ভ্রমণ শুরু হয় অনেক আগেই, যে দিন মানুষের মন ক্লান্ত হয়ে পড়ে, যে দিন ব্যস্ততার ভিড়ে হৃদয় হাঁপিয়ে ওঠে, সে দিনই প্রকৃতি ডাক দেয়। সেই ডাক কখনো পাহাড় হয়ে আসে, কখনো সমুদ্র হয়ে, আবার কখনো নীরব এক শৈবাল-পাথরের ভাষায়। আমাদের এই ভ্রমণটিও শুরু হয়েছিল ঠিক এমনই এক ডাকে।
কক্সবাজারের লাবণী পয়েন্টে অবস্থিত হোটেল সোহান রিসোর্টে সেই সকালটা ছিল শান্ত, সংযত আর গভীর। জানালার বাইরে সমুদ্রের ঢেউ ধীরে ধীরে তীরে এসে ফিরছিল ঠিক যেন সময় নিজেই একটু থেমে আছে। নরম বাতাসে লবণের গন্ধ, আকাশে হালকা রোদের ছোঁয়া সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল, আল্লাহ আজ আমাদের জন্য এক বিশেষ দিন সাজিয়ে রেখেছেন।
আমি, আব্দুস সাত্তার সুমন, নাশতার টেবিলে বসে স্ত্রী সাহারা নাসরিন, ছেলে সাইয়েদুল ইসলাম আর মেয়ে সুবাহ মুনির দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম পরিবার নিয়ে এক সাথে বের হওয়া আসলে দুনিয়ার এক বড় নিয়ামত। ইসলাম আমাদের শেখায়, পরিবারে সময় দেয়া ইবাদতের অংশ। আজকের এই সফরও তাই শুধু ভ্রমণ নয়, শোকরের এক রূপ।
নাশতা শেষে রওনা হলাম পশ্চিম লালপাড়া কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল অভিমুখে। শহরের কোলাহল, গাড়ির শব্দ, মানুষের ভিড় সব পেছনে পড়ে যেতে লাগল। মনে হচ্ছিল, আমরা ধীরে ধীরে কংক্রিটের শহর ছেড়ে আল্লাহর খোলা কিতাবের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। তারপর গেলাম আমার প্রিয় বন্ধু অপু আর তার স্ত্রী সানামুর বাসায়।
সিটি স্কুলের সামনে সেই ফ্ল্যাটে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র রেখে যখন বের হলাম, তখন মনটা আরো হালকা হয়ে গেল। সফরে সঙ্গী ও আশ্রয় থাকা সুন্নতের অংশ- এ কথা মনে পড়ে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা আরো বেড়ে গেল।
পাহাড় ও সমুদ্রের মাঝখানে আঁকা এক চলমান শিক্ষা: কলাতলী থেকে সিএনজি করে যাত্রা শুরু হতেই প্রকৃতি যেন কথা বলা শুরু করল। ডান পাশে হিমছড়ির পাহাড় ও ঝর্ণা স্থির, দৃঢ়, নির্ভরযোগ্য। মনে হলো, পাহাড় আমাদের শেখাচ্ছে ধৈর্য আর দৃঢ়তার মানে। বাম পাশে মেরিন ড্রাইভের নীল সমুদ্র অসীম, চলমান, রহস্যময়। ঢেউ আসে, আবার ফিরে যায় জীবনের মতোই। পথে একে একে চোখে পড়ে পাটুয়ারটেক বিচ। পেচারদ্বীপের উপকূল। জালিয়াপালংয়ের পাহাড়ি জনপদ। পাহাড়ের গায়ে লেগে থাকা ছোট দোকান আর ঝুপড়ি ঘর। দূরে সোনাদিয়া চ্যানেলের জলরেখা। জেলেদের নৌকা রিজিকের সন্ধানে ছুটে চলা জীবন। সাইয়েদুল ইসলাম জানালার বাইরে তাকিয়ে হঠাৎ প্রশ্ন করল, আব্বু, এত পাহাড় আর সমুদ্র আল্লাহ কেন বানিয়েছেন? আমি বললাম, যাতে মানুষ বুঝতে পারে এই দুনিয়া তার নয়, সে শুধু একজন মুসাফির। এই কথাটাই ছিল আজকের ভ্রমণের মূল শিক্ষা।
ইনানী বিচ যেখানে পাথরও কথা বলে: ইনানী বিচে পৌঁছে প্রথম যে জিনিসটা চোখে পড়ল, তা শুধু সমুদ্র নয় শৈবাল-ঢাকা কালো পাথর। এই পাথরগুলো ইনানীর আলাদা পরিচয়। শক্ত পাথরের গায়ে লেগে আছে নরম সবুজ শৈবাল। কোথাও গাঢ় সবুজ, কোথাও হালকা ঢেউ এলে শৈবাল ভিজে ওঠে, পানি সরে গেলে রোদে ঝিলমিল করে। মনে হচ্ছিল, পাথরের বুকেই কেউ সবুজ রঙে নীরব জিকির লিখে রেখেছে। সুবাহ মনি অবাক হয়ে বলল, আব্বু, পাথরের গায়ে গাছ জন্মায় কিভাবে?
আমি বললাম, আল্লাহ চাইলে শক্ত পাথরেও জীবন দেন। তাই মানুষের হৃদয় কখনোই আশা হারাতে নেই। শৈবাল-পাথরের ওপর হাঁটতে গিয়ে সাইয়েদুল ইসলাম সাবধানে পা ফেলছিল। আমি তাকে বললাম, দেখো বাবা, পথ যত সুন্দরই হোক, সাবধানতা না থাকলে পড়ে যেতে হয়। এই শৈবাল-পাথর আমাদের শিখিয়ে দিলো সৌন্দর্যের সাথে সতর্কতাও জরুরি। পাথরের ফাঁকে ফাঁকে জমে থাকা পানিতে আকাশের রঙ ভেঙে পড়ছে। ঢেউ এসে সেই পানিতে আঘাত করে আবার ফিরে যাচ্ছে। মনে হচ্ছিল সমুদ্র নিজেই পাথরকে সালাম জানাচ্ছে।
নৌকা, ঘোড়া আর জীবনের ভারসাম্য: ইনানীতে আমরা দেখলাম নৌকা ভ্রমণ। নৌকা যখন ঢেউ কেটে এগিয়ে যায়, তখন বোঝা যায় ভারসাম্য না থাকলে সামনে এগোনো যায় না। জীবনও ঠিক তেমন। জেলেদের জাল ফেলা দেখিয়ে আমি সন্তানদের বললাম, রিজিক মানুষ ধরে না, আল্লাহ দেন। মানুষ শুধু চেষ্টা করে। এক সময় সাহারা নাসরিন ঘোড়ায় চড়লেন। সমুদ্রতটে ঘোড়ার ছুট বাতাসে উড়ে যাওয়া ওড়না, চোখে সাহসের আলো। এই দৃশ্য দেখে বুঝলাম ভ্রমণ মানুষকে ভেতর থেকে শক্ত করে। ইসলাম নারীকে সৌন্দর্য থেকে বঞ্চিত করেনি, বরং শালীনতার সাথে দুনিয়া দেখার অধিকার দিয়েছে। ভ্রমণ থেকে পাওয়া ঈমানি শিক্ষা: ইনানী বিচ আমাদের পরিবারকে শিখিয়ে দিলো, প্রকৃতি আল্লাহর আমানত। নীরবতাও ইবাদত হতে পারে। পরিবার নিয়ে সময় কাটানো সদকা। শিশুদের শিক্ষা শুরু হয় চোখ দিয়ে। শক্ত পাথরেও জীবন জন্মাতে পারে। ভ্রমণ মানে শুধু ছবি তোলা নয়, ভ্রমণ মানে হৃদয়ে কিছু কথা লিখে নেয়া।
ফেরার পথে সুগন্ধি বিচে দিনের শেষ প্রার্থনা: ফিরে আসার পথে আমরা থামলাম কক্সবাজার সুগন্ধি বিচে। সূর্য তখন ডুবে যাচ্ছে। আকাশে লাল আর কমলার মিশেল। বালুর ওপর পায়ের ছাপ রেখে কিছুক্ষণ চুপচাপ হাঁটলাম। মনে হচ্ছিল আজকের দিনটা আমাদের জন্য আল্লাহর একটি উপহার। রাতে ফিরে এলাম বন্ধুর বাসায়। অপু আর সানামের আন্তরিক আতিথেয়তায় ক্লান্তি মিলিয়ে গেল। ঘুমোবার আগে চোখ বন্ধ করতেই ভেসে উঠল শৈবাল-ঢাকা পাথর, ঢেউয়ের শব্দ, পাহাড়ের নীরবতা। কিছু জায়গা থাকে, যেখান থেকে ফিরে এসে মানুষ বদলে যায়। ইনানী বিচ তেমনই এক জায়গা। তাই মন গভীর থেকে বলে আবারো ঘুরে আসি ইনানী বিচে।



