দেশে বর্তমানে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৮ হাজার মেগাওয়াট হলেও বিদ্যুৎ আমদানি এবং অনগ্রিড নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ মোট গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা দাঁড়িয়েছে ২৯ হাজার ৫৯৩ মেগাওয়াটে। একই সময়ে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় তিন হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে দুই হাজার ৬৫৪ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে প্রতিদিন এক হাজার ১৪৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। তবে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন গ্যাস অনুসন্ধান, ১৫০ কূপ খনন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ এবং দেশীয় জ্বালানি সম্পদের উন্নয়নে সরকার বহুমুখী উদ্যোগ নিয়েছে বলে সংসদকে জানিয়েছেন জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।
গতকাল সোমবার জাতীয় সংসদে বিভিন্ন সদস্যের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব তথ্য তুলে ধরেন। স্পিকার হাফিজউদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন।
যশোর-৬ আসনের সংসদ সদস্য মো: মোক্তার আলীর এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান বিভিন্ন চুক্তির কার্যকারিতা, অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা এবং বর্তমান জ্বালানি বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যতা বিবেচনা করে সরকার সেগুলো পর্যালোচনা করছে। এর অংশ হিসেবে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর চুক্তিও মূল্যায়নের আওতায় আনা হয়েছে। তিনি জানান, কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা কমানোর সরকারি নীতির অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে দেশের সব কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র অবসরে পাঠানো হয়েছে। এর ফলে ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে এবং বিদ্যুৎ খাতকে আরো টেকসই ও দক্ষ করে তোলার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, দীর্ঘমেয়াদে নির্ভরযোগ্য, সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার সৌর, বায়ু ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রকল্প ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
শেরপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ ফাহিম চৌধুরীর প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, কৃষি খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং পরিবেশবান্ধব সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে দেশে বর্তমানে তিন হাজার ৪৫৭টি সোলার ইরিগেশন বা সৌরচালিত সেচব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি), বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ), পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (আরডিএ) এবং বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (বাপবিবো) বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় এসব সেচব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। তিনি বলেন, কৃষি উৎপাদন ব্যয় কমানো, ডিজেলের ওপর নির্ভরতা হ্রাস এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির জন্য সরকার সৌরচালিত সেচপাম্প স্থাপনে গুরুত্ব দিচ্ছে।
মন্ত্রী জানান, শেরপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির অধীন নকলা ও নালিতাবাড়ী উপজেলায় ‘সৌরবিদ্যুৎ চালিত পাম্পের মাধ্যমে কৃষি সেচ (দ্বিতীয় সংশোধিত)’ প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যে দু’টি সোলার সেচপাম্প স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া জেলায় আরো ৩১টি সোলার সেচপাম্প স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে।
সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য সেলিনা সুলতানার প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, দেশে আবিষ্কৃত পাঁচটি কয়লাক্ষেত্র হলো দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া, ফুলবাড়ী ও দিঘীপাড়া, রংপুরের খালাসপীর এবং জয়পুরহাটের জামালগঞ্জ কয়লাক্ষেত্র।
তিনি বলেন, এসব কয়লাক্ষেত্রের মধ্যে শুধু বড়পুকুরিয়া কয়লাক্ষেত্রের উন্নয়নকার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে এবং ২০০৫ সাল থেকে সেখানে বাণিজ্যিকভাবে কয়লা উত্তোলন চলছে। দেশের একমাত্র উৎপাদনশীল কয়লাখনি হিসেবে বড়পুকুরিয়ার কার্যক্রম কখনো বন্ধ হয়নি। মন্ত্রী জানান, ফুলবাড়ী ও দিঘীপাড়া কয়লাক্ষেত্রের বিস্তারিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। অন্য দিকে খালাসপীর ও জামালগঞ্জ কয়লাক্ষেত্রে আংশিক সমীক্ষা শেষ হয়েছে। এ দু’টি ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্নের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
মেহেরপুর-১ আসনের বিরোধী দলের (জামায়াতে ইসলামী) সদস্য মো: তাজউদ্দীন খানের তারকাচিহ্নিত প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুদের পরিমাণ ছিল ৭ দশমিক ৬৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ)।
তিনি বলেন, আটটি গ্রাহক শ্রেণীর অনুমোদিত গ্যাস লোড অনুযায়ী দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় তিন হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত গড়ে সরবরাহ হয়েছে দুই হাজার ৬৫৪ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে প্রতিদিন এক হাজার ১৪৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে।
এই ঘাটতি মোকাবেলা এবং ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এর আওতায় ২০৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপখনন ও ওয়ার্কওভারের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ইতোমধ্যে ২৮টি কূপে কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
মন্ত্রী জানান, নতুন সম্ভাব্য গ্যাসক্ষেত্র চিহ্নিত করতে ব্লক-৭ ও ব্লক-৯ এলাকায় প্রায় চার হাজার ৫০০ লাইন কিলোমিটার দ্বিমাত্রিক (২ডি) সিসমিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে এবং বর্তমানে সেগুলোর তথ্য প্রক্রিয়াকরণ চলছে। এ ছাড়া হবিগঞ্জ, বাখরাবাদ ও মেঘনা গ্যাসক্ষেত্রের আশপাশে এক হাজার ৪৫০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ত্রিমাত্রিক (৩ডি) সিসমিক জরিপ শিগগিরই শুরু হবে।
ভোলার চরফ্যাসনে ৬৬০ বর্গকিলোমিটার, জামালপুরে ৬৫০ বর্গকিলোমিটার, তিতাস-হবিগঞ্জ-নরসিংদী গ্যাসক্ষেত্র সংলগ্ন এলাকায় ৬৩২ বর্গকিলোমিটার এবং লামিগাঁও, লালাবাজার, গোয়াইনঘাট, কৈলাশটিলা দক্ষিণ ও ফেঞ্চুগঞ্জ পশ্চিম এলাকায় ৮৮২ বর্গকিলোমিটার এলাকায় নতুন ৩ডি সিসমিক জরিপের পরিকল্পনাও নেয়া হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় অনুসন্ধান প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে শক্তিশালী করতে দুই হাজার ও এক হাজার ৫০০ অশ্বশক্তি ক্ষমতাসম্পন্ন দু’টি নতুন ড্রিলিং রিগ কেনার কার্যক্রম এগিয়ে নেয়া হচ্ছে বলে জানান মন্ত্রী। তিনি আরো বলেন, ভোলায় আবিষ্কৃত গ্যাসক্ষেত্রগুলোকে জাতীয় গ্যাস গ্রিডের সাথে যুক্ত করতে ভোলা-বরিশাল-জাজিরা-মাওয়া-আমিনবাজার গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়নের কার্যক্রম বর্তমানে চলমান রয়েছে।



