নয়া দিগন্ত ডেস্ক
নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৩৩২ জনে দাঁড়িয়েছে। এ ঘটনায় নিখোঁজ রয়েছেন আরো ৮২৬ জন। নিখোঁজদের মধ্যে বিদেশী পর্যটকও রয়েছেন। কাঠমান্ডু পোস্ট জানিয়েছে, স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টা ৫০ পর্যন্ত পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নেপাল পুলিশের মুখপাত্র অভি নারায়ণ কাফলে মৃতের সংখ্যা ৩৬০জনে পৌঁছানোর তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
এর মধ্যে চিতওয়ানে ১২১টি, নাওয়ালপরাসি ইস্টে ৭৪টি, ধাদিংয়ে ২৯টি, গোরখায় ২৯টি, নুওয়াকোটে ২৮টি, তানাহুনে ১৯টি, রাসুয়ায় ১৭টি, নাওয়ালপরাসি ওয়েস্টে ১৫টি লাশ পাওয়া গেছে। নেপালের ন্যাশনাল ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটির সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, নিখেঁাঁজ ৮২৬ জনের মধ্যে স্থানীয় বাসিন্দা, নিরাপত্তাকর্মী এবং দেশী-বিদেশী পর্যটক রয়েছেন।
তাদের মধ্যে নেপালি সেনাবাহিনীর ৪৪ জন, নেপাল পুলিশের ২৮ জন এবং আর্মড পুলিশ ফোর্স নেপালের ১৩ জন সদস্য রয়েছেন। নিখোঁজদের বড় একটি অংশ পর্যটক। তাদের সংখ্যা ৫৯০ জন; এর মধ্যে ৪৭৬ জন বিদেশী এবং ১১৪ জন নেপালি পর্যটক।
যেভাবে শুরু ভয়াবহ বন্যা
বুধবার নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে হিমালয় অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর ও মাটির ধস নদীতে পড়ে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়। বন্যার পানি ও ধ্বংসাবশেষ দ্রুতগতিতে নদী উপত্যকা দিয়ে নেমে এসে বসতি, সড়ক, সেতু ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো ভাসিয়ে নেয়। রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, প্রথম দিকে ধারণা করা হয়েছিল ভূমিকম্পের কারণে এ বিপর্যয় ঘটেছে। পরে ভূকম্পনসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানায়, ভূমিকম্প নয়, বরং ভূমিধস থেকেই ওই বিপর্যয় হয়ে থাকতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হিমবাহের একটি বড় অংশ ধসে পড়ার সাথে এ দুর্যোগের যোগসূত্র রয়েছে।
রয়টার্স বলছে, নেপালের রাসুয়া জেলার উঁচু পার্বত্য এলাকা থেকে বরফ ও পাথরের বিশাল ধস নদীর উপত্যকায় আছড়ে পড়ে। এর ফলে নদীতে হঠাৎ বিপুল প্রবাহ তৈরি হয়। পরে সেই স্রোত নেপালের বিভিন্ন জনপদ এবং চীন-নিয়ন্ত্রিত তিব্বতের কিছু এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। বন্যার প্রবল স্রোত ভুটে কোশি, ত্রিশূলীসহ সংশ্লিষ্ট নদী অববাহিকা ধরে নিচের দিকে নেমে যায়। এতে বহু বাড়িঘর, সড়ক, সেতু ও অন্যান্য স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় দুর্গম এলাকাগুলোতে উদ্ধার তৎপরতাও কঠিন হয়ে উঠেছে।
নিখোঁজদের মধ্যে শত শত বিদেশী
বন্যায় নেপালে নিখোঁজ পর্যটকদের মধ্যে ৫৯০ জন বিদেশী বলে জানিয়েছে নেপালের কর্তৃপক্ষ। তাদের মধ্যে ভারতীয় নাগরিকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। কাঠমান্ডু পোস্টের তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ বিদেশী পর্যটকদের মধ্যে ১৭৭ জন ভারতীয়, ৬৩ জন মার্কিন, ৫৩ জন ইউক্রেনীয়, ৩৪ জন অস্ট্রেলীয় এবং ৩৩ জন ব্রিটিশ নাগরিক। রয়টার্সও জানিয়েছে, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, কানাডা, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের নাগরিকদের মধ্যে অনেকে নিখোঁজ রয়েছেন। অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং জানিয়েছেন, দেশটির অন্তত ৩৪ নাগরিকের সাথে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। নিখোঁজদের একটি অংশ তিব্বতের কৈলাস-মানস সরোবর তীর্থযাত্রায় যাওয়া পর্যটক ও তীর্থযাত্রী। আবার অনেকে ট্রেকিং বা ভ্রমণের উদ্দেশে নেপালের পার্বত্য এলাকায় গিয়েছিলেন।
বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, দুর্গম ভূপ্রকৃতি, খারাপ আবহাওয়া এবং যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উদ্ধারকর্মীদের জন্য নিখেঁাঁজদের অবস্থান শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। নেপালের পাশাপাশি তিব্বতেও এ দুর্যোগের ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, তিব্বতের গিরং কাউন্টিতে ৫৫৮ জন নিখেঁঁাঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশী নাগরিক। সেখানে তিনজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে।
বন্যার পানিতে নেপাল-তিব্বত সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থলবন্দর ও আশপাশের অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চীনা কর্তৃপক্ষ ওই এলাকায় আরো একটি সম্ভাব্য ঝুঁঁকির বিষয়ে সতর্ক রয়েছে। একটি নদীর সংযোগস্থলের কাছে পানি আটকে তৈরি হওয়া একটি হ্রদ বা জলাধার থেকে পরবর্তী সময়ে নতুন করে বন্যা দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বন্যাকবলিত এলাকাগুলোতে নেপালি সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা উদ্ধার তৎপরতা চালাচ্ছেন। হেলিকপ্টার ব্যবহার করে দুর্গম এলাকা থেকে মানুষকে সরিয়ে নেয়া এবং ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেয়ার কাজও চলছে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, নেপালে উদ্ধার তৎপরতায় হাজার হাজার নিরাপত্তাকর্মী ও জরুরি সেবা সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এ পর্যন্ত বহু মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। তবে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন এবং অনেক এলাকা কাদা ও ধ্বংসাবশেষে ঢেকে থাকায় উদ্ধার অভিযান ব্যাহত হচ্ছে। নেপালের ত্রিশূলী ও অন্যান্য নদীর তীরবর্তী এলাকায় পানির স্রোত ও কাদার কারণে বহু স্থানে স্বাভাবিক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, নেপালি সেনাবাহিনী নিখোঁজদের সন্ধানে অভিযান চালাচ্ছে। দুর্গম ভূখণ্ড ও প্রতিকূল আবহাওয়া উদ্ধারকাজকে আরো জটিল করে তুলেছে।
বিজ্ঞানীদের মতে, এটি ছিল ‘তরল কংক্রিটের’ মতো ধেয়ে আসা ঢল
নেপালের ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের প্রকৃতি নিয়ে বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছেন বিশ্বজুড়ে পরিবেশ ও জলবিজ্ঞানীরা। এ দুর্যোগে পাহাড় থেকে প্রবল কাদা ও পানির স্রোত অনেকটা ‘তরল কংক্রিটের’ মতো দ্রুতগতিতে নেমে আসে, যা আগে থেকে অনুমান করা কার্যত অসম্ভব ছিল। নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল ভূমিকম্পের কারণে ভূমিধস হয়ে নদীর গতিপথ আটকে প্রাকৃতিকভাবে গঠিত বাঁধ ভেঙে দুর্যোগটি হতে পারে বলে ধারণা ব্যক্ত করেন। তবে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, সেখানে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার যে ভূকম্পন রেকর্ড করা হয়েছে, তা মূলত ভূমিধসের কারণেই তৈরি হয়েছে।
এ দিকে কাঠমান্ডুভিত্তিক সংস্থা ‘আইসিআইএমওডি’র বিশ্লেষক সার্থক শ্রেষ্ঠ জানান, প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী নেপাল অংশে একটি পাথুরে বরফধসের ফলে লেন্দে নদীর গতিপথ আটকে গিয়ে এ তীব্র বন্যার সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে। টেক্সাস ইউনিভার্সিটি সান আন্তোনিওর জলবিজ্ঞানী হাতিম শরিফ এ ঘটনাকে অবাক করার মতো উল্লেখ করে বলেন, দুর্যোগের আগে কোনো ভারী বৃষ্টিপাত হয়নি, যা বিদ্যমান বন্যা সতর্কীকরণ ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে দেয়। ইউকের রিডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ডরোথি হাইনরিচ জানান, সঙ্কীর্ণ পাহাড়ি নদীগুলোর গতিপথ তুষার বা ভূমিধসে আটকে গেলে বিপুল পানি জমা হয়ে এমন বিধ্বংসী ঢল নামতে পারে। এ দিকে আইসিআইএমওডির বিশেষজ্ঞ চিয়াংগং ঝাং সতর্ক করেছেন, উজানে এখনো নদীর গতিপথ অবরুদ্ধ থাকায় দ্বিতীয়বার প্রবল ঢলের ঝুঁঁকি রয়ে গেছে। এ ঘটনার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব রয়েছে কি না, তা নির্ধারণে বিজ্ঞানীরা ‘অ্যাট্রিবিউশন স্টাডি’ করবেন। তবে বিশেষজ্ঞরা একমত যে, হিমালয় অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, হিমবাহ গলে যাওয়া এবং স্থায়ী বরফ ক্ষয়ের কারণে এ ধরনের আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁঁকি বহুগুণ বেড়ে গেছে।



