গুমের সাথে জড়িতদের অনেকেই বহাল

শঙ্কা কাটছে না ভুক্তভোগী পরিবারের

২০২৪ এর ৫ আগস্টের পর গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশন যাত্রা শুরু করে। প্রথমে ভয়ে সেখানেও তথ্য দিতে চায়নি অনেকেই। তবুও বিচারের আশায় চরম হুমকি উপেক্ষা করে সব ধরনের তথ্য দিয়েছিলেন কমিশনের কাছে। কমিশন থাকা অবস্থায়ও নামে-বেনামে হুমকি পেয়েছেন অনেকে।

আমিনুল ইসলাম
Printed Edition

শঙ্কা কাটছে না গুম হওয়া পরিবারের সদস্যদের। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যেসব সদস্য গুমের সাথে জড়িত ছিলেন তাদের অনেকেই রয়েছেন বহাল তবিয়তে। বিগত দিনে এসব সদস্যদের নির্যাতন, গুম, খুন ক্রসফায়ার, ধর্ষণের হুমকিতে মুখ খুলতে পারেননি অনেকেই। কিন্তু ২০২৪ এর ৫ আগস্টের পর গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশন যাত্রা শুরু করে। প্রথমে ভয়ে সেখানেও তথ্য দিতে চায়নি অনেকেই। তবুও বিচারের আশায় চরম হুমকি উপেক্ষা করে সব ধরনের তথ্য দিয়েছিলেন কমিশনের কাছে। কমিশন থাকা অবস্থায়ও নামে-বেনামে হুমকি পেয়েছেন অনেকে।

ভুক্তভোগীরা বলছেন, এখন কমিশনের কার্যক্রম শেষ। এই অবস্থায় ক্ষমতায় থাকা সেই সব সদস্যদের নিয়ে প্রতিনিয়ত ভয়ে থাকতে হচ্ছে ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের। কারণ চোখ বন্ধ করলেই গুমের সাথে জড়িত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সে সব সদস্যদের সেই ভয়ঙ্কর রূপ ভেসে উঠছে। যা মনে করে আতকে উঠতে হচ্ছে তাদের।

যদিও কমিশনের কর্মকর্তা বলছেন, কমিশনের কাজ বিচার করা নয়। তবে আমাদের বিশ্বাস যারাই সরকার গঠন করুক না কেন, তারা গুমের সাথে জড়িত প্রত্যেককে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করবে। তা না হলে চরম ক্ষতির মুখে পড়তে হবে গোটা জাতিকে।

২০১২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর টঙ্গী থেকে গুম হওয়া বিএনপি নেতা ফারুক হোসেন টিটুর স্ত্রী মোর্শেদা বলেন, স্বামী গুম হওয়ার পর সহযোগিতার জন্য পুলিশ, র‌্যাবসহ বিভিন্ন সংস্থার দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি। কিন্তু সহযোগিতা তো দূরে থাক, হুমকিতে তিন সন্তান নিয়ে বেঁচে থাকাটাও দায় হয়ে পড়েছিল। বছরের প্রতিটি দিন মনে হতো এই বুঝি আমার সন্তানদের তুলে নিয়ে যায়। এই বুঝি আমাকেও তুলে নিয়ে আমার সন্তানদের সম্পূর্ণ এতিম করে দেয়। ১২ বছর ধরে বিভিন্ন দফতরে দৌড়েও কোনো লাভ হয়নি। এক কানে সব অভিযোগ শুনে অন্য কান দিয়ে বের করে দিয়েছে।

তিনি বলেন, সেদিন র‌্যাব-১ এর একদল সদস্য জোর করে টিটুকে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায়। এর আগেও তাকে তুলে নিয়ে তিন দিন আটক রেখেছিল। মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে তিন দিন পর গভীর রাতে টঙ্গী থানায় রেখে যায় র‌্যাব। কিন্তু এবার আর ছাড়েনি তাকে। র‌্যাব-১ এর যে অফিসার টিটুকে ধরে নিয়ে যান, সেই অফিসারই নিখোঁজ টিটুর সন্তানদের খোঁজ নিতে বাসা যান। আসলে তিনি বাচ্চাদের দেখতে যেতেন না। তিনি টিটুর পরিবারকে কৌশলে হুমকি দিয়ে আসতেন। যাতে এই ঘটনা কাউকে কিছু না জানাই।

ঘটনার তিন মাস পর মামলার আইও র‌্যাব সদস্য রফিকুল মোরশেদাকে টঙ্গী রেলস্টেশনে যেতে বলেন। সেখানে গেলে তিনি মোর্শেদাকে বলেন ‘আপনি অনেক দৌড়ঝাঁপ করছেন। এতে আপনার কষ্ট হচ্ছে। তার চেয়ে এই দৌড়ঝাঁপ বাদ দেন। তিনটি মেয়ে নিয়ে ভালো থাকেন। না হলে মেয়েদেরও সমস্যা হতে পারে। এতে করে রফিকুলে ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন মোর্শেদা। তখন রফিকুল তাকে একটি সুযোগ দিয়ে বলেন, আপনার স্বামীকে ছেড়ে দিতে পারি, যদি আপনি চারজনের নামে মামলা করতে পারেন। স্বামীকে ফিরে পাবার কথা শুনে রাজি হন মোর্শেদা। এরপর আইও রফিকুল তাকে নুর মোহাম্মদ, হারুন অর রশিদ, দিলরুবা ও আব্দুল হামিদ নামে চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করতে বলেন।

মোর্শেদা বলেন, এদেরকে আমি চিনি না। অথচ র‌্যাবের কথায় তাদের বিরুদ্ধে টঙ্গী থানায় মামলা দায়ের করি। এরপর থেকে আইও আর আমার ফোন ধরে না। আবার শুরু হয় ছোটাছুটি। তিন বছর পর টিটুকে অপহরণের নেতৃত্বদানকারী র‌্যাব ১ এর অফিসার মামুন আমাদের বাসায় আসেন। তিনি জানতে চান টিটুর মেয়েরা কেমন আছে। এরপর আশপাশের লোকজন জড়ো হয়ে তাকে জেরা শুরু করলে তোপের মুখে পড়ে তিনি কৌশলে পালিয়ে যান। মোর্শেদা বলেন, এক দিকে স্বামীর সন্ধানে দৌড়ঝাঁপ করেছি। অন্য দিকে র‌্যাব আমাদের সাথে একের পর এক নাটক করে গেছে। তিনি বলেন, টিটু গুমের সাথে জড়িত সে সব কর্মকর্তারা এখনো সরকারি চাকরিতে বহাল রয়েছে। শুধু বদলি হয়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে গেছেন। তাদের বিচারের আওতায় না আনলে আমরা কেউ নিরাপদ থাকব না।

২০১১ সালের ২ জানুয়ারি কচুক্ষেতের বাসা থেকে বের হয়ে ফিরে আসেননি নুর আলম। তার সাথে থাকা বন্ধু আল আমিন বলেছিল বিমানবন্দর এলাকা থেকে একটি সাদা মাইক্রোবাসে করে আসা কয়েকজন তাকে তুলে নিয়ে গেছে। এরপর বছরের পর বছর থানা পুলিশ র‌্যাব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সংস্থার দ্বারে দ্বারে দৌড়েছেন তার পরিবারের সদস্যরা। কাফরুল থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ মামলা না নিয়ে একটি অভিযোগ লিখে রাখে। এমনকি জিডি হিসেবেও গ্রহণ করেনি। উল্টো হুমকি দিয়ে বলে, যে বেশি বাড়াবাড়ি করলে তারও হদিস থাকবে না।

২০১৩ সালের ১৭ মে মিরপুর থেকে গুম হওয়া কুদ্দুসুর রহমানের মেয়ে বলেন, তৎকালীন র‌্যাবের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে জমিসংক্রান্ত বিরোধের কারণে র‌্যাব দিয়ে গুম করা হয় তার বাবাকে। শুধু গুম করেই ক্ষ্যান্ত হয়নি তারা বাবা হারা পরিবারকে ঢাকা ছাড়তে বাধ্য করেছে। তাদের ভয়ে পালিয়ে গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরেও থাকতে পারেননি। বিচারের জন্য যাতে কোথাও দৌড়াদৌড়ি না করি তার জন্য নামে বেনামে হুমকি, উড়ো চিঠি, মোবাইলে মেসেজ দিয়ে হুমকি দিয়ে আসছিল। এমনকি গুমসংক্রান্ত কমিশনে অভিযোগ দেয়ার পরও তাদের হুমকি দেয়া হয়েছে, যা কমিশনকে জানানো হয়েছিল।

ভুক্তভোগীরা বলেন, ভয়ে চুপ করে ছিলাম, হয়তো বেঁচে থাকতাম। কিন্তু বিচারের আশায় গুম কমিশনে সব অভিযোগ দিয়েছি। কিন্তু এখনো গুমের সাথে জড়িত সে সব ব্যক্তি বহাল রয়েছেন। যার কারণে শঙ্কা কাটছে না।

এ ব্যাপারে গুমসংক্রান্ত কমিশনের সদস্য নুর খান লিটন নয়া দিগন্তকে বলেন, কমিশনের কাজ ছিল তদন্ত করে সত্য উদঘাটন করা। বিচার করা নয়। কমিশনে জমা পড়া অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাই করে যেগুলো আমলে নেয়ার মতো সেগুলো আমলে নেয়া হয়েছে। বাকিগুলো গ্রহণ করেনি। যেগুলো আমলে নেয়া হয়েছিল সেগুলো বিচারের জন্য সংশ্লিষ্ট মাধ্যমে পাঠানো হয়েছে। তা ছাড়াও অনেকেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি)তে অভিযোগ দিয়েছেন। ইতোমধ্যে আইসিটি বেশ কিছু বিষয় নিয়ে কাজও শুরু করেছে। আইসিটি কমিশনের সাথেও যোগযোগ করেছে। তিনি বলেন, কমিশনের বিশ্বাস অভিযুক্ত সবাই বিচারের মুখোমুখি হবে। আগামীতে যারাই সরকার গঠন করবে, তারা এই বিচার কাজ সম্পূর্ণ করবে। তা না হলে চারম ক্ষতির মুখে পড়তে হবে জাতিকে।