আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মোবাইলে লেনদেনের সীমা অর্ধেকে নামিয়ে আনার সুপারিশ করেছে সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থা। নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং বিশ্বাসযোগ্যভাবে পরিচালনার ক্ষেত্রে এমএফএস (মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস) সেবার সম্ভাব্য অপব্যবহার সংক্রান্ত বিশেষ প্রতিবেদনে এই সুপারিশ করা হয়। গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে প্রতিবেদন আসার পর এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের ব্যবস্থা নিতে চিঠি দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস-এর অপব্যবহার প্রতিরোধ করা নির্বাচন কমিশনের জন্য অন্যতম চ্যালেঞ্জ। ভোটারদের বেআইনি প্রলোভনে ফেলা, প্রচারণা ব্যয়ের সীমা লঙ্ঘন এবং নির্বাচনে আর্থিক অপরাধ গোপন করার জন্য গঋঝ এর অপব্যবহার বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিশেষ ঝুঁকি তৈরি করেছে। গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ, ১৯৭২ (সংশোধিত ২০২৫) অনুসারে এজেন্ট ছাড়া একাধিক ব্যক্তির মাধ্যমে নগদ অর্থ পরিবহন করা ঝুঁকিপূর্ণ এবং আইনবহির্ভূত হওয়ায় প্রার্থীরা ভোটারদের প্রভাবিত করতে বিকল্প মাধ্যম হিসেবে এমএফএস সেবাকে ব্যবহার করে অর্থের অস্বচ্ছ প্রবাহ ঘটাতে পারে। নির্বাচনকালে এমএফএস সেবার অপব্যবহার প্রতিরোধ করতে না পারলে নির্বাচনের স্বচ্ছতা, সমতা ও ন্যায্যতা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
মধ্যম ঝুঁকি উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, এজেন্ট হিসাবগুলোর ক্ষেত্রে লেনদেনের কোনোরূপ সীমা না থাকায় প্রার্থীরা তাদের পরিচিত এজেন্টদের ব্যবহার করে টার্গেটেড ভোটারদের চাহিদা অনুসারে অর্থ প্রেরণ করে নিজেদের পক্ষে প্রভাবিত করার সুযোগ রয়েছে। অর্থ বিতরণের কৌশল হিসেবে দলীয় কর্মীদের মাধ্যমে টার্গেটেড ভোটারদের এমএফএস হিসাব সংগ্রহপূর্বক এজেন্ট কর্তৃক (ক্যাশ-ইন) বিতরণ করতে পারে এবং ব্যক্তিগত এমএফএস হিসাব হতে ফান্ড ট্রান্সফার (সেন্ড মানি) করে অবৈধ অর্থ বিতরণ করতে পারে।
নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর দিন ২২ জানুয়ারি হতে নির্বাচনের দিন পর্যন্ত এমএফএসের সব ধরনের হিসাবের লেনদেনের পরিমাণের ঊর্ধ্বসীমা অর্ধেকে নামিয়ে আনার পাশাপাশি যথাযথ মনিটরিং ব্যবস্থা না করলে এমএফএস সেবার অপব্যবহারের মাধ্যমে ভোটারদের প্রভাবিত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। নির্বাচনে কালো টাকা ও অঘোষিত অর্থ এমএফএস সেবার অবৈধ ব্যবহারের মাধ্যমে দ্রুত বিতরণ করে নির্বাচনের লেভেল প্লেইং ফিল্ড নষ্ট করার সম্ভাবনা রয়েছে। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং এমএফএস নিয়ন্ত্রক সংস্থা তথা কেন্দ্রীয় ব্যাংক যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ না করলে কালো টাকা ও অঘোষিত তহবিল ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে এবং জনগণের প্রকৃত মতামতের প্রতিফলন বাধাগ্রস্ত হবে।
নির্বাচনে মোবাইলের মাধ্যমে অবৈধ লেনদেন বন্ধ করতে ৯টি সুপারিশ করে গোয়েন্দা সংস্থাটি।
তাদের সুপারিশগুলো হলো- নির্বাচনকালীন কোনো প্রার্থী কর্তৃক এমএফএস সেবার অপব্যবহার করে অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার রোধে বড় অঙ্কের লেনদেন, একই ধরনের লেনদেনের পুনরাবৃত্তি ও সন্দেহজনক অস্বাভাবিক লেনদেন পর্যবেক্ষণপূর্বক শনাক্তকরণ এবং যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্বাচন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে একটি বিশেষ টিম গঠন করা; আসন্ন নির্বাচনে এমএফএস সেবার অপব্যবহার রোধকল্পে তাৎক্ষণিক প্রতিরোধ এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে মোবাইল কোর্টের সংখ্যা বৃদ্ধি করা এবং নির্বাচনকালীন এমএফএস এজেন্ট ও মার্চেন্টধারী প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত নিরীক্ষণ করা। সন্দেহজনক অস্বাভাবিক লেনদেন পরিলক্ষিত হলে সন্দেহজনক হিসাবগুলো দ্রুততম সময়ে ফ্রিজ করা (যাতে টাকা উত্তোলন করতে না পারে); নির্বাচনের দিন পর্যন্ত এমএফএসের সব ধরনের হিসাবের লেনদেনের পরিমাণের ঊর্ধ্বসীমা অর্ধেকে নামিয়ে আনা; নির্বাচনকালীন এমএফএস ভিত্তিক অবৈধ অর্থ প্রবাহ রোধে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এজেন্টগুলোকে তাদের দৈনন্দিন লেনদেনের হিসাবের খাতার একটি কপি বাধ্যতামূলকভাবে এলাকাভিত্তিক নির্বাচন পর্যবেক্ষণ অফিসে প্রেরণে বাধ্য করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা: এমএফএস সেবা ব্যবহার করে ভোট ক্রয়-বিক্রয়ের সাথে জড়িতদের গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ, ১৯৭২ (সংশোধিত ২০২৫) এর অধীনে বিচার নিশ্চিত করা; মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের অপব্যবহার প্রতিরোধে মাঠ প্রশাসনের জন্য চেকলিস্ট বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা; নির্বাচনকালীন অবৈধ অর্থ লেনদেন (এমএফএস সেবা ব্যবহার করে) সংক্রান্ত অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তিসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য একটি সার্বক্ষণিক অভিযোগ সেল গঠন করা; নির্বাচনকালীন কোনো এমএফএস কোম্পানি তথ্য প্রদানসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে অসহযোগিতা করলে নিবন্ধন বাতিলসহ ফৌজদারি ব্যবস্থা গ্রহণ করা।



