নয়া দিগন্ত ডেস্ক
ভারতে বিজেপি ও তাদের রাজনৈতিক অভিভাবক আরএসএসের কট্টর সমর্থক পরিবারগুলোতে দেখা দিয়েছে নজিরবিহীন ফাটল। শিা সংস্কার, দুর্নীতির প্রতিবাদ এবং ঘৃণার রাজনীতি প্রত্যাখ্যানের দাবি নিয়ে জেন জি প্রজন্ম রাজপথে নামার পর ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক পরিবারগুলোর মধ্যে এক গভীর রাজনৈতিক ও আদর্শিক দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়েছে। ককরোচ আন্দোলনের তীব্র চাপে শিামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ ও পরীা ব্যবস্থায় সংস্কারে মোদির আশ্বাস মতাসীন শিবিরের রাজনৈতিক প্রভাবের গায়ে বড় রকমের ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। পারিবারিক সঙ্ঘাত ও জেন জি-র আত্মত্যাগÑ এই আন্দোলন কেবল বিজেপি সরকারের নীতি নয়, বরং তরুণদের নিজেদের ঘরোয়া পরিবেশকেও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
সাংঘর্ষিক পারিবারিক অবস্থান
তরুণদের মুখোমুখি অবস্থানের চিত্রের উদাহরণ যেমন কুনাল চৌধুরী (১৯) যার বাবা কট্টর বিজেপি ও আরএসএস কর্মী। কুনাল নিজেও আরএসএসের সদস্য ছিলেন, তবে বিদ্বেষমূলক ভাবধারায় বীতশ্রদ্ধ হয়ে তা ত্যাগ করেন। পরিবারের পথ ছেড়ে তিনি দিল্লির আন্দোলনে অংশ নেন এবং পরীার সুযোগ হারিয়ে দিল্লির গুরুদ্বারে আশ্রয় নেন। প্রিয়া সিং (২৪) জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার শিার্থী যার বাবার বিজেপির প্রতি অন্ধ বিশ্বাস রয়েছে। বাবার শারীরিক নির্যাতনের হুমকি এবং মানসিক চাপ সত্ত্বেও তিনি মুখ ঢেকে আন্দোলনস্থলে যোগ দেন। অঞ্জলি (২৫) আরএসএস সমর্থক পরিবারের সন্তান হয়েও বামপন্থী ছাত্র সংগঠন ‘আইসা’র নেতা হিসেবে আন্দোলনের সামনের সারিতে ছিলেন। পুলিশের লাঠিচার্জে আহত হলেও তিনি তার অবস্থানে অনড় থাকেন। পারিবারিক সম্পর্কের সমীকরণ ও পরিবর্তন আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ভারতের পরিবারগুলোতে দুই প্রজন্মের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
দীর্ঘ দিন ধরে বিজেপির রাজনৈতিক অজেয়তার যে ভাবমূর্তি গড়ে উঠেছিল, জেন জির উত্থানে সেই আধিপত্যে বড় ধরনের প্রভাব পড়ছে। ১. ‘হিন্দুত্ব’ ও জাতীয়তাবাদের ওপর বাস্তবসম্মত ইস্যুর অগ্রাধিকার বিজেপির রাজনীতির মূল ভিত্তি দাঁড়িয়ে রয়েছে হিন্দুত্ববাদ, সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ এবং শক্ত নেতৃত্ব ঘিরে। কিন্তু জেন জি প্রজন্ম আদর্শিক বা সামাজিক মেরুকরণের চেয়ে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশি সচেতন।
চাকরির অভাব, প্রশ্নপত্র ফাঁস, শিাব্যবস্থার দুর্নীতির মতো সরাসরি জীবনযাত্রার সাথে সম্পর্কিত ইস্যুগুলোতে জেন জি সোচ্চার হচ্ছে। প্রচার মাধ্যমের বদল ও ডিজিটাল মিথস্ক্রিয়া বিজেপি ঐতিহ্যগতভাবে হোয়াটসঅ্যাপ, এক্স এবং টিভির মাধ্যমে তাদের ডিজিটাল বয়ান ছড়িয়ে দিতে পারদর্শী। কিন্তু জেন জির প্রিয় মাধ্যম ইনস্টাগ্রাম বা ইউটিউব।
কণ্ঠস্বর প্রকাশে ব্যঙ্গ ও স্যাটায়ার
জেন জি ডিজিটাল স্পেসে ‘মিম’, রাজনৈতিক র্যাপ গান এবং স্যাটায়ারের মাধ্যমে বিজেপি সরকারের ব্যর্থতাগুলোকে ফুটিয়ে তুলছে। ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মে সরকারবিরোধী জনমত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় বিজেপিকেও এখন নিজেদের প্রচার কৌশলে পরিবর্তন আনতে হচ্ছে।
পারিবারিক রাজনীতির কাঠামো ভাঙন ঐতিহ্যগতভাবে ভারতে পরিবারগুলো যে রাজনৈতিক পথ অনুসরণ করত, সন্তানরাও অধিকাংশ েেত্র তা মেনে চলত। কিন্তু জেন জি তা ভেঙে দিচ্ছে। আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবতের মতো শীর্ষ নেতারাও জেন জির গণবিােভ বা ােভকে ‘দেশবিরোধী’ না ভেবে গণতান্ত্রিক অধিকার হিসেবে মেনে নেয়ার এবং সরকারের দ্রুত আলোচনার টেবিলে বসার ওপর জোর দিয়েছেন। বিজেপিকেও তাদের নীতিতে নমনীয় হতে এবং তরুণদের আবেগ বোঝার জন্য কৌশল বদলাতে বাধ্য করছে।
নির্বাচনী সমীকরণে অনিশ্চয়তা
ভারতের মোট জনসংখ্যার এক বিরাট অংশ তরুণ। আগে তরুণ ভোটাররা মোদির ভাবমূর্তি ও নেতৃত্বের ভক্ত হলেও, জেন জির মধ্যে এই অন্ধ আনুগত্য বেশ কিছুটা শিথিল হয়ে গেছে। তারা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রতি স্থায়ীভাবে অনুগত নয়; বরং যারা তাদের কর্মসংস্থান, শিা ও বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পারবে তাদের পইে ভোট দেয়ার প্রবণতা দেখাচ্ছে।
বিজেপি কেন্দ্রিক নির্বাচনগুলোতে (যেমনÑ গুজরাট, উত্তর প্রদেশ বা আসন্ন রাজ্য নির্বাচনগুলো) এই তরুণ ভোটারের ােভ বড় প্রভাব ফেলতে পারে। ভারতে জেন জি বিজেপির দীর্ঘ দিনের একক কর্তৃত্বের রাজনীতিকে সরাসরি প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। বিজেপিকে এখন কেবল ধর্মীয় বা আদর্শিক মেরুকরণের ওপর নির্ভর না করে শিা, প্রযুক্তি, কর্মসংস্থান ও গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার মতো তরুণদের মৌলিক চাহিদা পূরণে বাধ্য হতে হচ্ছে।
‘ওরা শুধু শেখায় কিভাবে মুসলিমদের ঘৃণা করতে হয়’
তরুণ চৌধুরীর বাবা জীবন চৌধুরী একজন ব্যবসায়ী। তিনি এমন কোনো জীবন দেখেননি যেখানে তিনি বা তার পরিবার আরএসএসের সদস্য ছিলেন না। তরুণ চৌধুরী এই ঐতিহ্য পেয়েছিলেন, তার মতে বেশ অনিচ্ছাসত্ত্বেও, কারণ তার ‘মন কখনোই এতে সায় দেয়নি’।
তিনি বলেন, ‘ওরা আপনাকে কোনো কাজের জিনিস শেখায় না। ওরা শুধু শেখায় কিভাবে মুসলিম আর দলিতদের ঘৃণা করতে হয়।’ দলিতরা ভারতের সবচেয়ে প্রান্তিক জাতিগোষ্ঠী। ভারতীয় সংবিধান আইনত এই প্রথা বিলুপ্ত করার আগ পর্যন্ত তাদের ‘অস্পৃশ্য’ হিসেবে গণ্য করা হতো। কিন্তু যুগ যুগ ধরে সুবিধাভোগী জাতিদের দ্বারা নিপীড়িত এই সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বৈষম্য এবং এমনকি সহিংসতা এখনো চলছে।
চৌধুরী বলেন, সিজেপি-নেতৃত্বাধীন আন্দোলন নিয়ে তার পরিবারের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল এই যে, মানুষ ‘জাতি, ধর্ম বা সামাজিক স্তর নিয়ে মাথা ঘামাতো নাÑ সবাই একত্রিত হতো, পাশাপাশি বসত এবং খেত’।
তিনি মোহাম্মদ জুনায়েদের উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘তাদের মস্তিষ্ক এই ধরনের কিছু উপলব্ধি করতে পারে না,’ জুনায়েদ একজন মুসলিম, যাকে অষ্টাদশ শতাব্দীর মানমন্দির ও জনসমাগমস্থল যন্তর মন্তরে বিােভকারীদের বিনামূল্যে খাবার ও পানি বিতরণ করতে দেখা যায়, যা নিয়ে কয়েক ডজন ভিডিও ভাইরাল হয়েছে।


