্রতীকের এজেন্ট হওয়ায় একই উপজেলার কমলাপুর গ্রামের বাসিন্দা ঝুমুর বেগমকে মারধরের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ঝুমুর বেগমের দাবি, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ধানের শীষের সমর্থক মিরাজ হাওলাদারের নেতৃত্বে প্রথম দফায় তার ওপর হামলা করা হয় এবং পরে শুক্রবার রাতে দ্বিতীয় দফায় তার বসতঘরে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়।
এ দিকে একই আসনের আগৈলঝাড়া উপজেলার রতœপুর ইউনিয়নের চাউকাঠী গ্রামের বিএনপি কর্মী জাকির মৃধা অভিযোগ করেন, স্বতন্ত্র প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার আবদুস সোবাহানের ফুটবল প্রতীকের পক্ষে কাজ করার অভিযোগ তুলে শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ধানের শীষের নেতাকর্মীরা তাকে মারধর করেন। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে আগৈলঝাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন।
ফেনী অফিস জানায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরদিন ফেনীতে সায়েম উদ্দিন নামে এক তরুণকে মারধর করেছে বিএনপি কর্মীরা। শুক্রবার রাতে জেলার দাগনভূঞা উপজেলার সিন্দুরপুর ইউনিয়নের কোরবানপুর রাস্তার মাথায় তার ওপর হামলা করা হয়। সায়েম চব্বিশের ৪ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান আন্দোলনে শহরের মহিপালে আওয়ামী অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের প্রতিরোধে থেকে আলোচিত হন। সে দিন হামাগুড়ি দিয়ে ছাদের উপর থেকে মুহুর্মুহু ইটপাটকেল নিক্ষেপের দৃশ্য নেট দুনিয়ায় ভাইরাল হয়।
ছাত্রশিবিরের ফেনী শহর সেক্রেটারি শফিকুল ইসলাম জানান, ঘটনা জেনে তারা হাসপাতালে দেখতে যান। জামায়াতের জেলা আমির মুফতি আব্দুল হান্নান তাকে দেখতে যান। সায়েম স্থানীয় মাছিমপুর এলাকার বাসিন্দা ও ফেনীর আল-জামেয়াতুল মালাহিয়া কামিল মাদরাসার ফাজিলের শিক্ষার্থী।
পীরগাছা (রংপুর) সংবাদদাতা জানান, হারাগাছে অনেক নেতাকর্মীকে ধরে ধরে আক্রমণ করা হচ্ছে এমন অভিযোগ করছেন এনসিপির সদস্যসচিব এবং রংপুর-চার আসনের এগার দলীয় জোট থেকে জয়ী প্রার্থী আখতার হোসেন।
তিনি বলেন, বিকেলে রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার হারাগাছে বিএনপির কর্মীরা মাইকে ঘোষণা দিয়ে এনসিপির নেতাকর্মীদের ধরে ধরে আক্রমণ করছে। মারধর করে রক্তাক্ত করছে। অনেকের বাড়িঘরে ভাঙচুর চালিয়ে স্বর্ণালঙ্কার, টাকা লুটপাট করেছে। মোটরসাইকেল ভাঙচুর করেছে। আগুন দিয়ে বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়ার হুমকি দিচ্ছে। ক্ষমতায় আসতে না আসতেই বিএনপি হারাগাছে সন্ত্রাস শুরু করেছে।



