ডিএসইর সব সূচক কমেছে ২ শতাংশের বেশি

প্রতারণার অভিযোগ এনসিসি ব্যাংক সিকিউরিটিজের বিরুদ্ধে

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে বড় ধরনের সূচক হারিয়েছে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। বাজারটিতে গত সপ্তাহে সবগুলো সূচকের অবনতি ঘটেছে ২ শতাংশের বেশি। এর মধ্যে প্রধান সূচকটি ২ দশমিক ৫৯ শতাংশ, ডিএসই-৩০ ২ দশমিক ১২ শতাংশ ও ডিএসই শরিয়াহ হারিয়েছে ২ দশমিক ৯১ শতাংশ। ৬ সেপ্টেম্বর (রোববার) পাঁচ হাজার ৬৬২ দশমিক ৬৯ পয়েন্ট থেকে সপ্তাহ শুরু করা প্রধান সূচকটি বৃহস্পতিবার সপ্তাহ শেষে নেমে আসে পাঁচ হাজার ৫১৫ দশমিক ১৭ পয়েন্টে। এভাবে প্রধান সূচকটি এ সময় ১৪৬ দশমিক ৯২ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। একই সময়ে অবনতি ঘটে বাজারটির লেনদেন ও বাজার মূলধনের।

বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, চলমান জ্বালানি সঙ্কট, কোম্পানিগুলোর আয় নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থানের কারণে সপ্তাহজুড়ে নিম্নমুখী ছিল দেশের পুঁজিবাজার। শিল্প উৎপাদন ও করপোরেট মুনাফায় গ্যাস-বিদ্যুৎ সঙ্কটের সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগের কারণে বাজারে ক্রয়চাপের তুলনায় বিক্রয়চাপ ছিল বেশি। তাই সপ্তাহের শুরু থেকেই বাজারে ছিল মন্দা ভাব। এর মধ্যে প্রথম দিনই ১০৩ পয়েন্টের বেশি সূচক হারায় ডিএসই। পরদিন সারাদিন প্রচণ্ড বিক্রয়চাপে বাজারটি বড় পতনের দিকে এগোলেও শেষমুহূর্তে তা কাটিয়ে ওঠে সূচকের নামমাত্র উন্নতি ঘটে। পরবর্তী তিনটি কর্মদিবসের সব কয়টিতেই কমবেশি পতন ঘটে বাজার সূচকের।

খাতভিত্তিক লেনদেনে গত সপ্তাহে বস্ত্র খাতের শেয়ারের আধিপত্য ছিল। লেনদেনচিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত সপ্তাহে ডিএসইর মোট লেনদেনের ২৯ দশমিক ৫ শতাংশ দখলে নিয়ে শীর্ষে অবস্থান করছে বস্ত্র খাত। ১৪ দশমিক ২ শতাংশ লেনদেনের ভিত্তিতে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল সাধারণ বীমা খাত। তৃতীয় অবস্থানে থাকা ওষুধ ও রসায়ন খাতের দখলে ছিল লেনদেনের ১০ দশমিক ৪ শতাংশ। ব্যাংক খাত ৭ দশমিক ৮ শতাংশ লেনদেনের ভিত্তিতে তালিকার চতুর্থ অবস্থানে ছিল। আর পঞ্চম অবস্থানে থাকা প্রকৌশল খাতের দখলে ছিল মোট লেনদেনের ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। সপ্তাহটিতে একমাত্র মিউচুয়াল ফান্ড ছাড়া সবগুলো খাতই দরপতনের শিকার ছিল।

এ সময় গড়ে ২৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা লেনদেন করে একক কোম্পানি হিসাবে ডিএসইর লেনদেনে শীর্ষস্থানটি দখলে রাখে টেক্সটাইল খাতের কোম্পানি শার্প ইন্ডস্ট্রিজ যা ছিল বাজারটির সাপ্তাহিক মোট লেনদেনের ৪ দশমিক ২৮ শতাংশ। গড়ে ২৩ কোটি ১৮ লাখ টাকার শেয়ার বেচাকেনা করে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল এ খাতের এনভয় টেক্সটাইলস। সপ্তাহের লেনদেনে কোম্পানিটির অবদান ছিল ৪ দশমিক ১৮ শতাংশ। ডিএসইর লেনদেনে শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে মালেক স্পিনিং, সায়হাম টেক্সটাইলস , সায়হাম কটন মিলস, প্যারামাউন্ট টেক্সটাইলস, বেক্সিমকো ফার্মা, আইপিডিসি, সাউথইস্ট ব্যাংক ও নিটল ইন্স্যুরেন্স।

এ দিকে বিনিয়োগকারীর অনুমতি ছাড়াই শেয়ার কেনাবেচা, মার্জিন হিসাবে নন-মার্জিন শেয়ার কেনা এবং বিও হিসাবে জমা অর্থ সরিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে এনসিসি ব্যাংক সিকিউরিটিজের বিরুদ্ধে। ব্রোকার হাউজটির মিরপুর-১০ শাখার এক বিনিয়োগকারী এ প্রতারণার শিকার হন। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিও হিসেবে জমা থাকা মূল টাকা ফেরত এবং কেটে নেয়া সুদ মওকুফের আবেদন করেছেন ভুক্তভোগী বিনিয়োগকারী আবুল কালাম আজাদ। তার অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (বিএসইসি) নির্দেশ দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ (এফআইডি)। সম্প্রতি বিভাগটির শেয়ারবাজার-১ শাখা থেকে বিএসইসি চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এ নির্দেশ দেয়া হয়।

মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে বলা হয়েছে, মিরপুর-১০ নম্বর এনসিসি ব্যাংক ব্রোকারেজ হাউজে আবুল কালাম আজাদের জমা করা এক কোটি ৪২ লাখ টাকা ফেরত দেয়ার বিষয়ে তার আবেদনটি বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিএসইসিতে পাঠানো হলো। এর আগে গত আগস্টে বিএসইসি চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত আবেদন করেন বিনিয়োগকারী আবুল কালাম আজাদ। ব্রোকারেজ হাউজটির ০৩৯২৬ কোডের বিও হিসাবে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তুলে জমা করা অর্থ ফেরত এবং কর্তন করা সুদের অর্থ মওকুফের আবেদন করেন তিনি।

আবেদনে আবুল কালাম আজাদ অভিযোগ করেন, এনসিসি ব্যাংক ব্রোকারেজ হাউজের মিরপুর-১০ শাখা তার অজ্ঞাতে বিও হিসাবে জমা থাকা এক কোটি ৪২ লাখ টাকা দিয়ে বিভিন্ন শেয়ার কেনাবেচা করেছে। তার দাবি, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নাহিদ, আসিফ, মাকসুদ ও সানি নামের ট্রেডাররা তার অনুমতি ছাড়াই এসব লেনদেন করেছেন। এমনকি তার মার্জিন হিসাবেও নন-মার্জিন শেয়ার কেনা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। অভিযোগে এবি ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, অ্যাসোসিয়েটেড অক্সিজেন ও ম্যাকসন্স স্পিনিংয়ের মতো কয়েকটি কোম্পানির শেয়ারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব শেয়ার কেনার ক্ষেত্রে তার কোনো অনুমতি বা নির্দেশনা নেয়া হয়নি বলেও দাবি করেছেন তিনি। তার মতে, অনুমতি ছাড়া এসব লেনদেনের ফলে তিনি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং তার বিনিয়োগের অর্থে বড় ধরনের লোকসান হয়েছে।

আবেদনে আরো বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ১৩ ও ১৬ নভেম্বরের পোর্টফোলিও তুলনা করলে তার হিসাব থেকে অর্থ সরিয়ে নেয়ার অনিয়মের বিষয়টি পাওয়া যাবে। এ ঘটনায় ব্রোকারেজ হাউজটির সিইও আরেফিন, নাজমা খাতুন ও আদনান দায়ী বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।

অভিযোগ সম্পর্কে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো: আবুল কালাম বলেন, এ বিষয়ে বিএসইসির কাছে একটি অভিযোগ এসেছে। মন্ত্রণালয় থেকেও এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। তাই অভিযোগটি যাচাই করে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, কোনো বিনিয়োগকারীর অনুমতি ছাড়া তার বিও হিসাব ব্যবহার করে শেয়ার কেনাবেচা হয়ে থাকলে সেটি গুরুতর অনিয়মের বিষয়। একইভাবে মার্জিন হিসাবে নন-মার্জিন শেয়ার কেনা কিংবা বিনিয়োগকারীর অর্থ অন্যভাবে ব্যবহারের অভিযোগও নিয়ন্ত্রক সংস্থার মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। তাদের মতে, এ ধরনের অভিযোগ শুধু একজন বিনিয়োগকারীর আর্থিক ক্ষতির বিষয় নয়; এর সাথে ব্রোকারেজ হাউজের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, গ্রাহকের অনুমতি ছাড়া লেনদেন এবং বিনিয়োগকারীর সম্পদ সুরক্ষার বিষয়ও জড়িত।