শিক্ষাঙ্গনে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার নতুন ছক

শাহেদ মতিউর রহমান
Printed Edition
  • অ্যাডহক কমিটির মেয়াদ শেষে নিয়মিত কমিটি
  • সক্রিয় হচ্ছে দলীয় ছাত্ররাজনীতি
  • ভিসি নিয়োগেও দলীয় পরিচয় প্রাধান্য

নতুন ছকে এগোচ্ছে শিক্ষাঙ্গনে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কৌশল। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় বিবেচনায় ভিসি নিয়োগের পর এবার স্কুল-কলেজ পর্যায়েও দলীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সব আয়োজন সম্পন্ন হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার বিভিন্ন স্কুল-কলেজের অ্যাডহক কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর এখন নিয়মিত কমিটি গঠনে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করার তোরজোর শুরু হয়েছে। শিক্ষাঙ্গণে দলীয় লোকদের সম্পৃক্ত করতে পারলে স্থানীয় রাজনীতিতে তাদের প্রভাব অনেকটাই একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। ইতোমধ্যে স্কুল-কলেজের কমিটি গঠনের নীতিমালাও প্রকাশ করেছে শিক্ষা বোর্ড। যদিও এর আগে বিএনপি সরকার গঠনের পরপরই প্রথম পদক্ষেপ হিসেবেই প্রধান প্রধান পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি পদে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। বাকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একই পন্থায় ভিসি পদে নিয়োগ দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা গেছে। ক্যাম্পাসভিত্তিক ছাত্ররাজনীতিতেও গতি-প্রকৃতি বদলানোর আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

এ দিকে সরকার গঠনের পরপরই বিএনপি তাদের দলীয় পদধারী ব্যক্তিদের ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেয়ার পর শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। দলীয় পদধারী ব্যক্তিদের ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেয়ায় বিষয়টি আগের আওয়ামী আমলের অনুসরণ বলেও মন্তব্য করেছেন অনেকেই। শিক্ষাবিদরা বলছেন- পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভিসি নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধা ও যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্যকে প্রাধান্য দেয়ার চর্চা দীর্ঘদিনের। গত ১৫ বছর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ‘নীল দল’ বা দলীয় সমর্থক শিক্ষকদের এই পদে বসানো হয়েছিল। ২০২৪-এর ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর প্রত্যাশা ছিল শিক্ষা খাতে দলীয়করণের অবসান ঘটবে। কিন্তু বর্তমানেও প্রায় একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।

সম্প্রতি ভিসি হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্তদের বড় অংশই সরাসরি বিএনপিপন্থী শিক্ষক সংগঠনের (যেমন সাদা দল) বর্তমান বা সাবেক শীর্ষ নেতা। ফলে এসব নিয়োগ উচ্চশিক্ষার মান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অন্য দিকে দলীয় বিবেচনায় ভিসি নিয়োগ দেয়ার প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে খোদ শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, রাজনীতি যারা করেন তাদের যোগ্যতার ঘাটতি রয়েছে বিষয়টি এমন নয়। কেননা এই শিক্ষকদেরও মধ্যে অনেকে যোগ্য ও দক্ষ রয়েছেন।

ভিসি নিয়োগের নিয়মনীতি উপেক্ষা

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভিসি নিয়োগের নির্দিষ্ট বিধান থাকলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে না। ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সিনেট প্যানেলের মাধ্যমে ভিসি নির্বাচনের নিয়ম থাকলেও দীর্ঘ সময় ধরে তা অনুসরণ করা হচ্ছে না। ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিজস্ব আইন মেনে একাডেমিক ও প্রশাসনিক দক্ষতাসম্পন্ন কাউকে ভিসি নিয়োগ দেয়া হবে এটাই প্রত্যাশিত হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না বলেই মনে করছের বিশেষজ্ঞরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন গত ১৫ মার্চ বলেছিলেন, শিক্ষা কারো ব্যক্তিগত বা দলীয় বিষয় নয় বরং এটি সবার মৌলিক অধিকার। অথচ তার ঠিক একদিন পরেই দেশের সাত-আটটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নিয়োগ দিলেন সম্পূর্ণভাবে দলীয় ভিত্তিতে। অথচ এর আগে তিনি আরো বলেছিলেন, সার্চ কমিটির মাধ্যমে ভিসি নিয়োগ দিবেন।

দলীয় নিয়োগ উচ্চশিক্ষার জন্য হুমকি?

শিক্ষাবিদদের মতে, ভিসি যখন কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শের অনুসারী হয়ে নিয়োগ পান, তখন তিনি প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা হারান। এর ফলে অনেক ধরনের সঙ্কট দেখা দেয়ার ইতিহাসও আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ প্রশাসনিক কাজ, বিশেষ করে শিক্ষক ও কর্মকর্তা নিয়োগ সেখানকার ভিসির নিয়ন্ত্রণে থাকে। আবার দলীয় বিবেচনায় ভিসি নিয়োগ দেয়া হলে সেখানে যেকোনো নিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু দলীয় অনুসারীদের নিয়োগ দেয়ার হিড়িক পড়ে, যা দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার মান কমিয়ে দেয়। এর ফলে মেধাবী ও যোগ্য শিক্ষকরা কোণঠাসা হয়ে পড়েন এবং প্রশাসনিক পদের আশায় অনেকেই গবেষণার চেয়ে রাজনীতিতে বেশি সময় দিতে উৎসাহিত হন। বিশেষজ্ঞরা আরো বলছেন, রাজনৈতিক বিবেচনার বাইরে গিয়ে নিরপেক্ষ শিক্ষাবিদদের নিয়ে একটি স্থায়ী সার্চ কমিটি গঠন করে সবদিক বিবেচনায় যোগ্য মানুষটিকে ভিসি নিয়োগ দেয়া উচিত। ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশ বা সংশ্লিষ্ট আইনগুলোর যুগোপযোগী সংস্কার করে ভিসির ক্ষমতায় ভারসাম্য আনার বিষয়টিও বলছেন অনেকে।

গ্রাম পর্যায়ের স্কুল-কলেজেও রাজনৈতিক প্রভাব

বিএনপি সরকার গঠনের পর এখন আগের সেই আওয়ামী লীগের সময়ের মতোই গ্রামাঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। স্কুল কমিটি থেকে ছাত্ররাজনীতি- সবই এখন দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। বিভিন্ন স্কুল-কলেজে স্থানীয় সংসদ সদস্যের ছবি ও স্লোগান লিখে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন শিক্ষক, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীরা। যদিও ইতঃপূর্বে আওয়ামী সরকারের একচ্ছত্র সময়ে হাইস্কুলে ছাত্রলীগের কমিটি দেয়া নিয়ে দেশব্যাপী সমালোচনার ঝড় উঠেছিল। সমালোচনার মুখে দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সেসব কমিটি প্রত্যাহার করেছিলেন। সম্প্রতি গুঞ্জন উঠেছে, নতুন শিক্ষামন্ত্রীর সভায় বিদ্যালয় কমিটিগুলোয় বিদ্যোৎসাহী, জমিদাতাদের পদে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের আনার পরিকল্পনা রয়েছে। সদস্য হতে শিক্ষাগত যোগ্যতার সীমাও তুলে দেয়ার আলোচনা ওঠে। যদিও পরে শিক্ষামন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী দু’জনই পৃথকভাবে পরিষ্কার করেন, শিক্ষাগত যোগ্যতা তুলে দেয়ার ‘প্রশ্নই ওঠে না’ এবং সেটি উল্টো ‘ধাপে ধাপে বৃদ্ধি করা হবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের একজন শিক্ষার্থী শাফায়াত তার অভিমত জানিয়ে লিখেছেন- অতীত অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি স্থানীয়ভাবে দলীয় প্রভাব ধরে রাখতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পছন্দসই ব্যক্তিদের বসানো হয়। এরপর তাদের হাত ধরেই ধীরে ধীরে স্থানীয় এলাকায় প্রতিপত্তি বিস্তার, স্কুল কমিটি নিয়ন্ত্রণ, অনেক সময় অর্থ নয়-ছয় ও জবরদখলের প্রচেষ্টা চলে। সরকারি বেতনভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী এমনকি উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক ধারণা নেই এমন শিশু শিক্ষার্থীরাও রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে। ফলে দীর্ঘ মেয়াদে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিণত হয় রাজনৈতিক কার্যালয়ে এবং এর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চলে যায় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলোর মাঠপর্যায়ের নেতৃবৃন্দের কাছে। এই সংস্কৃতি বাংলাদেশে অতি-প্রাচীন এবং এর শেকড়ও অনেক গভীরে প্রোথিত। এর থেকে বের হতে না পারলে আমাদের জন্য আগামীতে ভালো কিছু অপেক্ষা করছে না।