এক প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থীর চাঞ্চল্যকর জবানবন্দী

ইন্টারনেট বন্ধ করে উত্তরা গণহত্যা ঢাকতে চেয়েছিল সরকার

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রেখে উত্তরাসহ দেশজুড়ে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের মামলায় এক প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থীর চাঞ্চল্যকর জবানবন্দী রেকর্ড করা হয়েছে। জবানবন্দীতে সাক্ষী পরিষ্কারভাবে তুলে ধরেন শেখ হাসিনা ও সজীব ওয়াজেদ জয়ের নির্দেশে কিভাবে সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক ইন্টারনেট বন্ধ করে উত্তরার গণহত্যা ও গুমের তথ্য ঢাকতে চেয়েছিলেন। অন্য দিকে বিচারিক প্রক্রিয়ার একপর্যায়ে জবানবন্দীতে রাষ্ট্রপক্ষের সংশোধনী আবেদনের তীব্র আপত্তি জানিয়ে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে পলক আদালতের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘মাননীয় আদালত, আমি শুধু ন্যায়বিচার প্রার্থনা করছি। আমি আল্লাহর ওপর ভরসা করি, কোনো চালাকির কাছে নয়।’

গতকাল সোমবার ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারক মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে এই মামলার ৮ নম্বর সাক্ষী হিসেবে নরসিংদী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী মো: আব্দুল নাসির উদ্দিনের এই জবানবন্দী রেকর্ড করা হয়। জবানবন্দী গ্রহণ শেষে রাষ্ট্রপক্ষের (প্রসিকিউশন) পক্ষ থেকে সাক্ষ্যের বক্তব্যে একটি সংশোধনী আবেদন করা হলে পলক তাতে সরাসরি আপত্তি জানান এবং আদালতকে নতুন করে কোনো সংশোধনী গ্রহণ না করার জন্য বিনীত অনুরোধ জানান।

ট্রাইব্যুনালে দেয়া পূর্ণাঙ্গ জবানবন্দীতে ২০ বছর বয়সী শিক্ষার্থী আব্দুল নাসির উদ্দিন জুলাই-আগস্টের রক্তাক্ত স্মৃতির প্রত্যক্ষ বিবরণ তুলে ধরে বলেন, ‘আমার নাম মো: আব্দুল নাসির উদ্দিন। আমার বর্তমান বয়স ২০ বছর। ঘটনার সময় আমি টঙ্গী চেরাগ আলীতে ছিলাম। ২০২৪ সালের জুলাই মাসের শুরু থেকে কোটা আন্দোলন শুরু হয়। ১৬ জুলাই ২০২৪ তারিখে আবু সাঈদ ভাইকে হত্যার পর থেকে আমি কোটা বিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করি। ১৮ জুলাই ২০২৪ তারিখ থেকে ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যায়। ৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখ দুপুর ১২টার দিকে আমি, আমার বন্ধু সামিদসহ চার-পাঁচজন মিলে ‘লং মার্চ টু ঢাকা’র উদ্দেশ্যে বের হই। টঙ্গীর চেরাগ আলী থেকে বের হয়ে ওই দিন উত্তরা বিএনএস এলাকায় পৌঁছাই প্রায় বেলা ২টার দিকে। তখন আনুমানিক বেলা আড়াইটার দিকে উত্তরা পূর্ব থানার দিক থেকে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ ক্যাডাররা এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে থাকে। তখন আমরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যাই। সামিদকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না।

সামিদের ফোনে অনেক কল দিই, কিন্তু কল রিসিভ হচ্ছিল না। ওই দিন আনুমানিক বিকেল ৫টায় একটি অপরিচিত নম্বর থেকে কল আসে। কল রিসিভ করার পর বলে উত্তরা কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে যেতে, সেখানে সামিদ আছে। হাসপাতালে যাওয়ার পর অনেক খোঁজাখুঁজির পর সামিদকে আইসিইউতে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় খুঁজে পাই। সামিদের কপালে গুলি লেগে মাথার পেছন দিক দিয়ে বের হয়ে যায়। সামিদ রক্তাক্ত অবস্থায় ছিল। তখন আমি সামিদের বাবাকে কল করি। তিনি উত্তরাতে বিজয় মিছিলে ছিলেন। কিছুক্ষণ পর সামিদের বাবা হাসপাতালে আসেন। সামিদের বাবা হাসপাতালে আসার পর দেখেন সামিদ মৃত। ওই দিন আনুমানিক রাত ৮টার দিকে সামিদের লাশ হাসপাতাল থেকে বের করে আমরা সামিদের লাশ নিয়ে টঙ্গীর চেরাগ আলীতে যাই। ওই দিন রাত ১১টায় চেরাগ আলীতে সামিদের প্রথম নামাজে জানাজা হয়। নামাজে জানাজা শেষে সামিদের লাশ নিয়ে তার গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার উদ্দেশ্যে রওনা হই। আনুমানিক রাত ৩টার দিকে তার গ্রামের বাড়িতে পৌঁছাই। লাশ রেখে ওই একই অ্যাম্বুলেন্সে করে আমি টঙ্গী চেরাগ আলীতে ফেরত আসি।

জবানবন্দীতে ইন্টারনেট বন্ধ করে তথ্য গোপন ও গণহত্যার অভিযোগ তুলে ধরে সাক্ষী আরো বলেন, ২০২৪ সালের আগস্ট মাসের ৫ তারিখ সকালে ইন্টারনেট ছিল না। ওই দিন শেখ হাসিনার নির্দেশে উত্তরা এলাকায় গুলি করে আনুমানিক ৩০-৪০ জন মানুষকে হত্যা করা হয় এবং অগণিত মানুষকে গুলি করে আহত করা হয়। ওই দিন যাদের হত্যা করা হয় তাদের মধ্যে আছে সামিদ, সানজিদ, জসিম ও সোহেল। শেখ হাসিনা ও তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের নির্দেশে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়। জুলাই মাসের বিভিন্ন সময় ইন্টারনেট বন্ধ করে। দেশে অনেক হত্যাকাণ্ড এবং গুম হয় যা বিশ্ববাসী জানতে না পারে, আন্দোলনকারীরা যেন নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করতে না পারে, এজন্য ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়। এই হত্যাকাণ্ডের সাথে যারা জড়িত আছে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমি বিষয়গুলো জেনেছি। তদন্তকারী কর্মকর্তা আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। এই আমার জবানবন্দী।

জবানবন্দী রেকর্ড শেষে রাষ্ট্রপক্ষ এতে সামান্য সংশোধনী আনতে চাইলে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে পলক ট্রাইব্যুনালকে বলেন, ‘খুব সুন্দরভাবে সাক্ষ্য সম্পন্ন করেছে প্রসিকিউশন। মাননীয় আদালতও মূল্যবান সময় দিয়েছেন। অতএব আমার অনুরোধ সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আর কোনো সংশোধনী যেন না নেয়া হয়।’ এরপরই সাবেক এই আইসিটি প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমি শুধু ন্যায়বিচার প্রার্থনা করছি। আমি আল্লাহর ওপর ভরসা করি। কোনো চালাকির কাছে নয়।’

পরে পলকের পক্ষে নিয়োজিত আইনজীবী লিটন আহমেদ সাক্ষীকে জেরা শুরু করেন। ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি পরিচালনা করেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম। তার সাথে উপস্থিত ছিলেন প্রসিকিউটর আবদুস সোবহান তরফদার, মার্জিনা রায়হান, মামুনুর রশিদ ও আবদুল্লাহ আল নোমান। উল্লেখ্য, এই মামলায় জুনাইদ আহমেদ পলকের পাশাপাশি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়কেও আসামি করা হয়েছে। পলাতক থাকায় জয়ের পক্ষে আইনি লড়াই করছেন রাষ্ট্রনিযুক্ত (স্টেট ডিফেন্স) আইনজীবী মনজুর আলম।