মনিরুল ইসলাম রোহান
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে নজিরবিহীন পতনের পর কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব দেশ ছেড়ে পালিয়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রে নিরাপদ আশ্রয় নেন। দেশের অভ্যন্তরে থাকা নেতাকর্মীরাও অনেকটা আত্মগোপনে ছিলেন। বিগত দুই বছরে হাতেগানা দুয়েকটা ঝটিকা মিছিল ছাড়া তেমন কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করতে না পারলেও গেল শুক্রবার হঠাৎ করে খোদ রাজধানী ঢাকার কূটনৈতিক পাড়ায় বিশাল মিছিল ও শোডাউন দিয়ে ফের আলোচনার সূত্রপাত ঘটিয়েছে দলটি। এটা নিয়ে একদিকে রাজনৈতিক অঙ্গনে যেমন নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে অন্য দিকে সংশ্লিষ্ট মহলে চলছে নানা বিশ্লেষণ।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, দুই বছর পর হঠাৎ করে কেন দৃশ্যপটে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ। তাহলে আগামী ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগ প্রধান ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফেরার যে ঘোষণা দিয়েছেন এটা কি তার রিহার্সেল? নাকি সরকার ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে নির্বাচন পরবর্তী সময়ে নানা ইস্যুতে বিশেষ করে জুলাই সংস্কার ইস্যুকে সামনে রেখে যে দূরত্ব দেখা দিয়েছে তার প্রভাব পড়ছে রাজনীতিতে। ঠিক এই কারণেই কী নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে হঠাৎ করে দৃশ্যপটে আনা হচ্ছে অথবা দৃশ্যপটে চলে আসছে- এমন প্রশ্নও এখন চাউর হয়েছে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ এও বলছেন, জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলের লংমার্চ ঠেকাতে আওয়ামী লীগকে মাঠে নামালো সরকার! যখন জামায়াত লংমার্চের ঘোষণা দেয় তখনই সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে বলা হয়েছিল বিরোধী দল কি আওয়ামী লীগকে মাঠে নামাতে চায়? কৌশলে জামায়াতকে এমন বার্তা দেয়া হয়েছে যাতে জামায়াত সরকারকে সব কাজে বিরোধিতা না করে বরং সহযোগিতা করে। কিন্তু জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দল লংমার্চ সফল করায় এবং ভবিষ্যতে বড় আন্দোলনের হুমকি থাকায় নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিশাল মিছিল ও শোডাউন ঘিরে রাজনীতিতে নতুন জল্পনা কল্পনা শুরু হয়েছে। এর মাধ্যমে সরকারও কৌশলে জামায়াতকে একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশিষ্ট রাজনীতি বিশ্লেষক ড. আবদুল লতিফ মাসুমের কথায়ও সেটার ইঙ্গিত বহন করে। তিনি মনে করেন, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ হঠাৎ করে রাজধানীর একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বিনা বাধায় বিশাল মিছিল ও শোডাউন কর্মসূচি পালন করেছে, এটা এমনি এমনি হয়নি, বিএনপি সরকারও তাদের ইচ্ছের প্রতিফলন ঘটিয়েছে। বিরোধী দলগুলোর সাথে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে বিএনপি এর মাধ্যমে বোঝাতে চাইছে যে তারাই এখানে একমাত্র বড় শক্তি। তাদের ইচ্ছের ওপর অনেক কিছুই নির্ভর করে। সুতরাং বিরোধী দল যখন যেটা চাইবে সেটা হতে দেয়া হবে না। সরকার যদি না চাইতো তাহলে কি বিনা বাধায় এত বড় মিছিল অনুষ্ঠিত হয়?
যদিও রাজধানীতে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী মিছিলকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরবর্তীতে কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছে বলে জানা গেছে। সরকারের পক্ষ থেকেও স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে, আদালতের নির্দেশনা ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগের কোনো ধরনের রাজনৈতিক তৎপরতা বা নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ নেই।
এদিকে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম ও রাজনৈতিক প্রচারণার ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকার মধ্যেই সম্প্রতি দলটির রাজনৈতিক ভাগ্য এবং অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব পুনর্গঠন নিয়ে নতুন করে আলোচনা ও জল্পনা তৈরি হয়েছে। সূত্র বলছে, দীর্ঘ ৪৫ বছর পর আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তনের আভাস পাওয়া গেছে। ভারতে অবস্থানরত ও জুলাই অভ্যুত্থানের মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত দলটির প্রধান শেখ হাসিনা নতুন সম্ভাব্য সভাপতি শেখ সেলিমের নাম প্রকাশ করেছেন বলে গণমাধ্যমে খবর আসে। এই ঘোষণাকে কেন্দ্র করে দলটির অভ্যন্তরীণ মহলে নতুন করে জল্পনা তৈরি হয়েছে এবং নেতৃত্ব নিয়ে ফাটল বা দল দু’ভাগে বিভক্ত হওয়ার গুঞ্জন জোরালো হয়েছে। যদিও নতুন নেতৃত্বের রাজনৈতিক কৌশলগত দরকষাকষি ও শক্তিমত্তার চ্যালেঞ্জ হিসেবে গুলশানের রাস্তায় হঠাৎ করে নেতাকর্মীদের বিশাল মিছিল ও শোডাউন বের করার বিষয়টিও সামনে চলে এসেছে।
এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট রাজনীতি বিশ্লেষক ড. আবদুল লতিফ মাসুম মনে করেন, জুলাই অভ্যুত্থানের স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে আজ বিভাজন তৈরি হয়েছে। যে আশা আকাক্সক্ষা নিয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান হয়েছিল সেটার মূল আকাক্সক্ষা থেকে জাতি অনেক দূরে সরে গেছে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভেদ স্পষ্ট হয়েছে। প্রতিবেশী দেশ ভারততো এই বিভাজন তৈরি করে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে ফের পুনর্বাসর করার জন্য আগে থেকেই তৎপর ছিল। ভারতের এজেন্ডা হিসেবে সেটার কিছুটা বাস্তবায়ন দেখছি। এভাবে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগও শক্তি সঞ্চয় করছে, যাতে ভবিষ্যতে আরো শক্তিমত্তা নিয়ে এখন গুলশানে বড় মিছিল করেছে, ডিসেম্বরকে সামনে রেখে সারা দেশেও আরো বড় মিছিল হয়তো দেখা যাবে।



