১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপির জয়লাভের পর পরাজিত আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা করেছিলেন ‘এক দিনও সরকারকে স্বস্তিতে থাকতে দেবেন না।’ ১৭৩ দিন হরতাল কর্মসূচি পালন করেছিলেন শেখ হাসিনা। ২০২৬ সালে রাজনৈতিক সংস্কৃতির এ ধারা পাল্টে দিলেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও জামায়াতের আমির নির্বাচনী ফলাফল মেনে নিয়েছেন এবং এর বিরুদ্ধে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘোষণা করেননি। নির্বাচনে জয়লাভের পর বিএনপির চেয়ারম্যান, জামায়াতের আমির ও এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলামের সাথে দেখা করেছেন। এখন শ্যাডো গভর্নমেন্ট বা শ্যাডো ক্যাবিনেট গঠন করা হলে দেশের রাজনৈতিক ধারা ও সংস্কৃতি পুরোপুরি পাল্টে যেতে পারে বলে বলছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। ব্রিটেনের আদলে জামায়াত ও এনসিপি ছায়া সরকার গঠন করে সরকারের সব কাজ নখদর্পণে রাখার উদ্যোগ নিচ্ছে। জামায়াত নেতা ব্যারিস্টার শিশির মনির, ব্যারিস্টার আরমান ও এনসিপি নেতা মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া পৃথক ফেসবুক পোস্টে ছায়ামন্ত্রিসভা গঠনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। ব্রিটেনে শ্যাডো মিনিস্টার হিসেবে বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত নারী রুশনারা আলী দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। বিএনপির নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য শেখ রবিউল আলম রবি ছায়া সরকারের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে অভিহিত করেছেন। আইন সভা নিশ্চয়ই জন-আকাক্সক্ষাকে ধারণ করে সরকারকে ফাংশন করাতে সফল হবে।
ছায়া সরকার কী : ছায়া সরকার বা ছায়া মন্ত্রিসভা বলা হয় জাতীয় সংসদের পাশাপাশি আরেকটি ছায়া সংসদ ব্যবস্থাপনাকে। বিরোধীদলীয় নেতা, বিশেষজ্ঞ মহলের সমন্বয়ে এ ধরনের সংসদ জাতীয় সংসদের সমান্তরালে ছায়া সরকারের সরকারি ও বিরোধীদলীয় সদস্যরা বিকল্প রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত উপস্থাপন করেন। জাতীয় সংসদ তা আমলে নিলে শুধু বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা যেমন হ্রাস পায় তেমনি বিকল্প রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের একটি গতিধারার সৃষ্টি হয়। এর ফলে আলোচনা ও মেধার ব্যবহারের মধ্যে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, কোনো হরতাল, সংঘর্ষ বা বিধ্বংসী রাজনৈতিক কর্মসূচির প্রয়োজন পড়ে না এবং রাজনৈতিক হতাহতের ঘটনা এড়ানো যায়। সরকারি ও বেসরকারি বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন খাতভিত্তিক উন্নয়ন ও কর্মসূচির বিকল্প ধারা উপস্থাপন করেন বলে এক্ষেত্রে তর্কবিতর্কের মধ্য দিয়ে গঠনমূলক সেরা সিদ্ধান্তই নেয়া সম্ভব হয়। একই সাথে বাইরের দেশের রাজনৈতিক প্রভাব মোকাবেলা করে বিভাজনমূলক রাজনীতি সহসাই এড়িয়ে যাওয়া যায়। একই সাথে সরকারি ও বিরোধী দলে কখনো বিকল্প নেতৃত্বের ঘাটতি পড়ে না। বাইরের দেশগুলোর দেশবিরোধী ও অসম চুক্তি সহজেই এড়ানো যায়।
বিশেষজ্ঞ অভিমত : সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য ব্যারিস্টার ইমরান সিদ্দিকী ব্রিটেনের আদলে ছায়া সরকারের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, অবশ্যই এটি সময়ের দাবি। যদি বিরোধী দলগুলো একটি শ্যাডো ক্যাবিনেট গঠন করে, তবে এটি সরকারের সিদ্ধান্তগুলো ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে একটি তদারককারী (ওয়াচডগ) হিসেবে কাজ করবে। এর ফলে শাসনব্যবস্থায় অধিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে। শ্যাডো ক্যাবিনেটের উপস্থিতি সংসদে আরো ফলপ্রসূ বিতর্কের সৃষ্টি করবে এবং সংসদীয় গণতন্ত্রকে আরো শক্তিশালী করবে।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার আবু হেনা রাজ্জাকী বলেন যারা মনে প্রাণে শক্তিশালী গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে, চেক অ্যান্ড ব্যালান্সের জন্য বিরোধী দলে যারা শীর্ষ নেতা থাকেন তাদের সমন্বয়ে ছায়া সরকার গঠিত হয়। এটা মোটামুটি প্যারালাল গভর্নমেন্টের মতো। অব্যাহতভাবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়েরও ওপর নজরদারি ও বিকল্প উপস্থাপনা দিয়ে থাকে ছায়া সরকার। এটা হলে রাজনৈতিক ধারা অবশ্যই পরিবর্তন হবে। চেক অ্যান্ড ব্যালান্স কঠিনভাবে হবে যদি সিনসিয়ারলি এটা কাজ করে। আজকে যারা বিরোধী দলে তারা সবাই যোগ্য ও বিচক্ষণ। মূলত ইংল্যান্ড থেকেই ছায়া সরকারের ধারণাটা আসছে, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতেও শ্যাডো গভর্নমেন্ট কার্যকর। শ্যাডো গভর্নমেন্ট হয়ে যদি দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েন তো ভিন্ন কথা। যদি রাষ্ট্রকে মেরামত করতে চাই তাহলে শ্যাডো গভর্নমেন্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে এবং এটা থাকা জরুরি।
জামায়াত নেতা ব্যারিস্টার শিশির মনির বলেন, যারা ক্ষমতায় যান না কিন্তু ক্ষমতার কাছাকাছি থাকেন তাদেরও দায়িত্ব আছে। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পশ্চিমাদেশে এ ধরনের ছায়া সরকার কাজ করে। ভোটাররা উভয় জোটের ওপর আস্থা রেখেছে এবং তাদের আশা আকাক্সক্ষা আছে। যারা সরকারে যেতে পারে নাই তাদের ভূমিকা কনস্ট্রাকটিভ হওয়া প্রয়োজন। এ ভূমিকা কেমন হবে তা একে একে আপনাদের সামনে প্রকাশ করব। বিভিন্ন মিনিস্ট্রির ছায়া কেমন হবে তা বলব। সুস্থ রাজনৈতিক চর্চা ও পরিবর্তন দরকার। নেতৃত্বে, কথা, চিন্তা, মননে, প্রজ্ঞায় এ পরিবর্তনের প্রকাশ ছায়া সরকারে উঠে আসবে। ম্যাচিউর ডেমোক্র্যাসিতে যে দল ক্ষমতায় যায় শুধুমাত্র তারাই দেশ চালাবেন ব্যাপারটা এমন নয়। তাদেরকে গঠনমূলক সহায়তার পাশাপাশি ক্রিটিসিজম করা, ভালো কাজে সহায়তার পাশাপাশি সরকারকে ভালো কাজ না করলে কড়া একাডেমিক সমালোচনার সম্মুখীন হতে হবে। ওয়াচডগ টিম প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের কাজ পর্যবেক্ষণ করবে। যা ইচ্ছা তাই করলে, আইন ভায়োলেট করলে তাদের বিরুদ্ধে সংসদে ও সংসদের বাইরে গঠনমূলক সমালোচনা নিয়ে হাজির হবো। এটার নামই ছায়ামন্ত্রিসভা।
কার্যত ছায়াসরকার জোর করে সরকারকে ঠিক পথে রাখতে বাধ্য করে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে যেকোনো আইন পাস করা বা সরকারের প্রস্তাব মাত্রই বিরোধিতা করে সংসদে হট্টগোল তৈরির মধ্যে ছায়াসরকার ভারসাম্য তৈরি করে। সংসদ থেকে কোনো আইনি প্রস্তাব বয়কট বা রাজপথে রাজনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হ্রাস পায়। বরং সংসদে সরকারের দেয়া প্রস্তাবের পাল্টা প্রস্তাব নিয়ে শ্যাডো পার্লামেন্টে বিতর্ক করলে রাজপথে অবরোধ, ভাঙচুর, জনগণের জানমালের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো যায়। নির্বাচনের পরেই বিরোধী দলের ভূমিকা আরো কার্যকর হয়ে ওঠে। সরকারের পলিসি নিয়ে স্টাডি করে তাকে ভালো ব্যবস্থাপনাকে গ্রহণে বাধ্য করা। সরকারকে ভালো হয়ে যেতে বাধ্য করে কারণ মন্ত্রীরা জানে তাদের প্রতিটি কাজ মনিটর করা হচ্ছে। তখন তিনিও বাধ্য হন স্টাডি করে ভালো একটা প্রস্তাব সংসদে উপস্থাপন করতে। দ্বিতীয়ত বিরোধী দলকে বাধ্য করে দেশ পরিচালনায় অংশ নিতে। সরকারকে ফেলে দেয়ার একমাত্র চিন্তা থেকে তারা আরো ভালো পরিকল্পনা করে জনগণের সামনে উপস্থাপন করে।
মূল্যায়ন ও প্রমাণের ভিত্তিতে তারা ভালো পরিকল্পনা উপস্থাপন করে বলে নেগেটিভ ন্যারেটিভ বা ভুল বয়ান তৈরি করতে ব্যর্থ হয় স্বার্থান্বেষী মহল। এর ফলে দেশে এক ধরনের স্থিতিশীলতা তৈরি হয় বলে জনগণকে বিকল্প খুঁজ করতে হয় না। সরকার পড়ে গেলেও বিকল্প যোগ্যতার ছায়া সরকারের ভালো প্রস্তাব তাদের নাগালেই থাকে। কার্যকর সংসদ গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রমাণসহ বিতর্কের একটা ধারা সৃষ্টি হয়। ব্যক্তিগত গুরুত্বের চেয়ে পলিসির গুরুত্ব বড় হয়ে দাঁড়ায়। গণতন্ত্র যেমন ওয়ানম্যান শো না বা বিরোধী দল মানেই সরকার ফেলে দেয়া নয়। শুধু ক্ষমতাসীন হয়ে গদিতে বসে পড়ার পরিবর্তে জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত হয় রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে। ছায়া সরকারের কোনো নির্বাহী ক্ষমতা না থাকলেও রাষ্ট্রপরিচালনায় বিরোধী দলকে প্রস্তুত রাখে।
জুলাই আন্দোলনের পরিবর্তনের ছোঁয়া রাজনীতিতে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের জন্য নতুন ফ্ল্যাট তৈরির কথা বলা হলেও জামায়াতের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। ব্যারিস্টার শিশির মুনির বলেছেন, ওয়াদা অনুযায়ী কোনো জামায়াত সংসদ সদস্য ট্যাক্স ফ্রি গাড়ি ও সরকারি প্লট নেবেন না। বিএনপির পক্ষ থেকে একই বার্তা দেয়া হয়েছে। এনসিপি সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেছেন আগামী পাঁচ বছর তার নির্বাচনী এলাকায় কোনো আত্মীয়স্বজন নাই। যারা তাকে ভোট দিয়েছেন তারাই তার স্বজন। হাসিনা সরকারের আমলে ২৮ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছিল। তার পতনের সময় রিজার্ভ ছিল ১২ বিলিয়ন ডলার। অন্তর্বর্তী সরকার ২৯ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ ও ছয় মাসের খাদ্য মজুদ রেখে যাচ্ছেন। পরিবর্তনের এই ধারা আরো দৃশ্যমান করতে কিছু আইন প্রণয়ন জরুরি। ব্যারিস্টার আবু হেনা রাজ্জাকী এ প্রসঙ্গে বলেন, দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া মাত্রই সংসদ সদস্য ও সরকারি কর্মকর্তাদের বরখাস্ত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে পারলে হাওয়া উল্টোদিকে বইতে শুরু করবে। সংসদের ভেতরে ও বাইরে তুমুল বিতর্কের মধ্যে দিয়ে সৃষ্টিশীল নেতৃত্ব গড়ে তোলার জন্যই ছায়া সরকার গঠনের দৃঢ় অঙ্গীকার করেছেন ব্যারিস্টার শিশির মনির। এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের প্রস্তুতি নেয়ার কথা জানিয়ে বলেছেন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত এবং সার্বিক কার্যক্রমে ওয়াচডগ হিসেবে কাজ করবে মন্ত্রিসভা।



