ক্রীড়া প্রতিবেদক
একটা সময় মনে হতো, আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভিষেক মানেই মানিয়ে নেয়ার লড়াই। নতুন জার্সি, নতুন চাপ, নতুন প্রত্যাশা। কিন্তু কিছু ফুটবলার সেই নিয়মই বদলে দেন। তারা শুরু থেকেই জানান দেন ইতিহাস লেখার জন্যই এসেছেন তারা। সেই তালিকায় নতুন করে নিজের নাম আরো উজ্জ্বল করলেন ম্যানচেষ্টার সিটির মহাতারকা বিশ^কাপে নজরকাড়া নরওয়ের আর্লিং হলান্ড।
বিশ্বকাপের অভিষেকেই সাত গোল! সংখ্যাটা শুধু বিস্ময়কর নয়, এটি বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা তারকাদের অভিষেককেও ম্লান করে দিয়েছে। লিওনেল মেসি, নেইমার কিংবা কিলিয়ান এমবাপ্পে তিনজনই প্রথম বিশ্বকাপে নিজেদের সামর্থ্যরে ঝলক দেখিয়েছিলেন। কিন্তু গোলের হিসেবে তাদের সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন নরওয়ের এই গোলমেশিন। গোলকে যেন অভ্যাসে পরিণত করেছেন। বক্সের ভেতরে তার অবস্থান, শারীরিক শক্তি, গতি এবং নিখুঁত ফিনিশিং সব মিলিয়ে তিনি প্রতিপক্ষ রক্ষণভাগের জন্য এক দুঃস্বপ্ন। সুযোগ পেলেই গোল, আর সুযোগ না থাকলেও সুযোগ তৈরি করে নেয়ার বিরল ক্ষমতা রয়েছে তার।
অভিষেক বিশ্বকাপেই সাত গোল করে তিনি নিজেকে নিয়ে গেছেন গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ের সামনের সারিতে। একইসাথে জন্ম দিয়েছেন আরো বড় এক প্রশ্নের কোথায় গিয়ে থামবেন হলান্ড ? যদি এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেন, তবে শুধু একটি বিশ্বকাপ নয়, ভবিষ্যতের একাধিক বিশ্বকাপেই গোলের রেকর্ড নতুন করে লেখা হতে পারে। আধুনিক ফুটবলে গোল করার যে সংজ্ঞা, হলান্ড যেন সেটিকে প্রতিদিন আরো বিস্তৃত করছেন। বয়স এখনো তার পক্ষে, সামনে রয়েছে দীর্ঘ ক্যারিয়ার।
ফুটবলের ইতিহাসে কিছু খেলোয়াড় আসেন, যারা ট্রফি জেতেন। আবার কেউ কেউ আসেন, যারা পরিসংখ্যানের সংজ্ঞাই বদলে দেন। আর্লিং হলান্ড ধীরে ধীরে দ্বিতীয় পথেই হাঁটছেন। তাই বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের একটাই কৌতূহল এই গোলমেশিনের যাত্রা শেষ পর্যন্ত কোন উচ্চতায় গিয়ে থামবে? যেখানে পৌঁছানো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছেও কেবল স্বপ্নই হয়ে থাকবে।
বিশ্বকাপের মঞ্চ অনেক তারকার জন্ম দিয়েছে। কেউ প্রথম আসরে নিজের নাম লিখিয়েছেন সম্ভাবনার খাতায়, কেউ আবার সময় নিয়ে হয়েছেন কিংবদন্তি। কিন্তু আর্লিং হলান্ড যেন কোনো অপেক্ষার পক্ষপাতী নন। তিনি এসেছেন, গোল করেছেন-করছেন-আরো করবেন। হলান্ডের খেলার ধরনই তাকে আলাদা করে। প্রতিপক্ষের রক্ষণে সামান্য ফাঁক দেখলেই সেখানে ঝাঁপিয়ে পড়েন। অনেক সময় পুরো ম্যাচে তাকে চোখে পড়ে না, কিন্তু একটি সুযোগ পেলেই সেটিকে গোলে পরিণত করার অসাধারণ ক্ষমতাই তাকে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ফরোয়ার্ডদের কাতারে নিয়ে গেছে। সামনে যদি আরো কয়েকটি বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ পান এবং বর্তমান ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেন, তাহলে মিরোস্লাভ ক্লোসা, রোনালদো, গার্ড মুলার কিংবা লিওনেল মেসিদের রেকর্ডও একদিন তার নাগালের মধ্যে থাকতে পারে।
ফুটবলের প্রতিটি যুগেরই একজন করে গোলের রাজা থাকে। এই সময়ের সেই সিংহাসনে বসার দাবিদারদের মধ্যে আর্লিং হলান্ড এখন সবচেয়ে এগিয়ে।
২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর দু’টি ম্যাচ শুধু কোয়ার্টার ফাইনালিস্টই ঠিক করেনি, জন্ম দিয়েছে একের পর এক স্মরণীয় পরিসংখ্যানের। ব্রাজিলকে বিদায় করে নরওয়ের নায়ক হয়েছেন আর্লিং হালান্ড। আর আজতেকা স্টেডিয়ামে মেক্সিকোকে হারিয়ে ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়েছেন জুড বেলিংহ্যাম। ব্রাজিলের বিপক্ষে ২-১ ব্যবধানের জয়ে দুই গোলই করেন হালান্ড। তাতে চলতি বিশ্বকাপে তার গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭। অভিষেক বিশ্বকাপে এত গোল সর্বশেষ করেছিলেন পোল্যান্ডের গ্রেগোরজ লাতো, ১৯৭৪ সালে। ৫২ বছর পর সেই কীর্তির পুনরাবৃত্তি করলেন নরওয়ের এই গোলমেশিন।
আরো বিস্ময়কর তথ্য হলো, নিজের প্রথম বিশ্বকাপেই হালান্ডের ৭ গোল লিওনেল মেসি, কিলিয়ান এমবাপ্পে ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর অভিষেক বিশ্বকাপের মোট গোলসংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে। প্রথম বিশ্বকাপে মেসির ছিল ১ গোল, রোনালদোর ১ এবং এমবাপ্পের ৪ সব মিলিয়ে ৬। হলান্ড একাই করেছেন ৭। ব্রাজিলের বিপক্ষে তার জোড়া গোল আরো একটি বিরল রেকর্ড এনে দিয়েছে। ২০১৪ সালের সেমিফাইনালে জার্মানির টনি ক্রুস ও আন্দ্রে শুরলের পর নকআউট পর্বে ব্রাজিলের জালে দুই গোল করা প্রথম ফুটবলার তিনি।
হলান্ডের জোড়া আঘাতে আরেকটি দুঃস্বপ্নের অধ্যায় যোগ হয়েছে ব্রাজিলের ইতিহাসে। ২০০২ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর ইউরোপীয় প্রতিপক্ষের বিপক্ষে নকআউটে টানা ষষ্ঠবার বিদায় নিল পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। ১৯৯০ সালের পর এবারই প্রথম তারা কোয়ার্টার ফাইনালে উঠতে ব্যর্থ হলো। এমনকি ২০৩০ বিশ্বকাপ পর্যন্ত ব্রাজিলের শিরোপাখরা ২৮ বছরে পৌঁছাবে, যা তাদের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ অপেক্ষা হবে! তবে বিদায়ের রাতে ব্যক্তিগত এক মাইলফলক ছুঁয়েছেন নেইমার। গোল করে তিনি পেলের পর মাত্র দ্বিতীয় ব্রাজিলিয়ান হিসেবে চারটি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করার কীর্তি গড়েছেন।



