নিজস্ব প্রতিবেদক
সংবিধান সংস্কারের জন্য নতুন কোনো কমিশনের প্রয়োজন নেই। সংশোধনের জন্য সরকার বা বিরোধী দল সংসদে বিল আনতে পারে। বিল সংসদীয় প্রক্রিয়ায় ভেটিং, আলোচনা ও ভোটের মাধ্যমে পাস হতে পারে; এজন্য আলাদা কমিশন গঠনের প্রয়োজন নেই।
গতকাল রাজধানীতে ১১ দলীয় ঐক্যের উদ্যোগে “জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা, গণভোটার রায় বাস্তবায়ন এবং জুলাই গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার এবং আমাদের বাস্তবতা” শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন, বিরোধী দলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান।
তিনি বলেন, ‘পচে যাওয়া রাজনৈতিক সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন এবং ফ্যাসিবাদের শিকড় উপড়ে ফেলতেই গণভোট। জনগণের এই রায় বাস্তবায়ন হবে এবং তা ব্যর্থ হতে দেয়া হবে না।’ রাজনৈতিক দলগুলো জাতির সাথে তামাশা ও প্রতারণা করলে জনগণ রাজনীতিবিদদের প্রতি আস্থা ও সম্মান হারাবে বলেও মন্তব্য করেন বিরোধী দলীয় নেতা।
তার মতে, যারা সংসদে দাঁড়িয়ে ‘জুলাই সনদ’কে ‘অন্তহীন প্রতারণার দলিল’ বলেছিলেন, তারা জনগণের বিচারবোধকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছেন। তিনি অভিযোগ করেন, অনেকের কাছে নিজ সহযোদ্ধাদের রক্তেরও মূল্য নেই; থাকলে দেশের মানুষের পাশে দাঁড়াতেন। অন্তর্বর্তী সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ১১ দলকে পরাজিত করা হয়েছে। সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলা এড়াতে ১১ দল নির্বাচনের ফল মেনে নিয়েছে।
দীর্ঘ রাজনৈতিক সহযাত্রার কথা স্মরণ করে ডা: শফিক বলেন, একসাথে আন্দোলন, সংগ্রাম, নির্বাচন ও রাষ্ট্র পরিচালনা সত্ত্বেও কিছু রাজনৈতিক মিত্র অতীত সম্পর্ক অস্বীকার করছেন। মান-অভিমান ভুলে জনগণের রায়কে সম্মান জানানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, নতুন বা পুরনো কোনো ফ্যাসিবাদই গ্রহণযোগ্য নয়। দেশ ও জাতির স্বার্থে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আমরা প্রস্তুত।
জুলাই যোদ্ধাদের নিয়ে তিনি সংশ্লিষ্টদের সংযত হওয়ার পরামর্শ দেন এবং আইন হাতে তুলে না নেয়ার কথা বলেন। তবে জুলাইকে অপমান করলে জনগণ ও যুবসমাজ তার জবাব দেবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সেমিনারে অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। এতে গণ-অভ্যুত্থানকে ‘রাষ্ট্রের পুনর্জন্ম’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এই বিজয়কে বাস্তবে রূপ দিতে অন্তর্বর্তী সরকারের তিনটি মূল ম্যান্ডেট চিহ্নিত করা হয়। জুলাই গণহত্যাসহ বিগত সময়ে সংঘটিত সব মানবতাবিরোধী অপরাধের সুষ্ঠু বিচার; সংবিধানসহ রাষ্ট্র ব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার এবং ভেঙে পড়া নির্বাচন ব্যবস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠা।
প্রবন্ধে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা, দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ কাঠামো এবং বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতাসহ গণভোটের রায়কে বাস্তবায়নের তাগিদ দেয়া হয়। এ ছাড়া জাতিসঙ্ঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী জুলাই হত্যাযজ্ঞকে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ উল্লেখ করে দ্রুত বিচার সম্পন্ন করার জোর দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি এনটিএমসিসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও নিরাপত্তা বাহিনীর আইনি সংস্কার, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যা প্রতিরোধে কঠোর আইনি কাঠামো তৈরি, গণমাধ্যমের জবাবদিহিতা এবং ভিকটিম ও শহীদ পরিবারগুলোর রাষ্ট্রীয় পুনর্বাসন নিশ্চিতের আহ্বান জানানো হয়েছে।
প্রবন্ধে প্রতিহিংসা নয়- বরং সত্য, জবাবদিহিতা এবং ‘নেভার এগেইন’ (আর কখনো নয়) নীতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি সুশাসিত ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের অঙ্গীকার করা হয়।
সভাপতির বক্তব্যে লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি ড. কর্নেল (অব:) অলি আহমদ প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে বলেন, চতুর্দিকে শত্রু রেখে দেশ পরিচালনা করতে পারবেন না। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে বিদেশী গুপ্তচর চিহ্নিত করার পরামর্শ দেন। তিনি ১১ দলকে প্রধানমন্ত্রীর বন্ধু উল্লেখ করে বলেন, দেশের মঙ্গলের জন্য তারা আপনাকে পরামর্শ দিচ্ছে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামনুন হক জুলাইয়ের চেতনা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে বিএনপির বিরুদ্ধে গণবিস্ফোরণের হুঁশিয়ার দেন।
সেমিনারে বক্তারা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে জনগণের ভোটের অধিকার নিশ্চিত এবং হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত বিচারের দাবি জানান। পামাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ ভূমিকার ওপর জোর দেন।
জামায়াতের মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদের সঞ্চালনায় সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, জাগপার মূূখপাত্র রাশেদ প্রধান, দৈনিক মানবকণ্ঠের সম্পাদক ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহিদুল ইসলাম, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আনোয়ারুল ইসলাম, ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মুস্তাফিজুর রহমান ইরান, নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুসা বিন এজাহার চৌধুরী, সাবেক রাষ্ট্রদূত সাকিব আলী, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব আখতার হোসেন এবং ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আযাদ।



