সংসদ প্রতিবেদক
দেশের অর্থবছর পরিবর্তনের পক্ষে মত দিয়েছেন সরকার ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। গতকাল সংসদে বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে এ প্রস্তাব তুলে ধরেন তারা। সম্প্রতি বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান বিরোধী দলের ছায়া বাজেট পেশকালে দেশের অর্থবছর পরিবর্তনের আহ্বান জানান। তিনি জুলাই-জুনের পরিবর্তে জানুয়ারি-ডিসেম্বর করার আহ্বান জানান। গতকাল সংসদে বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে সিরাজগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান আবার এ দাবিটি সংসদে তুলে ধরেন। জামায়াতের ছায়া বাজেট তৈরিকারী ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য ও দলটির নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলনও বাজেট বক্তৃতাকালে বলেন, অর্থবছর পরিবর্তনের বিষয়ে সংসদে প্রায় সবাই একমত হয়েছেন। তাই দেশের আর্থিক বছর পরিবর্তনের বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে পারে।
একইভাবে সরকারি দলের সংসদ সদস্য ও স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বাজেট বক্তৃতাকালে অর্থবছর পরিবর্তনের পক্ষে মত দিয়ে জুলাই-জুনের পরিবর্তে জানুয়ারি-ডিসেম্বর করার আহ্বান জানান।
ব্যাংক খাত, রাজস্ব ঘাটতি ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ে সরকারের কঠোর পদক্ষেপের আহ্বান জামায়াত এমপি মিলনের : দেশের ব্যাংকিং খাতের ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ, সরকারের ঋণের বোঝা, রাজস্ব ঘাটতি, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের দুর্বলতা, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, চাঁদাবাজি এবং রাজধানীর নাগরিক সমস্যাগুলোকে দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করে জাতীয় সংসদে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ঢাকা-১২ আসন থেকে নির্বাচিত জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন। তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাত সরকারি ও বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রেই সঙ্কটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে রাজস্ব আদায় বাড়ানো, পরিচালন ব্যয় কমানো, রাষ্ট্রীয় লোকসানি প্রতিষ্ঠান পুনর্মূল্যায়ন, ক্যাপাসিটি চার্জ ও ব্যাংক খাতের অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন জরুরি।
সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হচ্ছে ব্যাংকিং খাত, অথচ বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি উভয় ব্যাংকের অবস্থাই উদ্বেগজনক। তিনি বলেন, সরকারি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার উদ্বেগজনক এবং বেসরকারি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার ৩০ দশমিক ১৭ শতাংশে পৌঁছেছে। খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংক মিলিয়ে দেশের ব্যাংকিং খাত অত্যন্ত সঙ্কটের মধ্যে রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সরকারি ঋণের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শেষে দেশী-বিদেশী উৎস থেকে সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২২ লাখ ৫০ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বৈদেশিক ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৫১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ১৩ লাখ ৯৬ হাজার ১৭৩ কোটি টাকার সমান। আগামী অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণের সুদ বাবদ প্রায় ১৯০ কোটি ডলার বা প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা এবং আসল বাবদ ৩৩৯ কোটি ডলার বা প্রায় ৪১ থেকে ৪৯ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
চাঁদাবাজি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একজন সংসদ সদস্যের ছেলেও চাঁদাবাজির অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন, যা প্রমাণ করে সরকার চাইলে ব্যবস্থা নিতে পারে। তাই সারা দেশে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে একই ধরনের কঠোর ব্যবস্থা নেয়া উচিত। তার নির্বাচনী এলাকা নর্দ্দা, কালাচাঁদপুর, শিল্পাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, ব্যাটারিচালিত রিকশা চার্জিং স্টেশনসহ নতুন নতুন খাতেও চাঁদাবাজি বিস্তার লাভ করেছে।
ডাল-ভাতের বাজেট করে বিরিয়ানি খাওয়া যায় না : বিরোধী দলের সমালোচনা ও বিশাল আকারের বাজেট প্রসঙ্গে তথ্য প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী বলেছেন, সবাই বেহেশতে যেতে চায়, কিন্তু কেউ মরতে চায় না। সবাই এলাকায় উন্নয়ন চান, কিন্তু বলেন বাজেট অনেক বেশি হয়ে গেছে। যদি উন্নয়ন চান, বাজেট বরাদ্দ তো বেশি হতেই হবে। বাসায় আপনি যদি ডাল-ভাতের বাজেট করেন, আর খেতে চান বিরিয়ানি সেটা তো চলবে না। একই সাথে তিনি জানান, বিগত সময়ের দুর্নীতি ও সিন্ডিকেট ভেঙে ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ এ দেশের মানুষ প্রায় বিনামূল্যেই দেখতে পাবে।
প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের প্রশংসা করে তিনি বলেন, আমাদের স্মার্ট ও অভিজ্ঞ অর্থমন্ত্রীর দেয়া এই বাজেট শুধু সময়োপযোগী বা মানবিকই নয়, এটি একটি সুদূরপ্রসারী প্ল্যান। বিগত ১৭ বছর দেশে লুটপাট চলেছে, অর্থনীতি ও শিক্ষানীতিসহ প্রতিটি খাতকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। সেই ধ্বংসস্তূপ থেকে বাংলাদেশকে নিজের পায়ে দাঁড় করানোর জন্যই এই সুন্দর বাজেট দেয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়ির পাশ দিয়েই মাদকের বড় চালান আসে-গয়েশ্বর : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের বাড়ির আশপাশের এলাকা দিয়েই দেশের সবচেয়ে বড় মাদকের চালান আসে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা-৩ আসনের সংসদ সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। তিনি বলেন, কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে এখনো বড় আকারে মাদক দেশে প্রবেশ করছে, কিন্তু তা কার্যকরভাবে বন্ধ করা যায়নি।
প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে গয়েশ্বর চন্দ্র রায় এসব বলেন। গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, আমাদের দেশে মাদকের বড় চালান আসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়ির আশপাশ দিয়ে। সেটা হলো কক্সবাজারের টেকনাফ। আগে শুনতাম বদি, এখন তো বদি নেই। বদি বদ হয়ে গেছে। এখন ওখানকার দায়িত্ব কে নিয়েছে?’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে গয়েশ্বর বলেন, মাদক চোরাকারবারিরা বাড়ির আশপাশের লোক, তাদের তো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর চেনার কথা। এত দিনে ওই সীমান্ত দিয়ে মাদক আসা বন্ধ হওয়া উচিত ছিল। আইন করলেই সব সমস্যার সমাধান হয় না। আইন কার্যকর করতে সাহস ও সদিচ্ছা প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। দেশের অন্যতম বড় সমস্যা হিসেবে মাদকের বিস্তারের বিষয়টি তুলে ধরে গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, মাদক সমাজ ও তরুণ প্রজন্মকে ধ্বংস করছে। এ বিষয়ে আরো কঠোর পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।
জাকাতভিত্তিক অর্থনীতি প্রসারের আহ্বান : মদিনা সনদের ন্যায়বিচার ও মানবিকতার উদাহরণ টেনে তিনি দেশে জাকাতভিত্তিক অর্থনীতি প্রসারের প্রস্তাব দেন সংসদ সদস্য আন্দালিব রহমান পার্থ। তিনি বলেন, ‘জাকাত আমাদের অর্থনীতির বড় একটি অংশ, কিন্তু এটি হিডেন (লুকায়িত)। আমার প্রস্তাব হলো, প্রত্যেকটি নির্বাচনী আসনে জাকাত পাওয়ার যোগ্য মানুষদের নিয়ে একটি ডাটাবেজ তৈরি করা হোক। এতে প্রবাসীরাও সহজে জাকাত দিতে পারবেন। এ ছাড়া জাকাত দাতা ও গ্রহীতাদের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরিতে একটি ‘জাকাত টেলিভিশন’ চালু করা যেতে পারে।’
প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
ইসলামিক ব্যাংকিং প্রসারের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, ‘ইসলামিক ব্যাংকিং এখন সারাবিশ্বে ট্রেন্ড। ইংল্যান্ড, মালয়েশিয়া সব জায়গায় এটি জনপ্রিয়। একটি ইসলামী ব্যাংকে ডাকাতি হয়েছে বলে সিস্টেম খারাপ হয়ে যায়নি, ডাকাত খারাপ ছিল। আমরা উন্নয়নের পাশাপাশি শান্তি চাই, ডিভাইন ব্লেসিং (আল্লাহর রহমত) চাই। দক্ষিণ কোরিয়ার মতো শুধু উন্নয়ন চাই না, যেখানে আত্মহত্যার হার বিশ্বে সর্বোচ্চ।’



