নয়া দিগন্ত ডেস্ক
চলমান গ্যাস সঙ্কট নিরসনে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের কাছে সহযোগিতা চেয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
মঙ্গলবার দুপুরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সাথে ফোনালাপে এ সহযোগিতা চান তিনি। পরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী তার দেশের সংশ্লিষ্টদের সাথে আলোচনা করে গ্যাস সঙ্কট নিরসনে সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে নিজ দফতরে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে এ তথ্য জানান বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘হতে পারে এফএসআরইউ (ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল) বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত একটি স্থাপনা বা কাঠামো, যার মাধ্যমে আমরা আমদানিকৃত এলএনজিকে রিগ্যাসিফাই করছি; কিন্তু এটা তো জনগণের সরকার। জনগণ ভোট দিয়ে আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছেন। আমরা এই দায়িত্বটা অনুভব করি, জনগণের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা রয়েছে বলেই আমরা প্রাণান্ত করার চেষ্টা করছি এ সমস্যার সমাধানে।’
তিনি বলেন, ‘সমস্যার গুরুত্ব অনুভব করে প্রধানমন্ত্রী গতকাল (সোমবার) মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমকে একটি পত্র লেখেন, যেটি আজকে আমাদের শিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন (মালয়েশিয়া সফরে আছেন) হস্তান্তর করেছেন কুয়ালালামপুরে।’
অনিন্দ্য ইসলাম বলেন, ‘আজকে (মঙ্গলবার) বাংলাদেশ সময় দুপুর ২টায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সাথে ফোনে কথা বলেছেন। বাংলাদেশের এই উদ্ভূত জ্বালানি সঙ্কট মোকাবেলায় তার এবং তার দেশের সহযোগিতা কামনা করেছেন।
আনোয়ার ইব্রাহিম প্রধানমন্ত্রীকে আশ্বস্ত করেছেন, তার তরফ থেকে এবং তার দেশের তরফ থেকে- এ সঙ্কট নিরসনে যা কিছু করার সুযোগ রয়েছে, তিনি দ্রুততম সময়ের মধ্যে তার টিমের সাথে কথা বলবেন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সাথে কথা বলে প্রধানমন্ত্রীকে (তারেক রহমান) অবহিত করবেন।’
তিনি বলেন, ‘তারা দ্রুত ফিডব্যাক দিবেন, যাতে করে বাংলাদেশের মানুষের কষ্ট লাঘবে মালয়েশিয়া এবং মালয়েশিয়া সরকার পাশে থাকতে পারে।’
‘এই বার্তাটি দেয়ার প্রয়োজনীয়তা আমি এই কারণে অনুভব করছি যে, মানুষের এই সমস্যা, মানুষের এই কষ্টটা প্রতি মুহূর্তে আমাদেরকে কষ্ট দিচ্ছে এবং বাংলাদেশের মানুষের এই কষ্টে আমরাও সমব্যথী। আমরা ক্ষেত্রবিশেষে আমাদের কথা, আমাদের কষ্ট আরো বেশি কারণ জনগণ আসলে আমাদের দায়িত্ব দিয়েছে তাদের কষ্ট নিরসনের জন্য।’
সঙ্কট সমাধানে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় দিনরাত কাজ করছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘জ্বালানি বিভাগের অন্যান্য সংগঠন পেট্রোবাংলা, আরপিজিসিএল যেমন দিনরাত কাজ কাজ করছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও প্রতি মুহূর্তে ঘটনা সম্পর্কে আমাদের সাথে যোগাযোগ রাখছেন এবং তার তরফ থেকে, তার পক্ষ থেকে যদি কিছু করার থাকে সেই ব্যাপারে চেষ্টা করছেন।’
তিনি বলেন, ‘চাহিদা অনুযায়ী কিন্তু গ্যাস সরবরাহ করতে পারছি না। তাহলে চাহিদা এবং সরবরাহের মধ্যে যে গ্যাপটুকু রয়েছে, সে গ্যাপটা মিনিমাইজ করার জন্য প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সহায়তা কামনা করেছেন।’
এক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘মালয়েশিয়া থেকে আমরা এলএনজি আমদানির সুযোগ নিয়ে কাজ করছি। এটা তো একটা প্রক্রিয়ার ব্যাপার। এই প্রক্রিয়া কত দ্রুততম সময়ের মধ্যে আমরা সম্পন্ন করতে পারি, এ ছাড়াও বিকল্প কোনো পন্থা আছে কি না যেখানে তাদের অভিজ্ঞতা দিয়ে তারা আমাদেরকে সহায়তা করতে পারে, তাদের পরামর্শ দিয়ে আমাদেরকে সহায়তা করতে পারে কিংবা তাদের রিসোর্সেস আমাদের সাথে শেয়ার করতে পারে, সবকিছুই হতে পারে।’
জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, ‘বিভিন্ন উৎস থেকে আমরা সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছি। বিকল্প উৎসগুলো এক্সপ্লোর করার জন্য। হাতে যখন অনেকগুলো অপশনস থাকবে, তাহলে কখনো যদি কোনো একটি বিকল্প ফেইল করে, আপনি কোনোভাবে সেটাকে সমাধান করতে পারেন। আমাদের হাতে খুব বেশি বিকল্প নেই বলেই তো আজকে একটা এফএসআরইউ সমস্যার কারণে আমরা সবাই মিলে ভুগছি।’
তিনি বলেন, ‘সো বিকল্প এই যে আমি এখন যে আসলাম, এখানে কিন্তু জাপানিজ একটা টিম অর্থাৎ জাপানিজ প্রধানমন্ত্রীর অ্যাডভাইজার ভিজিট করলেন। থোরোলি আমরা ডিসকাস করলাম কিভাবে এনার্জি কো-অপারেশন আমরা বাড়াতে পারি। আমরা কালকে বলেছিলাম যে, এফএসআরইউ নিয়ে আমরা কাজ করছি; কিন্তু আলটিমেট সলিউশন হচ্ছে ল্যান্ড-বেসড এলএনজি টার্মিনাল। আমরা সেখানে তাদের সহযোগিতা চেয়েছি।’
একটি এফএসআরইউতে (ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল) যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়ায় বর্তমানে দেশে গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের সঙ্কট তৈরি হয়েছে। এর ফলে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট (৪৫ কোটি ঘনফুট) গ্যাস কম সরবরাহ হচ্ছে, যা মোট সরবরাহের প্রায় ১৭ শতাংশ। এতে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সিএনজি স্টেশন এবং আবাসিক গ্রাহকরা ভোগান্তিতে পড়েছেন।
স্বাস্থ্যসেবায় আধুনিক প্রযুক্তির বিকাশে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে
স্বাস্থ্যসেবায় আধুনিক প্রযুক্তির বিকাশে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, দেশীয় প্রযুক্তির ভেন্টিলেটর ও হাই-ফ্লো অক্সিজেন মেশিন প্রস্তুত ও বাজারজাতকরণসহ এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, মান যাচাই এবং উৎপাদনের ক্ষেত্রে সরকার সহযোগিতা দেবে। গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এক সভায় এই সহযোগিতার আশ্বাস দেয়া হয় বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপ প্রেস সচিব হাসান শিপলু।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের দুইটি বিশেষজ্ঞ দল দেশীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে জীবনরক্ষাকারী যান্ত্রিক শ্বাসযন্ত্র ভেন্টিলেটর ও হাই-ফ্লো অক্সিজেন মেশিন তৈরি করছে। এই সংক্রান্ত বৈঠকে মেশিন দুইটির কার্যকারিতা ও সম্ভাবনা প্রধানমন্ত্রীর সামনে উপস্থাপন করা হয়। তিনি বিশেষজ্ঞ দলের প্রশংসা করে মেশিনগুলো ব্যবহার উপযোগী ও বাজারজাত করণে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
বৈঠকে জানানো হয়েছে, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে এগুলো দেশী হাসপাতালে ব্যবহারের পাশাপাশি রফতানির সম্ভাবনা রয়েছে। দেশীয়ভাবে উৎপাদিত হওয়ায় যন্ত্র দু’টি তুলনামূলক কম খরচে বাজারজাত করা সম্ভব হবে যা স্বাস্থ্যসেবাকে আরো সাশ্রয়ী করে তুলবে।
মেশিন দুইটির উপযোগিতা তুলে ধরে বিশেষজ্ঞরা জানান, ভেন্টিলেটর মেশিনটি গুরুতর শ্বাসতন্ত্রের সমস্যায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা সরঞ্জাম। এ কারণে এর নিরাপত্তা, কার্যকারিতা ও আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে আরো বিস্তৃত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে। অন্য দিকে হাই-ফ্লো অক্সিজেন মেশিনটি শ্বাসতন্ত্রের সাধারণ সমস্যাজনিত রোগীদের জন্য ব্যবহার উপযোগী। এটি বৈদ্যুতিক সংযোগ ছাড়াই ব্যবহার করা যায়। ফলে বিদ্যুৎ-সুবিধাবঞ্চিত এলাকা কিংবা জরুরি পরিস্থিতিতে রোগী পরিবহনের সময় অ্যাম্বুলেন্সেও এটি ব্যবহার করা যাবে।
বৈঠকে সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি এই দু’টি চিকিৎসাযন্ত্র সফলভাবে উৎপাদন ও ব্যবহার শুরু হলে বিদেশী প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমবে।
বৈঠকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো: সাখাওয়াত হোসেন, প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত, প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো: কামরুজ্জামান চৌধুরী, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) উপ-উপাচার্য মুহাম্মদ শরীফুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের চিকিৎসক শাহ মুহাম্মদ আমান উল্লাহ, প্রধানমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব-১ মামুন শিবলী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
জাপান প্রতিনিধির সাক্ষাৎ : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন জাপানের প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উপদেষ্টা উনো ইয়োশিমাসার নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল। মঙ্গলবার দুপুরে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এ সাক্ষাতের তথ্য দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপ প্রেসসচিব শাহাদাৎ স্বাধীন।
প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে জাপানি কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ আরো বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন খাতে জাপানের আরো সক্রিয় সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
জাপানের প্রতিনিধি দলের অন্য সদস্যরা হলেন, জাপানের ভূমি, অবকাঠামো, পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলবিষয়ক সহকারী ভাইস মিনিস্টার নাকায়ামা রিয়েকে, জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি এবং জাপানের সিভিল এভিয়েশন ব্যুরোর ঊধর্তন কর্মকর্তারা।
বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে বানিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ, হজরত শাহ জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং চলমান ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) প্রকল্পের অগ্রগতিসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত সহযোগিতার বিভিন্ন বিষয়ে নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
উপ প্রেস সচিব বলেন, প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ থেকে দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী, কৃষি শ্রমিক ও গাড়ি চালক নিয়োগে উদ্যোগ নেয়ার জন্য জাপানি প্রতিনিধিদলের প্রতি আহ্বান জানান। নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের মতো আরো একটি শিল্প পার্ক স্থাপনে জাপান আগ্রহী হলে বাংলাদেশ সরকার সর্বাত্মক সহযোগিতা করার কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরিদর্শন : প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মঙ্গলবার বিকেলে সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরিদর্শনকাল মন্ত্রণালয়ে এক সভায় প্রধানমন্ত্রী এই নির্দেশনা দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব এ কে এম নাজমুল হক বলেন, প্রধানমন্ত্রী শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিভিন্ন দফতর ও সংস্থার প্রধান এবং মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী অভিজ্ঞ শিক্ষা কর্মকর্তাদের সাথে মতবিনিময় করেছেন।
সভায় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, দেশের প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। এ লক্ষ্যে শিক্ষাব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে গুণগত পরিবর্তন আনতে সমন্বিত উদ্যোগ, কার্যকর তদারকি এবং সময়োপযোগী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন অব্যাহত থাকবে।



