সূচকের অবনতি দিয়েই পুঁজিবাজারের সপ্তাহ শুরু

দরপতনের শিকার ৭০ শতাংশ কোম্পানি

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

সূচকের অবনতি দিয়েই সপ্তাহ শুরু করেছে দেশের পুঁজিবাজার। বরাবরের মতো লেনদেনের শুরুতে সূচকের বড় ধরনের উন্নতি ঘটলে বিক্রয়চাপের কারণে দিনের শেষে তা ধরে রাখতে পারেনি দেশের দুই পুঁজিবাজার। বাজার সংশ্লিষ্টরা গতকালের বাজার আচরণকে আগের দিনগুলোর ধারাবাহিকতা হিসেবেই দেখছেন। কারণ এর আগে গত সপ্তাহের শেষ দুই দিন বড় ধরনের সূচক হারায় দুই বাজার। বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশার বিপরীতে ধারাবাহিক এ পতন নিয়ে তাই উদ্বিঘœ বিনিয়োগকারীরা।

প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ১৯ দশমিক ৯২ পয়েন্ট হারায়। ৫ হাজার ৮০৪ দশমিক ২৯ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি গতকাল দিনশেষে নেমে আসে ৫ হাজার ৭৮৪ দশমিক ৩৬ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির বিশেষায়িত দুই সূচক ডিএসই-৩০ ও শরিয়াহর অবনতি ঘটে যথাক্রমে ৬ দশমিক ৫১ ও ৫ দশমিক ৭৫ পয়েন্ট। ডিএসইতে দিনের শুরুতে সূচকের উন্নতি রেকর্ড করা হয় ২৮ পয়েন্টের বেশি। লেনদেনের প্রথম আধঘণ্টা বেশ ভালোভাবেই পার করে দুই বাজার। এর পরই বিক্রয়চাপ সৃষ্টি হলে বেলা ১১টার দিকে সূচকটি নেমে আসে ৫ হাজার ৭৭৭ পয়েন্টে। একই সময় দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সব ক’টি সূচকের অবনতি ঘটে। এখানে সিএসইর সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ১৩৩ দশমিক ১৪ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। ১৫ হাজার ৬২০ দশমিক ৩৯ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি দিনশেষে স্থির হয় ১৫ হাজার ৪৮৭ দশমিক ১৪ পয়েন্টে। বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্সের অবনতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ৯৩ দশমিক ৪৩ ও ৮৬ দশমিক ৬৫ পয়েন্টে।

সকালে সূচকের উন্নতি দিয়েই লেনদেন শুরু করে দুই পুঁজিবাজার। ৫ হাজার ৬০৪ দশমিক ২৯ পয়েন্ট থেকে দিন শুরু করা সূচকটি প্রথম আধঘণ্টায় পৌঁছে যায় ৫ হাজার ৮৩২ পয়েন্টে। এখান থেকেই শুরু হয় বিক্রয়চাপ। বেলা ১১টার দিকে সূচকটি নেমে আসে ৫ হাজার ৭৭৭ পয়েন্টে। প্রথম দিকের এ চাপ দ্রুত সামলে নেয় দুই বাজার। বেলা সাড়ে ১২টার দিকে ডিএসই সূচক ফের পৌঁছে যায় পাঁচ হাজার ৮২৮ পয়েন্টে। লেনদেনের এ পর্যায়ে আবার সৃষ্টি হয় বিক্রয়চাপ। এখান থেকে ফেরত পাওয়া সূচক আবারো নি¤œমুখী হয়ে ওঠে। দিনশেষে ডিএসইর প্রধান সূচকটি ৫ হাজার ৭৮৪ পয়েন্টে স্থির হয়। সূচকের অবনতি বাজারের গতি দ্রুত কমতে থাকে। এতে লেনদেনের সাবলীলতা বাঁধাগ্রস্ত হয়। ফলে বড় ধরনের অবনতি ঘটে বাজারটির লেনদেনে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দিনের শুরুতে বাজারে যে গতি ছিল তাতে হাজার কোটি টাকা লেনদেন হওয়ার কথা। কিন্তু বিক্রয়চাপের কারণে সূচকের যে অবনতি ঘটে তাতে বিনিয়োগকারীরা হাল ছেড়ে দেন। বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ এ সময় হাত গুটিয়ে নেন। এ পর্যায়ে তারা বিনিয়োগের চাইতে বাজার পর্যবেক্ষণেই সময় পার করে। এতে ডিএসইর লেনদেনের বড় ধরনের অবনতি ঘটে। ঢাকা শেয়ারবাজার গতকাল ৭৮০ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে, যা আগের দিনের চেয়ে ১৫৮ কোটি টাকা কম। গত বৃহস্পতিবার ডিএসইর লেনদেন ছিল ৯৩৮ কোটি টাকা। দেশের দ্বিতীয় শেয়ারবাজার সিএসইর লেনদেনের অবনতি ছিল চোখে পড়ার মতো। গতকাল বাজারটি পাঁচ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে, যা আগের দিন অপেক্ষা ১৫ কোটি টাকা কম। গত বৃহস্পতিবার সিএসইর লেনদেন ছিল ২০ কোটি টাকা। গতকাল সাম্প্রতিক সময়ের সর্বনিম্ন লেনদেন ছিল সিএসইর। ২০২৬ সালে সিএসইর লেনদেন আর এ পর্যায়ে নামেনি।

দিনের বাজার আচরণ বিনিয়োগকারীদের কাছে অপ্রত্যাশিত ছিল। মতিঝিলে অবস্থিত ডিএসইর ব্রোকার ও মার্চেন্ট ব্যাংকের ট্রেডিং ফ্লোরগুলোতে বিনিয়োগকারীদের সাথে দিনের বাজার আচরণ নিয়ে জানতে চাইলে তারা নয়া দিন্তকে বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের পক্ষ থেকেই বেশি বিক্রয় চাপ আসছে। নিজেদের সক্ষমতাকে ব্যবহার করে তারা দ্রুত মুনাফা তুলে নেয়ার চেষ্টায় থাকে। এতে বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হচ্ছে। তারাই বাজারকে স্বাভাবিক হতে দিচ্ছে না।

এ দিকে গতকাল উভয় পুঁজিবাজারেই লেনদেন হওয়া কোম্পানি ও ফান্ডগুলোর বেশির ভাগই দরপতনের শিকার হয়। বেশ কয়েকটি খাতে দরহারায় শতভাগ কোম্পানি। ব্যাংক, সিমেন্ট সিরামিক, সেবা, ওষুধ ও রসায়ন, প্রকৌশল ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে সবচেয়ে বেশি দরপতন ঘটে। ভালো অবস্থানে ছিল বীমা ও টেক্সটাইল খাত। এ দু’টি খাতে ৮০ শতাংশ কোম্পানির মূল্যবৃদ্ধি ঘটে। ঢাকা বাজারে লেনদেন অংশ নেয়া ৩৮৯টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ১১৬টির মূল্যবৃদ্ধির বিপরীতে দর হারায় ২৪০টি। দর অপরিবর্তিত ছিল ৩৩টির। অপর দিকে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে লেনদেনে অংশ নেয়া ২১৮ সিকিউরিটিজের মধ্যে ৫৭টির মূল্যবৃদ্ধির বিপরীতে দর হারায় ১৩৯টি। এখানে দর অপরিবর্তিত ছিল ২২টি সিকিউরিটিজের।

ঢাকা স্টকে গতকাল লেনদেনের শীর্ষে উঠে আসে সেবা খাতের কোম্পানি সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট। ২৭ কোটি ৬৩ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ৫১ লাখ ৪৭ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল। ২২ কোটি ৪৯ লাখ টাকার শেয়ার বেচাকেনা করে এম এল ডাইং ছিল দ্বিতীয় অবস্থানে। ডিএসইর লেনদেনে শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে আইটি কনসালট্যান্ট, আইপিডিসি, ড্রাগন সোয়েটার অ্যান্ড স্পিনিং, বেক্সিমকো লিমিটেড, লাভেলো আইসক্রিম। কুইন সাউথ টেক্সটাইলস, মালেক স্পিনিং ও টেকনোড্রাগস।

মূল্যবৃদ্ধিতে গতকাল প্রাধান্য ছিল বীমা খাতের। এদিন মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষে আসা কোম্পানিটি ছিল সাধারণ বীমা খাতের বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স। গতকাল ৯ দশমিক ৭৬ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি ঘটে কোম্পানিটির। ৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পাওয়া টেক্সটাইল খাতের এমএল ডাইং ছিল দ্বিতীয় স্থানে। ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে বিডি থাই ফুড, রিলায়েন্স ইন্স্যুরেন্স, গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্স, পিপলস ইন্স্যুরেন্স, কর্ণফুলী ইন্স্যুরেন্স, ড্রাগন সোয়েটার, বিডি থাই অ্যালুমিনিয়াম ও ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্স।