এস এম মিন্টু সেন্টমার্টিন থেকে ফিরে
- দুর্যোগে সাধারণ মানুষ যখন নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরে, নৌবাহিনীর সদস্যরা তখন সাগরে ছুটে চলে : লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মহিউদ্দিন
- উপকূলীয় এলাকায় নিরাপদ, শন্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করাই নৌবাহিনীর লক্ষ্য : লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মাহিম
- নৌবাহিনী আমাদের সুখ-দুঃখের সাথী হয়ে গেছে : স্থানীয় বাসিন্দা
‘আবহাওয়ার যখন বিপদ সঙ্কেত, চারদিকে থমথমে আতঙ্ক। ধেয়ে আসতে থাকে ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাস। দেখা দেয় জানমালের বিরাট ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা। সাধারণ মানুষ, সবাই ছুটে চলেন নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে। এটাই স্বাভাবিক। অথচ, উত্তাল সাগরের বুকে তখন এগিয়ে যান বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সদস্যরা। অতন্দ্র প্রহরীর মতো সাগর-উপকূলের জেলে, বাসিন্দা এবং ট্রলার-জাহাজগুলোকে নিরাপদ আশ্রয়ে নিতে ঝাঁপিয়ে পড়েন নৌসদস্যরা।’
গত সপ্তাহে বঙ্গোপসাগরের সেন্টমার্টিন দ্বীপ ও গভীর সমুদ্র এলাকায় গেলে আলাপকালে এমন বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন বাংলাদেশ নৌবাহিনীর লেফটেন্যান্ট কমান্ডার পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা। সংশ্লিষ্টরা জানান, কেবল দুর্যোগে বা বিশেষ পরিস্থিতিতে নয়, উপকূলের সাধারণ মানুষের জানমাল রক্ষা, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, সন্ত্রাস দমন, মাদকবিরোধী অভিযানসহ বর্তমানে জাতীয় নির্বাচনকেন্দ্রিক সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতেও ভরসার প্রতীক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী।
সরেজমিনে উপকূলের স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা জানান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি উপকূলের সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা, শীতবস্ত্র, বিভিন্ন ধরনের খাদ্যপণ্য ও শিক্ষা সামগ্রীসহ নানা মানবিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে তারা স্থানীয়দের আস্থা-ভরসার প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। বর্তমানে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকেন্দ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন নৌবাহিনীর সদস্যরা।
উপকূলে নিয়োজিত নৌবাহিনীর কর্মকর্তারা বলেছেন, সামুদ্রের নিরাপত্তা, ব্লু ইকোনমির সুরক্ষা, বন্দর ব্যবস্থাপনা ও দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে নৌবাহিনী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। পাশাপাশি ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’-এর আওতায় নৌবাহিনী তার দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকাগুলোতে সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সহায়ক ভূমিকা হিসেবে প্রয়োজনীয় নানা তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, বাংলাদেশের প্রায় সমান আয়তনের এক লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্রসীমার (বঙ্গোপসাগর) নিরাপত্তা-সুরক্ষা নিশ্চিত করে যাচ্ছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী। পাশাপাশি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দায়িত্ব পালনের জন্য আটটি জেলার উপকূলীয় ২৩টি উপজেলা এবং দুটি সিটি করপোরেশনে প্রয়োজনীয় সংখ্যক কন্টিনজেন্ট নিয়োজিত রয়েছে। উপকূলীয় এই ১৬টি সংসদীয় আসনের নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলার সার্বিক দায়িত্ব পালনের জন্য মোতায়েন করা হয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার নৌসদস্য।
গত ১৩ জানুয়ারি সরেজমিনে উপকূলীয় উপজেলা টেকনাফে গেলে কথা হয় স্থানীয় বেশ কিছু বাসিন্দার সাথে। এ সময় টেকনাফ উপজেলা সদরে বৈশাখী রেস্টুরেন্টের সামনের একটি চায়ের দোকানে আড্ডা দিচ্ছিলেন কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা। আলাপকালে তারা বলেন, টেকনাফে ভয়ানক মাদক ইয়াবাসহ নানা অপরাধের তৎপরতা তুলনামূলক অনেক বেশি। সেখানে নৌবাহিনীর একটি কন্টিনজেন্ট স্থাপন হওয়ার পর থেকে মাদকসহ অন্যান্য অপরাধের মাত্রা কিছুটা হলেও কমেছে। এখানে নৌবাহিনীর সদস্যরা নিয়মিত টহল ও অভিযান পরিচালনা করছেন। নতুন করে ভোটের আমেজ শুরু হওয়ায় নৌবাহিনীর সার্বিক তৎপরতা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে এলাকায় অনেকটা স্বস্তি অনুভব করা যাচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে নৌবাহিনীর টেকনাফ কন্টিনজেন্টের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মাহিম বলেন, ‘টেকনাফ অঞ্চলটি মাদকদ্রব্য, মানব পাচার, অবৈধ অস্ত্র এবং অপহরণ কার্যক্রমের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। এরই মধ্যে নৌবাহিনী এই এলাকায় বেশ কিছু সফল অভিযান পরিচালনা করেছে। বাংলাদেশ নৌবাহিনী দেশের উপকূলীয় নিরাপত্তা, মানব পাচার প্রতিরোধ, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং সমুদ্রপথে অপরাধ দমনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। গত বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত নৌবাহিনীর এই কন্টিনজেন্ট টেকনাফের জল, স্থল ও সীমান্তে মোট ৭০টি বিশেষ অভিযান চালিয়েছে, যার মধ্যে ৩৪টি একক এবং ৩৬টি যৌথ অভিযান। আমরা এই এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছি এবং সর্বদা সচেষ্টভাবে প্রস্তুত রয়েছি।’
লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মাহিম আরো বলেন, ‘আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নৌবাহিনীর দায়িত্বপ্রাপ্ত উপকূলীয় এলাকগুলোয় একটি নিরাপদ, শন্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করাই নৌবাহিনী কন্টিনজেন্টের প্রধান লক্ষ্য।’
অন্য দিকে গত ১৪ জানুয়ারি সরেজমিনে সেন্টমার্টিন দ্বীপে গেলে কথা হয় স্থানীয় জেলে মো: আলমের সাথে। ওই দিন দুপুরে তিনি নৌবাহিনীর ফ্রি মেডিক্যাল ক্যাম্পে চিকিৎসাসেবা নিতে যান। আলাপকালে মো: আলম বলেন, সমুদ্রে বা উপকূলে নৌবাহিনী আমাদের প্রধান ভরসা। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস বা যে কোনো সঙ্কটে সবার আগে আমরা নৌবাহিনীকে পাশে পাই। অনেক সময় মাঝ সমুদ্রে ট্রলারের ইঞ্জিন বিকল হয়, খাদ্য সঙ্কট হয়, বৈরী আবহাওয়ায় জীবনের ঝুঁকি দেখা দেয়- তখনও দেখি কোনো না কোনোভাবে খবর পেয়ে নৌবাহিনী গিয়ে আমাদের উদ্ধার করে আনে।’
একই ধরনের মন্তব্য করেন সেন্টমার্টিনের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মো: শুক্কুর আলী। তিনি বলেন, ‘পর্যটন মৌসুমে আমরা আর্থিকভাবে বেশ ভালোভাবে চলতে পারলেও বছরের বড় একটি সময় খুব কষ্ট করে চলতে হয়। তখন নৌবাহিনীর কাছ থেকে ফ্রি চিকিৎসাসেবা, খাদ্য-বস্ত্রসহ নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকি। বলতে গেলে নৌবাহিনী আমাদের সুখ-দুঃখের সাথী হয়ে গেছে।’
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা আরো জানান, সেন্টমার্টিন দ্বীপে ২০ শয্যাবিশিষ্ট একটি হাসপাতাল থাকলেও সেখানে ডাক্তার-নার্স এবং এক্স-রে বা ‘প্যাথলজিক্যাল’ পরীক্ষাসহ সব কিছুতেই মারাত্মক সঙ্কট রয়েছে। দরিদ্র শ্রেণীর স্থানীয় বাসিন্দারা চিকিৎসাসেবার অভাবে প্রায় সময় নানা রকম করুণ পরিস্থিতির সম্মুখীন হন। এমন এক প্রেক্ষাপটেও নৌবাহিনী স্থানীয়দের ভরসার জায়গা করে নিয়েছে। সেন্টমার্টিন দ্বীপের সুবিধা বঞ্চিত বাসিন্দাদের জন্য সেখানে নৌবাহিনীর স্থানীয় কন্টিনজেন্ট এবং টহলে যাওয়া বিভিন্ন জাহাজ নিয়মিত বিনামূল্যে চিকিৎসা ক্যাম্পের ব্যবস্থা করে থাকে। ফ্রি চিকিৎসা ও ওষুধ ছাড়াও নৌবাহিনী সেন্টমার্টিনে নানা মানবিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এ প্রসঙ্গে নৌবাহিনীর সেন্টমার্টিনের ফরোয়ার্ড ঘাঁটির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওআইসি) লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মহিউদ্দিন বলেন, ‘সামুদ্রিক দুর্ঘটনা বা যেকোনো দুর্যোগে নৌবাহিনীর সদস্যরা নিয়মিতভাবে তাৎক্ষণিক উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে থাকে। দুর্যোগে সাধারণ মানুষ যখন নিরাপদ আশ্রয়ে ফেরে, নৌবাহিনীর সদস্যরা তখন অতন্দ্র প্রহরীর মতো সাগরের বুকে ছুটে চলে। সাগরে কেউ বিপদে পড়ে আছে কি না, উপকূলে কেউ আটকে আছে কি না- খোঁজে খোঁজে বিপদগ্রস্তদের উদ্ধার করে আমরা নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে আসি। এটাকে আমরা আমাদের দায়িত্ব হিসেবেই মনে করি।’
লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মহিউদ্দিন বলেন, ‘সমুদ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বর্তমানে সেন্টমার্টিন দ্বীপেও জাতীয় নির্বাচনকেন্দ্রিক দায়িত্ব পালন করছে নৌবাহিনী। সাধারণ জনগণ যাতে অবাধে এবং নিরাপদে ভোট দেয়ার মাধ্যমে তাদের সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, তা নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রতিটি সদস্য সম্পূর্ণরূপে সতর্ক, পেশাদার এবং তাদের কর্তব্যের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে।’



