ভূকৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর নজর লজিস্টিক খাতে

বন্দরে বিদেশী বিনিয়োগ : কৌশলগত স্থাপনার নিরাপত্তা উপেক্ষিত থাকছে?

Printed Edition

নূরুল মোস্তফা কাজী চট্টগ্রাম ব্যুরো

বাংলাদেশের লজিস্টিক খাতে বিশেষ করে বন্দরসংশ্লিষ্ট স্থাপনা নির্মাণ ও নিয়ন্ত্রণে নিতে বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিযোগিতা দিন দিন বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যের সদ্য সমাপ্ত ঘোষিত যুদ্ধ, হরমুজ প্রণালীর কৌশলগত নৌপথের নিয়ন্ত্রণ সবমিলিয়ে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরকেন্দ্রিক ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর প্রতিযোগিতা এখন দৃশ্যমান। বিগত সময়ে বন্দরসংশ্লিষ্ট বিভিন্নœ অবকাঠামোতে চীন সম্পৃক্ত হতে না পারলেও দেশটি এখন এসবের সাথে সম্পৃক্ত হতে তৎপরতা শুরু করেছে। এমনি পরিস্থিতিতে বিশেষত চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনালগুলো বিদেশীদের হাতে তুলে দেয়ার ক্ষেত্রে বন্দর চ্যানেলকে ঘিরে গড়ে উঠা দেশের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সব কৌশলগত স্থাপনার নিরাপত্তা বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে কি না সে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

বন্দর ব্যবহারকারী একাধিক সূত্র অভিযোগ করেছে পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে বন্দরকেন্দ্রিক বিনিয়োগে প্রতিবেশী দেশের মতামতই প্রাধান্য পেত। সেজন্য তারা নিজেদের সুবিধামতো ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা আদায় করে নিয়েছিল। এর বাইরে বাংলাদেশের বন্দরগুলোর সাথে বাইরের কোন দেশ সম্পৃক্ত হবে তাও ওই দেশের মতের ভিত্তিতেই নির্ধারণ করা হতো বলে সূত্রের দাবি। ফলে বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রবন্দর কক্সবাজারের সোনাদিয়ায় হওয়ার কথা থাকলেও প্রতিবেশী দেশটির ইশারায় প্রকল্পটি সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে যোগ্য বিবেচিত হওয়ার পরও পরিত্যক্ত হয় শুধুমাত্র এর সাথে চীনা সম্পৃক্ততার কারণে। পরে চীন বিরোধী বৃহৎ শক্তিদের বোঝাপড়ায় মাতারবাড়িতে জাপান গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করছে এমন কথা প্রচলিত আছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের লালদিয়ার চরে ডেনিশ প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালকে কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ করে ৩০ বছরের কনসেশন চুক্তির আওতায় পরিচালনার জন্য ইতোমধ্যে চুক্তি সই হয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের পিসিটি (পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল) ও এনসিটি (নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল) মাঝে রয়েছে দেশের প্রধান প্রধান তেল স্থাপনা এবং নৌবাহিনীর ঘাঁটি। পিসিটি আগের পতিত সরকারের আমলে সৌদি অপারেটরের হাতে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এনসিটির পরিচালনাও এতদিন ধরে সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে দেয়ার আয়োজন চলছিল জিটুজি চুক্তির আওতায়। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক টার্মিনাল অপারেটরগুলোর শীর্ষপদে আমাদের প্রতিবেশী দেশের কর্মকর্তাদের প্রাধান্য। তাই এই দুই টার্মিনালের মাধ্যমে প্রকারান্তরে আমাদের কৌশলগত স্থাপনার ওপর প্রতিবেশী দেশটির নজরদারির সুযোগ অবারিত হচ্ছে কি না সে প্রশ্ন সামনে আসছে। তা ছাড়া অর্থনেতিক লাভালাভকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় কৌশলগত স্থাপনার নিরাপত্তাকে খাট করে দেখা হচ্ছে কি না এমন প্রশ্নও উঠছে।

বৃহৎ প্রতিবেশী দেশের হস্তক্ষেপের অভিযোগ

বন্দরসংশ্লিষ্টদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, সরকার পিপিপির (পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ) আওতায় চট্টগ্রাম বন্দরের পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) সৌদি আরবভিত্তিক রেড সী গেটওয়ে টার্মিনাল ইন্টারন্যাশনালকে (আরএসজিটিআই) একটি কনসেশন চুক্তির আওতায় পরিচালনার দায়িত্ব দেয়। ২০২৩ সালের ৬ ডিসেম্বর ইকুইপ-অপারেট অ্যান্ড ট্রান্সফার ভিত্তিতে ২২ বছরের একটি কনসেশন চুক্তির আওতায় পিসিটি পরিচালনা করছে আরএসজিটি বাংলাদেশ। চুক্তির পর ২০২৪ সালের ১০ জুন টার্মিনালটির অপারেশন কার্যক্রম শুরু করে আরএসজিটি বাংলাদেশ। প্রতিষ্ঠানটি সৌদি আরবভিত্তিক হলেও চট্টগ্রাম বন্দরে এই প্রতিষ্ঠান নিয়োজিত হয় অনেক কাটখড় পুড়িয়ে।

বন্দর সূত্র অভিযোগ করে বলেছে, পিসিটির টার্মিনাল অপারেটর নিয়োগে প্রতিবেশী বৃহৎ রাষ্ট্রটির সরাসরি হস্তক্ষেপ ছিল। সূত্র মতে, সৌদি সরকারের মিনিস্ট্রি অব ইনভেস্টমেন্টের সাথে বাংলাদেশ সরকারের জিটুজি চুক্তির ভিত্তিতে পিপিপির আওতায় প্রাইভেট কোম্পানি রেড সী গেটওয়ে টার্মিনালকে (আরএসজিটি) মনোনীত করা হয়। ২০১৯ সালের ৩১ জুলাই আরএসজিটির সাথে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের এমওইউ সই হয়।

জানা গেছে, আরএসজিটির মূল কোম্পানি হলো আরএসপিডি (রেড সী পোর্টস ডেভেলপমেন্ট) কোম্পানি। তাদের ইনভেস্টমেন্ট উইং হলো আরএসজিটি যার ৮০% শেয়ার সৌদি কোম্পানি জেনেল ইন্ডাস্ট্রিজ এবং সৌদি ইন্ডাাস্ট্রিয়াল সার্ভিস কোম্পানির স্টক লিস্টেড। ২০% শেয়ার মালয়েশিয়ান মাইনিং কোম্পানির (এমএমসি) । এমএমসির ওই শেয়ার চায়নার কোম্পানি কসকো উন করত জানিয়ে সূত্র দাবি করেছে এতে আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্রটির পক্ষ হতে আরএসজিটিকে কাজ দিতে মানা করা হয়।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আরএসজিটি নতুন করে লন্ডনভিত্তিক নতুন একটি কোম্পানি গঠন করে যার নাম দেয় আরএসজিটিআই (রেড সী গেটওয়ে টার্মিনাল ইন্টারন্যাশনাল)।

জিটুজি ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি হয় সৌদি সরকারের মিনিস্ট্রি অব ইনভেস্টমেন্টের নমিনেটেড প্রাইভেট কোম্পানি রেড সী গেটওয়ে টার্মিনাল- আরএসজিটির সাথে। কিন্তু পিসিটি পরিচালনার জন্য আরএফপি (রিকুয়েস্ট ফর প্রপোজাল) জমা দেয় আরএসজিটিআই। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে আরএফপি সাবমিটের মাত্র অল্প দিন আগেই কোম্পানিটি লন্ডনে তালিকাভুক্ত হয়।

সূত্র আরো জানায়, আরএসজিটিআই লিড করে আমাদের বৃহৎ প্রতিবেশী দেশের কর্মকর্তারা। তা ছাড়া ২০০৯ সালে আরএসজিটি গঠিত হলেও আরএসজিটিআই গঠিত হয় ২০২২ সালের জুলাইয়ে। আর লন্ডনে তালিকাভুক্ত হয় ২০২৩ সালে। ফলে সে সময় প্রতিষ্ঠানটির টার্মিনাল পরিচালনার অভিজ্ঞতা নিয়েও প্রশ্ন উঠে। জিটুজি ফ্রেম ওয়ার্ক চুক্তির সময় যে প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্বই ছিল না প্রতিবেশী দেশের হস্তক্ষেপে এমন প্রতিষ্ঠানকে টার্মিনাল তুলে দিতে হয়েছে বলে সূত্রের দাবি।

অন্য দিকে চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে সমৃদ্ধ টার্মিনাল নিউমুরিং কনটেনার টার্মিনাল (এনসিটি) নির্মিত হয়েছিল চারদলীয় জোট সরকারের আমলে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া টার্মিনালটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। ইতোমধ্যে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে এই টার্মিনালের পেছনে। সমৃদ্ধ এই টার্মিনালটিও পিপিপির আওতায় এনে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ডকে টার্মিনাল অপারেটর নিয়োগ দিতে পতিত স্বৈরাচারী সরকারের শেষ সময়ে এসে বেশ তোড়জোড় চালানো হয়। কথিত আছে ওই প্রতিষ্ঠানটির সাথে পতিত সরকারের রাঘববোয়ালদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। তা ছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাত ইতোমধ্যে ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ফলে এই টার্মিনালটি প্রকারান্তরে ভারত-ইসরাইলি লবির হাতে চলে যাচ্ছে কি না সে প্রশ্নও সামনে আসছে।

মেরিটাইম সংশ্লিষ্টরা বলছেন- মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক মেরিটাইম সেবা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণ মূলত আমাদের বৃহৎ প্রতিবেশী দেশের কর্মকর্তাদের হাতে। ফলে এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে আগের সরকারের প্রাধিকার তালিকায় ছিল প্রতিবেশী বৃহৎ রাষ্ট্রের স্বার্থ সবার আগে। কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাকে ঘিরে অবস্থান করা দুই টার্মিনালের একটি ইতোমধ্যে বিদেশীদের হাতে দেয়া হয়েছে। কাজেই এনসিটি বিদেশীদের হাতে দেয়ার আগে কৌশলগত স্থাপনার নিরাপত্তা হুমকির বিষয়টি বিবেচনায় গুরুত্বারোপ করেছেন বন্দর ব্যবহারকারীরা।

লজিস্টিক খাতে চীনা আগ্রহ বাড়ছে

২০২৪ এর জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের পর হতে এ দেশের লজিস্টিকস খাতে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর আগ্রহ বাড়তে থাকে। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ-চীন জিটুজি এমওইউর ভিত্তিতে মোংলা বন্দর সুবিধার সম্প্রসারণ ও আধুনিকীকরণের আওতায় কনটেইনার হ্যান্ডলিং সুবিধাসহ ১০ ও ১১ নং বার্থে ৩৬৮ মিটার দৈর্ঘ্য বিশিষ্ট জেটি এবং কনটেইনার হ্যান্ডলিং ইয়ার্ড উন্নয়ন প্রকল্প অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে একনেকে অনুমোদিত হয়।

৪০৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পটি (জিটুজি চায়না) গত বছরে মার্চে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি পাস করে। চীনা কোম্পানি সিসিইসিসি (চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশন) ইতোমধ্যে এই প্রকল্পের ঠিকাদার হিসেবে নিযুক্ত হয়েছে।

এ দিকে চীনা প্রতিষ্ঠান চায়না হার্বার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরে ড্রেজিংয়ের কাজ চায় বলে জানা গেছে। তা ছাড়া ইতঃপূর্বে শ্রীলঙ্কার কলম্বো পোর্ট পরিচালনাকারী চীনা প্রতিষ্ঠান সিএম পোর্ট (চায়না মার্চেন্ট পোর্ট হোল্ডিংস কোম্পানি লিমিটেড) চট্টগ্রাম বন্দরের পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনা এবং বে-টার্মিনালে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। কিন্তু আমাদের বৃহৎ প্রতিবেশী দেশের আপত্তিতে চট্টগ্রাম বন্দরসংশ্লিষ্ট বিনিয়োগ খাত থেকে ছিটকে পড়ে চীন। সূত্র জানায়, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের লজিস্টিকস খাতে নতুন করে সম্পৃক্ত হতে তৎপর হয়েছে। সূত্র মতে, অতিসম্প্রতি চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পের সরকারি অনুমোদন মিলেছে। ওই অর্থনৈতিক অঞ্চলকে ঘিরে শিল্পস্থাপন এবং সেখানে উৎপাদিত পণ্য রফতানির জন্য চট্টগ্রাম বন্দরের সাথে চীন এখন নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত হতে চাওয়াটা খুবই স্বাভাবিক বলেও সূত্র জানায়।

অন্য দেশকে সম্পৃক্ত করতে চায় না জাপান

অন্য দিকে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরের মূল অবকাঠামো নির্মাণ করছে জাইকার সহায়তায় জাপানি প্রতিষ্ঠান পেন্টা ওশান কনস্ট্রাকশন এবং টোয়া করপোরেশন। এই বন্দরের ব্যবহার কেমন হবে তা নিয়ে সংশয় থাকলেও সেখানে অন্য কোনো দেশকে সম্পৃক্ত করতে জাপান নারাজ বলেও সূত্র জানায়।

এ ছাড়া ভারতীয় এক্সিম ব্যাংকের ঋণ সহায়তায় মোংলা বন্দরে ৪০০ মিটার কনটেইনার জেটি নির্মাণে পতিত সরকারের আমলে প্রকল্প নেয়া হয়েছিল। এসব বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর ও মোংলা বন্দরের কোনো কর্মকর্তা কথা বলতে রাজি হননি।