পানির নিচে হাজার কোটি টাকার ধান

হাওরে নীরব কান্না

অসময়ের বৃষ্টিতে পুরো হাওর অঞ্চলে অন্তত এক হাজার কোটি টাকার ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। লাখো অসহায় কৃষকের মাথায় হাত। ঘরে ঘরে চলছে নীরব কান্না। তারা না পারছেন সইতে, না পারছেন বলতে। বৃহত্তর সিলেট ও ময়মনসিংহজুড়ে রয়েছে অনেক হাওর, খাল-বিল। সুনামগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অনেক এলাকার মানুষের সারা বছরের সংসার খরচের উৎস ধান। বছরে একবারই হাওর অঞ্চলে ধান চাষ হয়ে থাকে। অনেক আশা আর স্বপ্ন নিয়ে ধান বুনেছিলেন এলাকাবাসী। কিন্তু বিধিবাম। অকাল বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে গেছে সব স্বপ্ন। বেশির ভাগ এলাকার ধান কাটার আগেই পানির নিচে তলিয়ে গেছে।

Printed Edition
বড়লেখায় বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়া ধান কাটছেন কৃষক  : নয়া দিগন্ত
বড়লেখায় বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়া ধান কাটছেন কৃষক : নয়া দিগন্ত

তৌহিদ চৌধুরী প্রদীপ, মো: আল আমিন ও সাজ্জাদুল ইসলাম সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও ময়মনসিংহ

অসময়ের প্রবল বর্ষণে চরম দুর্দশা ও ক্ষতির মুখে পড়েছেন বিস্তীর্ণ হাওর অঞ্চলের লাখো মানুষ। বিভিন্ন সূত্রের হিসাব বলছে, অসময়ের বৃষ্টিতে পুরো হাওর অঞ্চলে অন্তত এক হাজার কোটি টাকার ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। লাখো অসহায় কৃষকের মাথায় হাত। ঘরে ঘরে চলছে নীরব কান্না। তারা না পারছেন সইতে, না পারছেন বলতে। বৃহত্তর সিলেট ও ময়মনসিংহজুড়ে রয়েছে অনেক হাওর, খাল-বিল। সুনামগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অনেক এলাকার মানুষের সারা বছরের সংসার খরচের উৎস ধান। বছরে একবারই হাওর অঞ্চলে ধান চাষ হয়ে থাকে। অনেক আশা আর স্বপ্ন নিয়ে ধান বুনেছিলেন এলাকাবাসী। কিন্তু বিধিবাম। অকাল বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে গেছে সব স্বপ্ন। বেশির ভাগ এলাকার ধান কাটার আগেই পানির নিচে তলিয়ে গেছে। অনেক ধান এখনো পাকেইনি। যারা কিছুটা ধান কাটতে পেরেছেন তারা শুকাতে পারছেন না অব্যাহত বৃষ্টি আর রোদ না থাকায়। ফসলের এই ক্ষতি কিভাবে পুষিয়ে নেবেন তারা? কিভাবে চলবে তাদের সারা বছর? অনেকেই ধার-দেনা করে চাষাবাদ করেন তাদের নির্ঘুম রাত কাটছে পাওনাদের ভয়ে। মার্চ ও এপ্রিল মাসে বাংলাদেশে সাধারণত এত বেশি বৃষ্টি হয় না। এবার ধান পাকার আগেই হঠাৎ এই অতিরিক্ত বৃষ্টিতে সব লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে।

বিভিন্ন স্থানের প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো সংবাদএখানে তুলে ধরা হলো।

সুনামগঞ্জে পানির নিচে ২০০ কোটি টাকার ধান

দেশের হাওরের জেলা সুনামগঞ্জে টানা কয়েক দিনের অবিরাম বর্ষণে হাওরপাড়ে কেবলই হাহাকার আর কান্নার রোল শোনা যাচ্ছে। বৃষ্টিতে নিমজ্জিত ও হাওরের বাঁধ ভেঙে প্রায় ২৫ হাজার হেক্টর ফসলি জমির ধান ক্ষতি হয়েছে। তবে কৃষকদের দাবি আরো বেশি।

এ বছর সুনামগঞ্জের ১২ উপজেলায় মোট দুই লাখ ২৪ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করা হয়েছিল। ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন। যার বাজার মূল্য আনুমানিক পাঁচ হাজার কোটি টাকার মতো। বিস্তৃর্ণ হাওরজুড়ে ক’দিন আগে যেখানে ছিল সোনালি ধানের ঢেউয়ের দোলা, সেখানে এখন শুধু পানি আর পানি।

জেলা কৃষি বিভাগ প্রাথমিক তথ্যে, অতিবৃষ্টি ও ঢলে ১৮ হাজার হেক্টর ফসলি জমির ধান ক্ষতি হয়েছে। এর পূর্বে জলাবদ্ধতায় দুই হাজার হেক্টর ক্ষতি হয়। সেই হিসাবে টাকার অঙ্কে ধানের ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার।

এর মধ্যে হাওরে এক লাখ ৬৫ হাজার ২৭৫ হেক্টর। উঁচু অংশে ৫৮ হাজার ২৩৬ হেক্টর। গতকাল রোববার পর্যন্ত হাওরে এক লাখ ২৫ হাজার হেক্টর আর অন্যত্র ১৫ হাজার হেক্টর কাটা হয়েছে। গড়ে হাওরে ধান কাটা হয়েছে ৬০-৬৫ ভাগ।

জেলার সুনামগঞ্জ সদর, দোয়ারাবাজার, ছাতক, দিরাই, শাল্লা, জামালগঞ্জ, তাহিরপুর, ধর্মপাশা মধ্যনগর ও বিশ্বম্ভরপুরসহ ১২ উপজেলায় প্রতিটি হাওরেই এখন হাহাকার বিরাজ করছে। আবহাওয়া প্রতিকূল হওয়ায় এবং হাওরে পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় তীব্র শ্রমিক সঙ্কট দেখা দিয়েছে। বাইরের জেলা থেকে আসা শ্রমিকরা এই পরিস্থিতিতে কাজ করতে চাচ্ছেন না।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর জানায়, জেলার ১২টি উপজেলায় সাড়ে আট শত হারভেস্টার ধান কাটছে। কিন্তু কৃষকরা বলছেন, হারভেস্টার পানিতে নেমে ধান কাটতে পারে না। কৃষকরা আরো জানান, জেলার জামালগঞ্জ, ধর্মপাশা, তাহিরপুর, মধ্যনগর, দিরাই, শাল্লা, উপজেলায় বড় বড় হাওরের পাকা ও আধাপাকা ধান এখন বৃষ্টির পানিতে নিমজ্জিত। এসব হাওরে ছোট বড় নৌকা দিয়ে ধান কাটার প্রাণপণ চেষ্টা করছেন কৃষকরা।

জামালগঞ্জের ফেনারবাঁক গ্রামের পাকনা হাওরের কৃষক তোফায়েল আলম চৌধুরী (ছানা) বলেন, ৩৬ কিয়ার জমি করেছিলাম খুব কষ্ট করে, আজ রোববার (৩ মে) প্রথম জমিতে কোমর পানিতে কাঁচি লাগিয়েছি। কিছু জমি তলিয়ে গেছে মনের কষ্টে কাউকে বলতেও পারিনি। আমার কাজের লোকের বেতন দিতে হবে, সারা বছর সংসার চালানো, বাচ্চা কাচ্চার লেখা পড়া, কয়দিন পড়েই কোরবানির ঈদ আসছে, কিভাবে কি করবো এই দুঃশ্চিন্তায় কাটছে আমার রাত দিন।

কৃষক এনায়েত কবির খান বলেন, কোনো উপায় না পেয়ে পাকা ও আধাপাকা ধান কাটছেন তারা। হাওরে জলাবদ্ধতা থাকায় অনেক স্থানে ধান কাটার কম্বাইন হারভেস্টার চালানো যাচ্ছে না। শ্রমিকও তেমন নেই। আবার এখনো সব হাওরে ধান পাকেনি। হাওরের কৃষকদের সারা বছরের খোরাকি জোগানসহ সব কিছু মিলিয়ে হাওর অঞ্চলে এখন অসহায়ত্বের পরিবেশ বিরাজ করছে। মনে বন্যার ভয়, মাথায় বৃষ্টি বজ্রপাতের শঙ্কা আর দুর্ভোগ নিয়েই হাওরের কৃষকরা প্রাণান্তকর চেষ্টা করছে ধান তুলতে।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, আগাম বন্যার হাত থেকে বোরো ফসল রক্ষায় এ বছর পানি উন্নয়ন বোর্ড জেলার বড় ৫৩টি হাওরের ৬০৩ কিলোমিটার বেড়িবাঁধে ৭১৮টি পিআইসির মাধ্যমে ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ করছে। এসব বাঁধ নির্মাণে ১৪৮ কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হলেও বরাদ্দ এসেছে ৬৭ কোটি টাকা। জানা যায়, মার্চ মাসে সাধারণত ৫০ থেকে ৬০ মিলিমিটার গড় বৃষ্টিপাত হলেও এবার মার্চ মাসে ২৫৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। এ ছাড়াও সাধারণত এপ্রিল মাসে সুনামগঞ্জে ২৮৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। এবার এপ্রিল মাসে সুনামগঞ্জে বৃষ্টিপাত হয়েছে ৩৮৯ মিলিমিটার, দিরাইয়ে ৩২৪ মিলিমিটার, ছাতকে ৩৮৮ মিলিমিটার, তাহিরপুর উপজেলার লাউড়েরগড়ে ৪৪২ মিলিমিটার ও ধর্মপাশা উপজেলার মহেশখলায় ৪০৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। যা অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার বৃষ্টিপাত অনেক বেশি।

সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরে উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে সব উপজেলায় নিচু জমিতে পানি জমে জলাবদ্ধতার ও রোদ না থাকায় কৃষকদের ধান শোকানোয় ক্ষতি হচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা করতে ইউএনও, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা পিআইও সম্বয়ে কমিটি গঠন করে দেয়া হয়েছে। তালিকা হাতে এলে ঢাকায় প্রেরণ করা হবে।

জামালগঞ্জ উপজেলার বৃহত্তর পাকনা হাওরসহ সব ক’টি হাওর মিলে এ উপজেলায় প্রায় তিন হাজার হেক্টরের মতো ফসল তলিয়ে আছে। ফেনারবাঁক গ্রামের সামনে লম্বাবাঁধ চরম ঝুঁকিতে আছে। ফেনাবরাঁক, শান্তিপুর, ইনাতনগর, লক্ষ্মীপুরসহ আশপাশের বেশ কয়েকটি গ্রামের কৃষকরা প্রথমে স্বেচ্ছায় কাজ করেন, পড়ে বেসরকারি সেবা সংস্থা সিএনআরএসের থেকে এই লম্বাবাঁধে কাজ করানো হয়েছে।

সুনামগঞ্জ-১ নির্বাচনী এলাকার সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল ইতোমধ্যে বিভিন্ন হাওরের বাঁধ-বেড়িবাঁধ পরিদর্শন করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষ থেকে কৃষকদের পাশে থেকে ফসল রক্ষায় সর্বাত্মক সহযোগিতার কথা জানান। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী হাওরবাসীর খোঁজখবর রাখছেন। ইতোমধ্যে হাওর এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রাথমিকভাবে তিন মাসের প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। ডাটা তৈরির কাজ চলছে। প্রক্রিয়া শেষ হলেই ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকরা সরকারের পক্ষ থেকে সহায়তা পাবেন।

নেত্রকোনায় ৩১৩ কোটি টাকার ক্ষতি

অতিবৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে নেত্রকোনার হাওর অঞ্চলসহ ১০ উপজেলার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে প্রাথমিক হিসাবে ২২ হাজার ৩৪৮ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতি হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। প্রাথমিক জরিপে অন্তত ৬৯ হাজার ৬৯৮ জন কৃষকের ৩১৩ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে জেলা প্রশাসন।

স্থানীয় জেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, প্রাথমিক জরিপে জেলার কলমাকান্দায় ১৪ হাজার ৬৭৫টি পরিবারের সাত হাজার ২৫০ হেক্টর, খালিয়াজুরীতে ১৫ হাজার ১৩৩টি পরিবারের ছয় হাজার ২০০ হেক্টর, মদনে আট হাজার ৪৭০টি পরিবারের তিন হাজার ৮৫০ হেক্টর, সদরের তিন হাজার ৯৬৫টি পরিবারের ৪৯৫ হেক্টর, বারহাট্টায় তিন হাজার ৩৬৫টি পরিবারের ৫৮২ হেক্টর, কেন্দুয়ায় ৯ হাজার ৩৪০টি পরিবারের এক হাজার ৩১০ হেক্টর, আটপাড়ায় সাত হাজার ৫৫০টি পরিবারের এক হাজার ৬০০ হেক্টর, মোহনগঞ্জে তিন হাজার ৫০০টি পরিবারের ৪৩৪.৫ হেক্টর, পূর্বধলায় এক হাজার ২৫০টি পরিবারের ৩০০ হেক্টর ও দুর্গাপুরে দুই হাজার ৪৫০টি পরিবারের ৩২৭ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতি হয়েছে। যার বাজারমূল্য আনমানিক ৩১৩ কোটি টাকা। তবে স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ক্ষতির পরিমাণ এর কয়েক গুণ বেশি। প্রকৃত তথ্য কৃষি বিভাগের জরিপে উঠে আসেনি।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, নেত্রকোনায় এ বছর ৩১ কোটি টাকা ব্যয় ধরে ১৩৮ কিলোমিটার ফসলরক্ষা বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়। এ বাঁধের ওপর কৃষকদের প্রায় ৪২ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান নির্ভর করে। সেখান থেকে ধান উৎপাদন হয় প্রায় তিন লাখ টন। এ ধানের ওপরই হাওরের কৃষকদের সন্তানদের লেখাপড়াসহ সারা বছরের সংসার খরচ নির্ভর করে। তাই ফসল হারানোর আশঙ্কা মানেই তাদের জীবনে নেমে আসে অনিশ্চয়তা। এবার অতিবৃষ্টি বা পাহাড়ি ঢলে জেলার ছোট-বড় সব নদ-নদীর পানি বাড়লেও কোনো বেড়িবাঁধ ভাঙার ঘটনা ঘটেনি। সব পানিই বৃষ্টির কারণে জমাটবদ্ধ।

জেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, নেত্রকোনার ১০ উপজেলায় এবার এক লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৭ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ করা হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৩ লাখ ২১ হাজার ৭৩২ টন ধান। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলে ৪১ হাজার ৬৫ হেক্টর জমিতে ধান আবাদ হয়। সরকারি হিসেবে হাওরে ৬২ শতাংশ ক্ষেতের ধান কাটা হয়েছে। অতিবৃষ্টিতে নিমজ্জিত হয়ে ক্ষতি হয়েছে ২২ হাজার ৩৪৮ হেক্টর জমির ধান।

ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বাস্তব চিত্রটা আরো ভিন্ন। টানা কয়েক দিনে খালিয়াজুরি, মোহনগঞ্জ, মদন, কলমাকান্দা, আটপাড়া ও বারহাট্টা উপজেলার বিভিন্ন হাওর ও বিলে ঘুরে কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, হাওরাঞ্চলে এখনো প্রায় ৬০ শতাংশ ক্ষেতের ধান কাটা বাকি। পানিতে নিমজ্জিত আছে প্রায় সাড়ে ২৩ হাজার হেক্টর ক্ষেতের ধান।

কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এসময়টা হাওরে পানি আসা স্বাভাবিক। তবে ভারতের চেরাপুঞ্জি, আসাম, সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগে বৃষ্টির পরিমাণ বেশি হওয়ায় হাওরে পানি বেড়েছে। এবার ডিজেল সঙ্কটের কারণে কৃষকরা হারভেস্টার দিয়ে সহজে ধান কাটতে পারেননি। অন্যান্য বছর কৃষকরা কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর, পাবনা, রাজশাহীসহ বিভিন্ন স্থান থেকে ধান কাটার শ্রমিক আনতেন। তারা হাওরে জিরাতি হয়ে ধান কাটতেন। কিন্তু হারভেস্টারের ওপর নির্ভরশীল থাকায় এখন শ্রমিক আনা হয় না। আর ক্ষেতে পানি জমলে ধান কাটার যন্ত্র ব্যবহার করা যায় না। এ ছাড়া শুকনা মৌসুমে হাওর থেকে পানি দেরিতে নামায় কৃষকদের বীজতলা প্রস্তুত করতে দেরি হয়। তাই ধানের চারাও দেরিতে লাগানো হয়। ফলে ধান কাটতে দেরি হয়ে যায়।

কৃষকরা বলছেন, হাওরে অপরিকল্পিত বাঁধের কারণে বৃষ্টির পানি যেতে পারছে না। পানি যাওয়ার পথগুলো পলি জমে বন্ধ হয়ে গেছে। হাওরের বেশির ভাগ স্লুইসগেট অকেজো হয়ে রয়েছে।

খালিয়াজুরি কৃষি কর্মকর্তা মো: দেলোয়ার হোসেনের দাবি, উপজেলায় ২০ হাজার ২৩২ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়। শনিবার পর্যন্ত প্রায় ৫২ শতাংশ ক্ষেতের ধান কাটা হয়েছে। প্রায় সব ক্ষেতের ধান পানির নিচে রয়েছে।

এ বিষয়ে জেলা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো: সাখাওয়াত হোসেন জানান, কংস ও উব্দাখালি নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার ওপরে আছে। ধনু নদের পানি বিপৎসীমার এক সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

কৃষকের ঘরে খাবার নেই, পানি নেই

বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় সাত-আট দিন ধরে বিপর্যয়ের মধ্যে আছে হাওরের মানুষ। তাদের সারা বছরের খাদ্য-বোরো ধান তলিয়ে গেছে।

এর মধ্যেই মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে কষ্ট দিচ্ছে লোডশেডিং। গতকাল রোববার বৃষ্টি একটু কমলেও হাওরের বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছে ধান ও খড়ের পচা গন্ধ।

ঘরে থাকা খাবার শেষ হয়ে গেছে কৃষকের। ছোট শিশুরা খাবারের অভাবে কাঁদছে।

সেখানে সুপেয় পানিরও সঙ্কট দেখা দিয়েছে। হাতের জমানো টাকা শ্রমিকদের দিয়ে দেয়ায় বাজারে যেতে পারছে না কৃষক।

এমন পরিস্থিতিতে অসহায় কৃষকদের প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত তিন মাসের সহযোগিতার আগে ‘সাময়িক সহযোগিতা’ প্রয়োজন।

এদিকে টানা বৃষ্টির পর গতকাল দুপুরে কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জে কিছু সময়ের জন্য সূর্যের দেখা মেলে। পরে আবার মেঘাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে আকাশ। হাওর অধ্যুষিত বাকি জেলাগুলোতেও গতকাল বৃষ্টিপাত কিছুটা কম হয়েছে। এর জন্য কিছু হাওরে পানি স্থিতিশীল ছিল। তবে নদ-নদী দিয়ে ভারতের উজান থেকে পাহাড়ি ঢল আসা অব্যাহত থাকায় শঙ্কা কাটেনি মানুষের। এ পরিস্থিতিতে গতকাল রোববার কিশোরগঞ্জের হাওরে নতুন করে আরো এক হাজার পাঁচ হেক্টর বোরো জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য বলছে, গতকাল রোববার কিশোরগঞ্জের ইটনা এলাকায় ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে ধনু-বৌলাই নদীর পানি ১০ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পায়।

চামড়া বন্দর এলাকায় মগড়া নদীর পানি আগের দিনের চেয়ে ৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়।

কিশোরগঞ্জ ছাড়াও সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বেশ কিছু হাওরে গতকাল পর্যন্ত নতুন করে প্লাবিত হয় অনেক বোরো জমি। এই সাত জেলার বেশির ভাগ কৃষকের ঘরে এখন খাবার নেই। চলছে হাহাকার।গতকাল রোববার কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলায় গিয়ে দেখা যায়, কোমর পানি ভেঙে কিছু কৃষক হাওর থেকে পচা ধান তুলে আনছেন।

উপজেলার চৌগাংগা গ্রামের সামনে হাওরের পাড়ে দেড় বছরের শিশু বিলকিসকে পাশে রেখে পচা খড় নেড়ে-চেড়ে দিচ্ছিলেন রাবিয়া বেগম (৩৫)। রাবিয়া জানালেন, স্বামী ৪-৫ দিন ধরে ক্ষেতের ফসল রক্ষার চেষ্টায় হাওরে। খেয়ে না খেয়ে তিনি কাজ করছেন। নিজের পরিশ্রম এবং বাড়তি টাকায় শ্রমিক লাগিয়ে কিছু ধান কেটে আনতে পেরেছেন। ঘরে এখন টাকা-পয়সা নেই, খাবারও নেই। তিন দিন ধরে চুলা জ্বলছে না তার। বুকের দুধের পাশাপাশি সুজি ও নরম ভাত খেত দেড় বছরের শিশু বিলকিস আক্তার। তিন দিন ধরে বাড়তি খাবার পাচ্ছে না শিশুটি। রাবিয়া বেগমও উপোস আছেন।

শুধু রাবিয়া কিংবা বিলকিস নয়, কিশোরগঞ্জের হাওরের অন্য মা ও শিশুদেরও একই অবস্থা।

ঘরে খাদ্যসঙ্কট দেখা দেয়ায়, বড়দের যেমন উপোস থাকতে হচ্ছে। শিশুদের উপযোগী কোনো খাবার না থাকায় তাদেরও কষ্ট হচ্ছে। খাবারের জন্য শিশুরা কান্নাকাটি করছে।

ইটনা উপজেলার জয়সিদ্ধি গ্রামের সামনের হাওরে কোমর পানিতে নেমে ধান কাটছিলেন কৃষক আলাউদ্দিন (৫০)। তিনি জানান, সকালে তিনি কিছু খেয়ে আসেননি। ঘরে কোনো খাবার নেই। চার হাজার টাকা ঘরে ছিল, ধান কাটতে গিয়ে শ্রমিকদের দিয়ে দিয়েছেন তিনি। ঘরের চাল শেষ হয়ে গেছে তিন দিন আগে, তাই রান্না হয়নি ঘরে। ঘরে তার স্ত্রী সন্তানরা উপোস আছেন।

হতাশা নিয়ে তিনি বলছিলেন, ‘কী আর করাম, না খাইয়াই ধান তোলার চেষ্টা করতাছি।’

কৃষক হাবিবুর রহমান গ্রামের দোকান থেকে পাঁচ টাকা দিয়ে একটি বনরুটি খেয়ে সকালে জমিতে ধান কাটতে নেমেছেন। বেলা ২টা বেজে গেছে। আর কিছুই খাননি তিনি।

হাবিবুর রহমান বলেন, ‘আমার দুই ছেলেও কাঁচি নিয়ে ধান কাটতে এসেছে। এখন খাওনের চিন্তার চেয়ে ধানগুলো বাঁচানোর চিন্তাই বেশি। ওরাও তো কিছু খেয়ে আসেনি। ঘরে রান্না হয় নাই।’

বিকেলে যাওয়া হয়, মিঠামন উপজেলার খিদিরপুর হাওরে। সেখানে দেখা হয় কৃষক আঙ্গুর মিয়াসহ (৪৫) আরো ১০-১২ জনের সাথে।

আঙ্গুর মিয়া বলছিলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী কইসে আমরারে খাওন দিব। খাওন কোন সময় দিব? আমরা মইরা গেলে কি দিব? পরে খাওন দিক বা না দেউক, এখন খাওন দেওয়া আমরারে জরুরি। ঘরে কোনো টেহা-পয়সা নাই, সব খরচ হইয়া গেছে। খাওন কি দিয়া কিনবাম, এই কঠিন সময়ে দোকানেও কেউ বাকি দিতে চায় না।’

করিমগঞ্জ-নিকলী সড়কের শুরুতেই খয়রত গ্রাম। বৃষ্টি ও ভারী বর্ষণে এ গ্রামের অনেক জমি তলিয়ে গেছে। কিছু জমির ধান কেটে আনা গেলেও এগুলোতে এখন চারা গজিয়ে যাচ্ছে। গ্রামের কৃষক হারুন মিয়া (৫০) প্লাস্টিকের ত্রিপলে ধান বিছিয়ে পানি ঝরানোর চেষ্টা করছিলেন। তার স্ত্রী সন্তানও এখানে আছেন।

হারুন মিয়া বলেন, বৃষ্টির কারণে মাড়াই করা ধানেও এখন চারা গজিয়ে যাচ্ছে। খর পচে গিয়ে গন্ধ বের হচ্ছে। ধান পচা আর খেড় পচার গন্ধে আর ভাল্লাগেনা। দুপুরে চিঁড়া খাইছিলাম। পেডও (পেটে) খিদা। পচা দানের গন্ধে এখন উদগাড়ি (বমি) উঠতেছে।’

করিমগঞ্জ উপজেলার গুণধর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু সায়েম ভূইয়া রাসেল বলেন, শ্রমিক খরচ দিয়া এখন কৃষকের ঘরে টাকা পয়সা নাই। হাওরের কৃষকেরা মূলত নতুন ধান তুলেই বেশি অংশ বিক্রি করে দেন। বাকি ধান রাখেন খোরাকির জন্য। ধান বিক্রির টাকা দিয়েই তারা সারা বছর বাজার সদাই করেন। ঋণ পরিশোধ করেন। চৈত্র মাসে কৃষকের খোরাকি শেষ হয়ে যায়। বৈশাখ মাসে নতুন ধান গড়ে তুলে তারা চাল করেন। কিন্তু এইবার ধান শুকাতেই পারেননি চাল করবেন কী করে। মহা দুর্যোগের মধ্যে আছে হাওরের কৃষক। বেশির ভাগ কৃষকের ঘরে চুলা জ্বলছে না।’

কিশোরগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সার্বিক মিজাবে রহমত নয়া দিগন্তকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী হাওরের কৃষকদের জন্য তিন মাসের সহযোগিতার একটি ঘোষণা দিয়েছেন। এটার জন্য আমরা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করছি। কিন্তু বর্তমানে এই দুর্যোগ মুহূর্তে অনেক কৃষকের পরিবারের ঘরে খাবার নেই। এই খবরটি আমরাও পেয়েছি। দু-একদিনের মধ্যেই আমরা হাওরে কৃষক পরিবারের জন্য ত্রাণ পাঠাচ্ছি। এ ব্যাপারে যত সহযোগিতা প্রয়োজন জেলা প্রশাসন করবে।

নান্দাইলে বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে ফসল, দিশেহারা কৃষক

ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলায় টানা অতিবৃষ্টিতে বোরো মৌসুমের পাকা ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ফলে চলতি মৌসুমে ঘরে ফসল তুলতে না পেরে চরম দুশ্চিন্তা ও দিশেহারা অবস্থায় পড়েছেন কৃষকরা।

অতিবৃষ্টি ও অপরিকল্পিত পানিনিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে উপজেলার কয়েক শ’ হেক্টর জমির পাকা ও আধাপাকা বোরো ধান পানিতে ডুবে গেছে। সরেজমিনে দেখা যায়, নিচু এলাকার বিস্তীর্ণ জমিতে সোনালি ধান এখন কেবল পানির নিচে ঢেউ খেলছে, কৃষকের বছরের পরিশ্রম যেন মুহূর্তেই হারিয়ে গেছে।

স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, অপরিকল্পিতভাবে পুকুর খনন, খাল দখল এবং ছোট ছোট বাঁধ নির্মাণ করে মাছ ধরার কারণে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে সামান্য বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হচ্ছে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, নান্দাইলে চলতি মৌসুমে ১৩টি ইউনিয়ন ও পৌর এলাকায় মোট ২২ হাজার ২৯৫ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে টানা বর্ষণে নি¤œাঞ্চলের প্রায় ৯০০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে প্রায় ২৭০ হেক্টর জমির পাকা ও আধাপাকা ধান পুরোপুরি পানির নিচে তলিয়ে গেছে।

যুগের হাওড়, দুল্লিবিল, দলিঘাট বিল, ঝালিয়া, ছেতারার বিল, বলদা, গজারিয়া বিল, কালিয়াদাইর বিল, চরবেতাগৈর ইউনিয়নের কাচামাটিয়া নদী ও বড়ডোবা বিলসহ অধিকাংশ নি¤œাঞ্চল এখন পানিতে ডুবে রয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ফারুক মিয়া, তাইজুল ইসলাম, সবুজ মিয়া ও হারুন মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সারা বছর কষ্ট করে ফসল ফলাই, কিন্তু সামান্য বৃষ্টিতেই সব শেষ হয়ে যায়। বিভিন্ন স্থানে বাঁধ দিয়ে মাছ ধরা ও অপরিকল্পিত পুকুর খননের কারণে পানিনিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। দ্রুত খাল-নালা খনন না করলে আমাদের বাঁচার উপায় থাকবে না।” তারা ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সরকারের বিশেষ আর্থিক সহায়তা দাবি করেন।

এ বিষয়ে নান্দাইল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ নাঈমা সুলতানা জানান, টানা বর্ষণের কারণে নি¤œাঞ্চলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি অপরিকল্পিত ফিশারি স্থাপন, খাল-নালার নাব্যতা হ্রাস এবং অবকাঠামোগত বাধাও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। তিনি বলেন, “আমরা মাঠ পর্যায়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি এবং কৃষকদের সহায়তায় কাজ করছি। ইতোমধ্যে খাল খনন কর্মসূচি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে।”

হাকালুকিতে আধাপাকা ধান কেটে ফসল বাঁচানোর লড়াই

টানা বর্ষণ, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং নিম্নাঞ্চলে আকস্মিক জলাবদ্ধতায় মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার হাকালুকি হাওরপাড়ে দেখা দিয়েছে আগাম বন্যা পরিস্থিতি। পানির উচ্চতা দ্রুত বাড়তে থাকায় বোরো ফসল হারানোর আতঙ্কে কৃষকরা সময়ের আগেই আধাপাকা ধান কাটতে বাধ্য হয়েছেন। ইতোমধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ জমির ধান কেটে ঘরে তুললেও অবশিষ্ট পাকা-আধাপাকা ফসলের বড় অংশ পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এতে চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন হাজার হাজার প্রান্তিক কৃষক।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে বড়লেখায় মোট ৫ হাজার ৬২৫ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ৬৯৫ হেক্টর জমি হাকালুকি হাওরাঞ্চলে এবং ১ হাজার ৯৩০ হেক্টর নন-হাওর এলাকায়। ধানে থোড় আসার সময় থেকেই টানা বৃষ্টিপাত শুরু হয়। এরপর উজানের পাহাড়ি ঢলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে ওঠে। কৃষি বিভাগ জানায়, ফসল রক্ষায় কৃষকরা আগেভাগেই প্রায় ৩ হাজার হেক্টরের আধাপাকা ধান কেটে ফেলেছেন। কিন্তু গত কয়েক দিনের ভারী বর্ষণে অবশিষ্ট পাঁচ শতাধিক হেক্টর জমির ধান আংশিক বা সম্পূর্ণ নিমজ্জিত হয়ে পড়ে। সম্পূর্ণ ফসল হারানোর আশঙ্কায় লোকসান মেনেই কৃষকরা আধাপাকা ধান কাটছেন।

হাওরপাড়ে এখন চলছে এক ধরনের ‘ফসল বাঁচানোর যুদ্ধ’। বৈরী আবহাওয়া, বজ্রপাত ও অবিরাম বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে কৃষকরা হাঁটু থেকে কোমর পানিতে নেমে ধান কাটছেন। অনেক স্থানে নৌকায় করে ধান পরিবহন করতে দেখা গেছে। কৃষকদের ভাষ্য, পুরোপুরি পাকার অপেক্ষা করলে একটি ধানও ঘরে তোলা সম্ভব হতো না। শনিবার ও রোববার সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার বর্ণি ইউনিয়নের নোয়াগাঁও, দাসেরবাজার ইউনিয়নের মাইজুমজুড়ি, সুজানগর ইউনিয়নের কটালি বিলের আমবাড়ি ও বাঘমারা, তালিমপুর ইউনিয়নের টেকাহালী, বাগিরপার, পোয়ালা বিল, দুধাই বিল, শ্রীরামপুর ও ধর্মদেহী এলাকায় পানিতে ডুবে থাকা ক্ষেত থেকে কৃষকরা ধান কাটছেন। কোথাও ক্ষেত অর্ধনিমজ্জিত, কোথাও সম্পূর্ণ তলিয়ে গেছে। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, প্রতি বছর আগাম বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের ঝুঁকি থাকলেও স্থায়ী ফসলরক্ষা বাঁধ কিংবা কার্যকর পানি ব্যবস্থাপনা না থাকায় হাওরাঞ্চলের কৃষকরা বারবার একই দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। অনেক কৃষক ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেছেন। এখন ফসলহানির আশঙ্কায় তারা দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন।

গত মঙ্গলবার বিকেলে উপজেলার হাকালুকি হাওরসংলগ্ন বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুব আলম মাহবুব ও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মনোয়ার হোসেন। তারা কৃষকদের দ্রুত ধান কেটে নিরাপদে ঘরে তোলার পরামর্শ দেন।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মনোয়ার হোসেন বলেন, আবহাওয়া অধিদফতরের সতর্কবার্তার পর থেকেই কৃষকদের দ্রুত ধান কাটার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। অনেকে আধাপাকা ধান কেটে নিয়েছেন, এতে কিছু ক্ষতি হলেও সম্পূর্ণ ফসল হারানোর ঝুঁকি কমেছে। ইতোমধ্যে হাকালুকি পাড়ের প্রায় ৯০ শতাংশ বোরো ধান কাটা শেষ হয়েছে। অবশিষ্ট জমির কিছু ধান সম্পূর্ণ ও কিছু আংশিক নিচে রয়েছে। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও কৃষকরা ধান ঘরে তোলার চেষ্টা করছেন।

নাসিরনগরে ফসল হারানোর শোকে এক কৃষকের মৃত্যু

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার হাওর বেষ্টিত নাসিরনগর উপজেলায় পানিতে ধান তলিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখে এক কৃষকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।

শনিবার (২ মে) নাসিরনগর উপজেলার গোয়ালনগর ইউনিয়নের রামপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নিহত আহাদ মিয়া (৫৬) গোয়ালনগর ইউনিয়নের রামপুর গ্রামের ৯নং ওয়ার্ডে বাসিন্দা তিনি।

ছয় বিঘা জমিতে ব্রি-২৯ ধানের আবাদ করেছিলেন। পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সকালে কয়েকজন শ্রমিক নিয়ে ধান কাটতে মাঠে যান আহাদ মিয়া। সেখানে গিয়ে দেখেন, কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে তার পুরো জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। এ দৃশ্য দেখে তিনি ঘটনাস্থলেই অচেতন হয়ে পড়ে যান। পরে সেখানেই তার মৃত্যু হয়।

জানা যায়,এনজিও থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে নিহত আহাদ মিয়া জমি আবাদ করেছিলেন। সব ধান পানিতে ডুবে যাওয়ার দৃশ্য দেখে সহ্য করতে না পেরে তিনি হৃৎরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।

নিহতের বড় ভাই ও স্থানীয় ইউপি সদস্য আহম্মদ হোসেন বলেন, “জমির সব ধান নষ্ট হয়ে যেতে দেখে আমার ভাই সহ্য করতে পারেনি। ঘটনাস্থলেই ঢলে পড়ে মারা যান।” তার দুই ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে।

স্থানীয় কৃষক দুধ মিয়া জানান, টানা বৃষ্টিতে গোয়ালনগর ইউনিয়নের প্রায় চার থেকে পাঁচ হাজার বিঘা জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকরা। একই ঘটনায় অন্তত আরো তিনজন কৃষক অসুস্থ হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। একই ইউনিয়নের অনেক কৃষকই সর্বস্বান্ত পড়ছে।

মাছমা গ্রামের মো: আলফাজ মিয়া বলেন, আমার ২০ বিঘা জমি পানির নিচে পছে গেছে। উপজেলার সব ইউনিয়নেই, অনেকেরই তিন বিঘা, পাঁচ বিঘা, ছয় বিঘা থেকে শুরু করে ২০ বিঘা পর্যন্ত কৃষি জমি তলিয়ে গেছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইমরান হোসাইন জানান, জমিতে ধান কাটতে গিয়ে একজন কৃষকের মৃত্যুর বিষয়টি তিনি জানতে পেরেছি। একজন উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাকে ওই কৃষকের বাড়িতে খোঁজ নিতে পাঠানো হয়েছে।

এ বিষয়ে নাসিরনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীনা নাছরিন বলেন, ‘উপজেলায় অনেক কৃষকের জমির ধান গত কয়েক দিনের বৃষ্টিতে পানিতে তলিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। মৃত কৃষক আহাদ মিয়ার নাম ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে তাদেরকে সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে।’

মধুপুর পাঁচশত বিঘা জমির পাকাধান পানির নিচে

মধুপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি জানান, টাঙ্গাইলের মধুপুরে গত কয়েক দিনের ভারী বর্ষণে উপজেলায় কৃষকদের আবাদকৃত প্রায় পাঁচ শ’ বিঘা জমির পাকা ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। উপজেলার ধানের খনি খ্যাত অরণখোলা, কুড়াগাছা ইউনিয়নের ১১ গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে হাওদা বিলের অবস্থান। এই বিলের প্রায় পাঁচ শত বিঘা জমির ধান বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে থাকার কারণে ওই সকল এলাকার কৃষকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ নেমে এসেছে। যদি অতিদ্রুত এই পানি নিষ্কাশন না হয় তাহলে চরম ক্ষতির মধ্যে পড়বে কৃষকেরা। এমন পরিস্থতিতে ধারদেনা করে চাষ করা কৃষক ও বর্গা চাষিরা রয়েছে আরো কঠিন বিপাকে।

মধুপুর উপজেলায় চলতি মৌসুমে ১৩ শ’ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। ফলনও অনেক ভালো হয়েছে।

এর মধ্যে মধুপুরের ঐতিহ্যবাহী হাওদা বিলে বিস্তৃতি কাকরাইদ, সাইনামারি, ভুটিয়া, গাছাবাড়ী, জলছত্র, পিরোজপুর, পলাইটেকি, মালিবাজার, কামারচালা, বলাইদপাড়া এলাকার প্রায় শতাধিক হেক্টরজুড়ে ধান আবাদ হয়েছে। এই বিলে সারা বছরে একবার ধান আবাদ হয়ে থাকে। বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই তারা ধান কেটে ঘরে তুলে থাকেন। কিন্তু এ বছর সেই ধান প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে কৃষকের স্বপ্ন মাটি হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। কাকরাইদ গ্রামের কৃষক আবুল হোসেন জানান, হাওদা বিলে বছরে একবার ধান আবাদ হয়। কিন্তু যে ধান হয় তাই দিয়া সংসার চলে যায়। গেল বছর দুই বিঘা জমিতে ৬৮ মণ ধান পাইছিলাম। এবার বর্গাজমি পাঁচ বিঘা আবাদ করছি। ধানও হয়েছে ভালো। কিন্তু একদিনের বৃষ্টিতে সব ডুইবা গেছে। কৃষক শাহীন মিয়া বলেন, ‘সাড়ে পাঁচ পাকি জমির সব ধান ডুইবা গেছে। এক ছটাক ধানও ঘরে তুলবার পারমুনা। আমার মতো শত শত কৃষকের একই অবস্থা। আকবর হোসেন জানান, মৌসুমের শেষের দিকে হঠাৎ আবহাওয়া বৈরি হওয়ায় আমাদের সব ধান এখন পানির নিচে। যদি অতিদ্রুত পানি নেমে যায় তাহলে হয়তো কিছু ধান কাটা সম্ভব হবে। তানা হলে ধান কিনে ক্ষেতে হবে।

এ ব্যাপারে মধুপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রকিব আল রানা জানান, চলতি বোরো মৌসুমে মধুপুর উপজেলায় ১ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে ধান আবাদ হয়েছে। পরিবেশ অনুকূলে থাকায় এবং কৃষকের পরিচর্যার কারণে ফলনও ভালো হয়েছে। তবে হঠাৎ ভারী বর্ষণে মধুপুরের বিভিন্ন এলাকার নি¤œাঞ্চলের ধানি জমি পানিতে ডুবে গেছে। কৃষকদেরকে পরামর্শ দেয়া হয়েছে পানি নেমে যাওয়ার পথগুলো পরিষ্কার করে দিতে। যাতে দ্রুত পানি নেমে যায়। পানি নেমে গেলে খুব একটা ক্ষতি হবে বলে মনে হয় না। আর এ বিষয়টি আমরা বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণ করছি।