কাজল রশীদ শাহীন
জসীমউদ্দীনের কবিতা নিয়ে আলাপের আগে ফ্রানস ফানোকে স্মরণ করা যাক। তিনি মনে করেন, ‘স্থানীয় বুদ্ধিজীবীর কাজ কেবল বিদেশী শ্বেতাঙ্গ পর্যবেক্ষকদের প্রতিস্থাপন করা না; বরং সমাজের জন্য নতুন আত্মা নির্মাণ করা।’ এই আত্মা নির্মাণের কাজটা আমরা এখনো করে উঠতে পারিনি। এ কারণে নির্মিতি পায়নি আমাদের আত্মসত্তার রাজনীতি। জসীমউদ্দীনের সৃজনরাজির আত্মা আবিষ্কার ও চর্চা করা সম্ভব হতো বলে মনে হয়। উনি আধুনিক না অনাধুনিক এসব তর্কের আড়ালে চাপা পড়ে রয়েছে তার আত্মসত্তার রাজনীতি; যার মধ্যে নিহিত আছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের রাজনীতির ব্যর্থতা ও হাল-হকিকতের আমলনামা।
আবু হেনা মোস্তফা কামাল প্রায় পাঁচ দশক আগেই জসীমউদ্দীনকে সাব্যস্ত করে গেছেন ‘আধুনিক’ কবি হিসেবে। যারা নতুন করে প্রমাণ করতে চান তারা নতুন কিছু উৎপাদন করেন না, পুনরাবৃত্ত করেন মাত্র। তিনি বলেন : ‘জসীমউদদীনের কাব্যপ্রকরণ সবটাই আধুনিক। সেখানেই সৃষ্টির মৌলিক ব্যবধান। মৈমনসিংহ গীতিকার কাহিনীগুলির ভেতরে ঘটনার ন্যূনতা নেই, কিন্তু পরিচর্যার অভাবে ঐসব ঘটনা তীব্র নাট্যরস সৃষ্টি করতে পারেনি। অনেক ক্ষেত্রেই শ্রোতা-পাঠককে কল্পনায় সেই ফাঁকগুলো পূরণ করতে হয়। জসীমউদ্দীন আধুনিক কবি; কাব্যের নাটকীয় মুহূর্ত এবং গীতিময় অবকাশ তিনি চূড়ান্ত সাফল্যের সাথে ব্যবহার করেছেন। তাই তার কাব্য পাঠের পর পাঠকের চিত্ত পরিপূর্ণ আনন্দের ভারে ন¤্র হয়ে আসে। আশ্চর্য সঙ্গীতের কুহকে সমস্ত সংশয় ও অতৃপ্তি শান্ত হয়ে যায়।’
বালুচর গ্রন্থের ‘প্রতিদান’ কবিতায় জসীমউদ্দীন লিখেছেন, ‘আমার এ ঘর ভাঙিয়াছে যেবা, আমি বাঁধি তার ঘর,/আপন করিতে কাঁদিয়া বেড়াই যে মোরে করেছে পর।/যে মোরে করিল পথের বিবাগী;/ পথে পথে আমি ফিরি তার লাগি;/দীঘল রজনী তার তরে জাগি ঘুম যে হরেছে মোর;/ আমার এ ঘর ভাঙিয়াছে যেবা আমি বাঁধি তার ঘর।’ এই হচ্ছে বাংলার চিরন্তর সংস্কৃতি। যা চণ্ডিদাসের বৈষ্ণব পদাবলিতে হাজির রয়েছে এভাবে- ‘ঘর কৈনু বাহির, বাহির কৈনু ঘর/পর কৈনু আপন, আপন কৈনু পর’। জসীমউদ্দীন যখন ‘প্রতিদান’কে এভাবে চিত্রায়িত করেন তখন তিনি মূলত বাংলার চিরায়ত স্বরূপকেই তুল ধরেন। যার মধ্যে তার সংহতি ও সৌহার্দ্যরে স্বরূপকেই উচ্চকিত করেন। বাংলার প্রকৃতি ও পরিবেশ হাজার বছর ধরে অন্যকে আপন করে নিয়েছে। ফলে, এখানে পূর্ব-পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিণ সব দিক থেকেই নানা বর্ণ-শ্রেণী ও পেশার মানুষের সমাবেশ ঘটেছে। যার কারণে আমরা জাতিগতভাবে শঙ্কর। এই বেশিষ্ট্য দুর্বলতা প্রকাশ করে না, মহৎ মানবিকতাকেই হাজির করে। যার প্রকাশ ঘটেছে কবির ‘প্রতিদান’ কবিতায়। তিনি আরো লিখেছেন- ‘যে মুখে সে কহে নিঠুরিয়া বাণী/আমি লয়ে সখি, তারি মুখখানি,/ কত ঠাঁই হতে কত কী যে আনি, সাজাই নিরন্তর/ আপন করিতে কাঁদিয়া বেড়াই যে মোরে করেছে পর।’
বাংলার লোকধর্মের মধ্যেও প্রবলভাবে জারি রয়েছে এই প্রবণতা। তার ‘আত্মীকরণ’ ও ‘সাঙ্গীকরণ’ কৌশলেই উপ্ত হয়েছে জসীমউদ্দীনের কাব্য প্রতিভার মৌলসুর-সৃজনসত্তার রাজনীতির সারকথা। কবির কাব্য প্রতিভাকে মূল্যায়নে যে দ্বিধা ও সংশয় তাতে প্রতীয়মান হয়, আমরা এখনো আমাদের আত্মসত্তা নির্মাণের সাথে ঔপনিবেশিক কাঠামো ও তত্ত্বের যে রাজনীতি ও চাপানউতোর খেলা রয়েছে তার খাসলত বুঝে উঠতে পারেনি। যার সাথে যুক্ত রয়েছে আমাদের আধুনিকতা ও নবজাগরণের প্রশ্নে বোঝাপড়ার সঙ্কট ও অহেতুক কুতর্ক।
নবজাগরণের পর আধুনিকতা, নাকি আধুনিকতার পরে নবজাগরণ- এই প্রশ্নেও আমাদের রয়েছে দ্বিধা, সংশয় ও কৌশলী সব কূটচাল। নবজাগরণের পর যদি আধুনিকতা আসে, সেই আধুনিকতা যথার্থ হয়। আমাদের এখানে নবজাগরণ ও আধুনিকতা এসেছে হাত ধরাধরি করে। অনেকাংশে নবজাগরণের আগেই আধুনিকতা এসেছে। এসেছে মানে ঔপনিবেশিক শাসক, তার বিদ্বজ্জন ও এদেশীয় দোসররা, নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি হাসিলের লক্ষ্যে আধুনিকতাকে চাপিয়ে দিয়েছেন এবং আমরা সেটিই কবুল করে নিয়েছি। এই যে চাপিয়ে দেয়া আধুনিকতা, এই আধুনিকতা তো উপর থেকে নীচের সাধনাই করবেন, এবং এটাই স্বাভাবিক ও সঙ্গত। যদি নবজাগরণ সংঘটিত হওয়ার পর আধুনিকতার যাত্রা হতো তাহলে বিষয়টা উল্টো হতো, এবং সাধনাটা নিচ থেকে উপরের দিকে হতো। যা যুক্তিযুক্ত ও শাস্তসম্মত হতো। বেঙ্গল রেনেসাঁ যে সীমাবদ্ধতা-দুর্বলতায় আকীর্ণ, বাংলাদেশের রেনেসাঁতেও তার আছর রয়েছে, তবে অন্যভাবে।
বাংলায় নবজাগরণ সম্পন্ন হওয়ার পর, নিদেনপক্ষে একটা পরিণতি পাওয়ার পর যদি আধুনিকতার সূত্রপাত হতো, তা হলে বিষয়টা তেমন হতো না। কারণ নবজাগরণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো- নিজের দিকে দৃষ্টি ফেরানো, শেকড়ের অনুসন্ধান করে আত্মসত্তার রাজনীতিকে নির্মিতি দেয়া, আত্মজাগরণ ঘটানো, সমৃদ্ধ অতীতকে আবিষ্কার করে বর্তমানকে আলোকিত ও ঋদ্ধ করা।
এই ব্যাপারটা জসীমউদ্দীন ভালোভাবেই বুঝেছিলেন। ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’ প্রবন্ধে তিনি যা বলেছেন, তা যে সেই ভাবনা থেকেই উৎসারিত তা স্পষ্টত। তিনি বলেছেন : ‘প্রায় সব দেশেই বড় সাহিত্য-প্রতিভা তার দেশবাসীর জন্য রসধারার পানপাত্রটি পূর্ণ করিয়ে দেয়। সেই পাত্র ভরিয়া টুবুটুবু হইয়া যাহা গড়াইয়া পড়ে, তাহাই হয় বিশ্বরস-পিপাসুদের সম্পদ। এই কবির ব্যাপার হইল তাহার বিপরীত। এখানে বিশে^র পাত্র ভরিয়া যাহা গড়াইয়া পড়িয়াছে, তাহাই পাইয়াছে তাহার দেশবাসী। ... সর্বপ্রাচ্যের বিরাট পদক্ষেপ কবি রচনা করিলেন ইউরোপীয় দৃষ্টি লইয়া। ... এ দেশের যা কিছু ইউরোপের দৃষ্টি আকর্ষণ করিতে পারে, তাই লইয়া তিনি পসরা সাজাইলেন। এ দেশের সব ভালো লইয়া কবি পাশ্চাত্যের রুচি বদলাইতে চেষ্টা করিলেন না। (জসীম ১৯৯০ : ৭৪)।
জসীমউদ্দীনের সাহিত্যে আমরা পৃথিবীর মহৎ সাহিত্যিকদের বৈশিষ্ট্য ও বিশিষ্টতায় খুঁজে পাই। তিনি সদর্থক অর্থেই নিজের ঘরকে আলোকিত করতে চেয়েছেন এবং পরে অন্যদিকে দৃষ্টি দিয়েছেন। কবির কাছে আত্মসত্তার রাজনীতির গুরুত্ব ও অপরিহার্যতা ছিল পরিষ্কার ছিল বলেই এমনটি সম্ভব হয়েছে।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের কালে শিক্ষা-দীক্ষা-শিল্প-সাহিত্য-জ্ঞান-বিজ্ঞানে বাঙালি মুসলমানের চেয়ে বাঙালি হিন্দুরা অনেক বেশি এগিয়ে যায়। এমনকি রাজনীতি-প্রশাসনে, অর্থনীতি-ব্যবসায় বাণিজ্যে, সমাজসেবা ও সামাজিক উন্নয়নে সর্বত্রই হিন্দুরা অগ্রণী ছিল। অর্থাৎ সব কিছুতেই উনারা বড় ছিলেন। কিন্তু বড়র ধর্ম পালন করেননি। ফলে, নজরুলের ভাষায় হিন্দু ও মুসলিম একই বৃন্তের দু’টি কুসুম হলেও তাদের একসঙ্গে চলা সম্ভব হয়নি।
বাঙালি হিন্দু, বাঙালি মুসলিমকে নানাভাবে দূরে সরিয়ে রাখে, নিজেদের অগ্রযাত্রায় শরিক হতে দেয় না; পাশাপাশি পূর্ববঙ্গের প্রতিও অজ্ঞাত কারণে অবজ্ঞা প্রদর্শন করতে থাকে। এবং সেটি প্রকাশ্য ছিল। এ ব্যাপারে অনেক উদাহরণ হাজির করা সম্ভব। পূর্ববঙ্গের ‘ময়মনসিংহ গীতিকা’ বা ‘পূর্ববঙ্গ গীতিকাকে’ অনেকেই হেয় করেছেন, বিদ্রƒপবাণ শানিয়েছেন। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছেন। উনবিংশ শতকে বাংলায় যে রেনেসাঁ বা নবজাগরণ সংঘটিত হয়, তার পরিসর ছিল কলকাতা ও তার আশেপাশেই। নবজাগরণে পূর্ববঙ্গকে যেমন অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, তেমনি এখানে জন্ম নেয়া কাউকে রেনেসাঁপুরুষ হিসেবে স্বীকৃতিও দেয়া হয়নি। ঐতিহাসিক সুশোভন সরকার বাংলার রেনেসাঁর যে সীমাবদ্ধতা ও দুর্বলতার কথা বলেছেন, তার মধ্যে অন্যতম হলো- এক. এতে পূর্ববঙ্গকে যুক্ত করা হয়নি। দুই. এই রেনেসাঁ বাঙালি মুসলমানের কোনো অংশগ্রহণ ছিল না।
আবুল মনসুর আহমদ মনে করতেন, কলকাতার মানুষের কাছে ঢাকা বা পূর্ববঙ্গ ছিল ‘হিন্টারল্যান্ড’ স্বরূপ। আমরা দেখি সনাতন ধর্মবিশ^াসী পণ্ডিতদের মধ্যেই জসীমউদ্দীনকে নিয়ে বিভক্তি ও অস্বস্তি রয়েছে। এর পেছনেও যে আত্মসত্তার রাজনীতি ক্রিয়াশীল, তাতে কোনো প্রকার দ্বিমত করার সুযোগ নেই। একটু খেয়াল করা যাক, একদিকে, যখন জসীমউদ্দীনকে প্রাপ্য সম্মান ও যথাযথ মর্যাদা দিচ্ছেন দীনেশচন্দ্র সেন। অন্য দিকে, তখন উনার প্রতি হিংসা উগরে দিচ্ছেন সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়। দীনেশবাবুর জন্ম পূর্ববঙ্গের মানিকগঞ্জের বগজুরী গ্রামে, পরে তিনি পশ্চিমবঙ্গবাসী হন। অন্যদিকে, সুনীতিবাবুর জন্ম শিবপুর, হাওড়ার পশ্চিমবঙ্গে এবং আজীবন পশ্চিমবঙ্গেই থেকে যান। বাঙালি মুসলমান ও পূর্ববঙ্গবাসীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির ফারাক এখানেই। অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম বনগাঁ, পশ্চিমবঙ্গে। উনার লেখা পড়লেও স্পষ্ট হয়ে যায় বাঙালি মুসলমানের প্রতি উনার মূল্যায়নের স্বরূপ ও প্রবণতা। উনি তিতুমীর ও তিতুমীরের সংগ্রামকে ডাকাত ও ডাকাতি কার্যকলাপ বলে মনে করেন। ‘বাংলা সাহিত্যের সম্পূর্ণ ইতিবৃত্ত’ পড়লেই বিষয়টা বোঝা যায়। একটা জাতির বীর হিসেবে যিনি স্বীকৃত ও বন্দিত, একটা দেশের স্মরণীয় ব্যক্তিদের মধ্যে যিনি অন্যতম। যার নামে দেশটিতে জাতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। অথচ কোনো প্রকার যুক্তি-তর্ক-প্রমাণ ছাড়াই এ রকম একটা নেতিবাচক ও অপমানসূচক তকমা লগিয়ে দেয়া কি কোন যুক্তির মধ্যে পড়ে? এসব দেখেশুনে এবং বুঝেই বোধ করি আবুল মনসুর আহমদ ওরকম উক্তি করেছেন। তখন ভারত বিভক্ত হবে কি না নিশ্চিত নয়। বঙ্গও দ্বিখণ্ডিত হবে কি না সেই আলোচনা দানা বেঁধে উঠেনি। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠান নিয়ে আলোচনা চলছে। বিভিন্ন মহল থেকে এ সম্পর্কিত আলাপ-যুক্তি তর্ক উত্থাপিত হচ্ছে। সেই সময় আবুল মনসুর আহমদের উপলব্ধি হলো- রাজনৈতিক পাকিস্তান হবে কি না তিনি নিশ্চিত নন, কিন্তু সাহিত্যিক পাকিস্তান যে হবে এ ব্যাপারে তার কোনো দ্বিধা বা সংশয় নেই। সেদিন এই উপলব্ধি নিশ্চয় এমনি এমনি বা নিছক কোনো ভাবাবেগ থেকে হয়নি। এর পেছনে অবশ্যই গূঢ় কারণ রয়েছে। জসীম উদ্দীনের সৃজন প্রতিভায় উপ্ত আত্মসত্তার রাজনীতি আমাদের কাছে সেসব গূঢ় কারণের দিকগুলো খোলতাই করে ক্রমাগত।
একজন কবি যে, দেশকে এভাবে ভালোবাসতে পারেন, তার উদাহরণ বোধকরি জসীমউদ্দীনের মতো কবির জন্ম না হলে আমরা কখনো কল্পনাও করতে পারতাম না। যে কবি লিখেছেন : ‘শুধু কহিলাম-পরাণ বন্ধু! তুমি এলে মোর ঘরে,/আমি ত জানিনে কি করে যে আজ তোমারে আদর করে!/ বুকে যে তোমারে রাখিব বন্ধু, বুকেতে শ্মশান জ্বলে;/নয়নে রাখিব!
হায়রে অভাগা, ভাসিয়া যাইবে জলে!/কপালে রাখিব! এ ধরার গাঁয়ে আমার কপাল পোড়া;/মনে যে রাখিব! ভেঙে গেছে সে যে কভু নারে লাগে জোড়া!/সে কেবল শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে চাহিল আমার পানে;/ও যেন আরেক দেশের মানুষ, বোঝে না ইহার মানে।’
কবি কালিদাস রায়ের জসীমউদ্দীন মূল্যায়ন হলো : ‘যতীন্দ্রমোহন ও কুমুদরঞ্জন বঙ্গের পল্লী প্রকৃতিকে দেখিয়েছেন হিন্দুর চোখে। শ্রীমান জসীমউদ্দীন বাঙালির চোখে দেখিয়াছেন অর্থাৎ হিন্দু-মুসলমান উভয়ের দৃষ্টিতে দেখিয়াছেন’। কালিদাস রায়ের এই মূল্যায়নে কোনোরকম অতিরঞ্জন নেই বলে আমরা মনে করি। জসীম উদ্দীন প্রকৃতার্থে বাঙালির কবি হতে চেয়েছিলেন। কবিতায় নদীমাতৃক বাংলাদেশ, পল্লী বাংলা, অসাম্প্রদায়িক বাঙালি সংস্কৃতি ও চেতনাকে ধরতে চেয়েছেন, ধরেছেন।
‘‘আধুনিক কবিদের গুরু টি এস এলিয়ট বলিয়াছেন, অনুকরণ করিয়া বড় সাহিত্য গড়িয়া উঠে না। অনুকরণই যদি পাঠকের রস পিপাসা মিটাইত তবে বিদেশী কবিদের ভালো ভালো লেখা অনুবাদ করিয়া দিলেই তো চলিত। কিন্তু এমন দেশ কোথায় আছে, যেখানে রসপিপাসু পাঠকরা শুধু বিদেশী কবিতার অনুবাদ পড়িয়াই তৃষ্ণা মিটায়।
দেশের অতীত ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির উপর দাঁড়াইয়া যাহারা সাহিত্য রচনা করেন না তাহারা শূন্যের উপর ঘর বাঁধিয়া থাকেন। দেশের অতীত সাহিত্যের বুনিয়াদের উপর সাহিত্য-শৈলী স্থাপন না করিলে নতুন সাহিত্য যে পাঠক সাধারণ হইতে বিচ্যুত হইয়া পড়িবে। পাঠক-বর্জিত সাহিত্য ধরিয়া রাখিবে কাহারা? বিদেশীর অনুকরণ করিয়া নিজের রচনার জন্য বিদেশীদের উৎসাহপূর্ণ পত্রাবলি বা সমালোচনা পাওয়া যাইতে পারে; কিন্তু তাহারা তো অপর দেশের সাহিত্যকে বাঁচাইয়া রাখিতে পারিবেন না।’ (বাংলা সাহিত্য সম্মেলন ১৯৭৪-এ সভাপতি হিসেবে জসীম উদ্দীনের বক্তব্য)। জসীম উদদীনের এই বক্তব্য কি আমাদের বোধোদয়ে নতুন অভিঘাত সঞ্চার করবে না?
জসীম উদ্দীন অন্যত্র বলেছেন, ‘আজ যে জীবনসংগ্রামে বাঙালি ক্রমেই পিছাইয়া পড়িতেছে তাহার কারণ হয়তো নিজের কৃষ্টি ও ঐতিহ্যকে বাদ দিয়া বাঙালি বিদেশীর ভাবধারা আনিয়া নিজেকে বড় করিতে চাহিয়াছিল। দেশের সাহিত্যের পূর্বসূরিদের পথ হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া বাঙালি যে সাহিত্য রচনা করিল, তাহাকে বিদেশী ও আন্তর্জাতিক বলিয়া গ্রহণ করিল না। দেশের আপামর জনসাধারণও তাহাদের নিজস্ব সম্পদ বলিয়া স্বীকার করিল না। চণ্ডিদাস, বিদ্যাপতি, গোবিন্দদাস, মুকুন্দরাম সেকালের ছাপাখানাবর্জিত দেশে যতটা লোকস্বীকৃতি পাইয়াছিলেন, একালের কয়জন আধুনিক বাঙালি লেখক ততটা জনপ্রিয়তা লাভ করিয়াছিলেন।’ (জসীম ২০০১ : ৪৫)
জসীম উদদীন কবিতায় প্রত্যয়দীপ্ত যে উচ্চারণ জারি রেখেছেন সেসবের বিশেষ কিছু অংশ পাঠকদের সাথে ভাগাভাগি করে নেয়া দরকার। কবি বলেছেন, ‘কাঁদে এই মাটি। আমি শুধু শুনি মাটিতে এ বুক পাতি/মাটির বুকের স্পন্দন শুনি, জাগিয়া দীঘল রাতি।/রামধনুরে ধরতে পারি রঙের মায়ায় ধরব না তা,/বিজলী এনে ভরতে পারি রঙের খাঁচায় আনব না তা,/পাতালপুরীর রাজকন্যা সাত মানিকের প্রদীপ জ¦ালি/ঘুম ঘুমিয়ে ঘুমের দেশে ঘুমলি স্বপন হাসছে খালি,/এ সব কথা ছড়ায় গেঁথে বলতে পারি বলব না তা,/পাখির পাখায় লিখন ভরে লিখতে পারি লিখব না তা,/লিখব আজি তাদের কথা, কথা যারা বলতে নারে,/একশো হাতে মারছে যাদের সমাজনীতি হাজার মারে।’ জসীম উদ্দীনের এসব উচ্চারণ কি বাংলার হৃদয়েরই প্রতিধ্বনি ও আত্মসত্তার রাজনীতি নির্মাণের ইশতেহার নয়, অবশ্যই। যে বাংলাকে কবি এভাবে চিত্রায়িত করেছেন। কবিতার শব্দরাজিতে অমরত্ব দিয়েছেন সেই বাংলায়-বাংলাদেশে আত্মসত্তার রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত না হওয়াও কি বেদনা ও লজ্জার নয়?
গত শতাব্দী ছিল বাঙালির জাগরণের কাল, যদিও এই সময়ের বেশ আগে থেকে শতবর্ষ ধরে বঙ্গে চলছে নবজাগরণের নবতরঙ্গ। ডেভিড ড্রামন্ড, ডিরোজিও, রাজা রামমোহন রায়, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, অক্ষয়কুমার দত্ত, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রামকৃষ্ণ পরমহংস, স্বামী বিবেকানন্দ, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখের উদ্যোগ ও প্রচেষ্টায় অবিভক্ত বাংলায় নবজাগরণের বিকাশ তখনো চলমান। ‘বঙ্গীয় নবজাগরণ’ নামে মান্যতা পাওয়া এই নবজাগরণের একটা বিশেষ দিক ছিল সনাতন ধর্মেরই পুনর্জাগরণ। যার নেতৃত্বের পুরোভাগে ছিলেন হিন্দু ও ব্রাহ্ম ধর্মের মনীষীরা। সনাতন ধর্মের নামে হিন্দু সমাজ, রাষ্ট্র ও দেশে, বিশেষত অবিভক্ত বাংলায় চেপে বসা কুসংস্কার-কুপ্রথা, উদ্ভট রীতি-নীতি, ও শাস্ত্র অননুমোদিত আচার-বিচার দূর করা ছিল এই নবজাগরণের মূল লক্ষ্য। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-কাজী নজরুল ইসলামের সৃষ্টিশীলতা ও নানামুখী প্রয়াস ও প্রচেষ্টায় বঙ্গীয় নবজাগরণ পূর্ণতা প্রাপ্তির দোরগোড়ায় তখন সেই নবজাগরণের সামনে হাজির হয় নতুন এক চ্যালেঞ্জ। অন্যদিকে, পূর্ববঙ্গের ঢাকায় শুরু হয় ঢাকার নবজাগরণ, যা বাংলাদেশের নবজাগরণ হিসেবে ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটায়।
লক্ষণীয়, বঙ্গীয় নবজাগরণের সীমাবদ্ধতা হলো, এক. শুধু হিন্দু ও ব্রাহ্ম ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল এই নবজাগরণ। দুই. এই নবজাগরণকে বঙ্গীয় নবজাগরণ বলা হলেও এই নবজাগরণের সঙ্গে পূর্ববঙ্গের তেমন কোনো সম্পর্ক ছিল না। তিন. এই নবজাগরণ মূলত কলকাতাকেন্দ্রিক এবং তার আশপাশেই সীমবদ্ধ ছিল। চার. এই নবজাগরণ অবিভক্ত বঙ্গের সকল প্রান্তের বিদ্বৎসমাজ ও সব শ্রেণিপেশার মানুষের জন্য অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমুখী ছিল না। পাঁচ. আয়তনিকভাবে অবিভক্ত বঙ্গের বড়ো একটা জনপদ পূর্ববঙ্গ, অথচ পূর্ববঙ্গকে এই নবজাগরণের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়নি। ছয়. অবিভক্ত বঙ্গের মুসলিম জনসংখ্যা তখন সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও বঙ্গীয় নবজাগরণের সঙ্গে মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। সাত. বঙ্গীয় নবজাগরণ বঙ্গের দুই প্রধান ধর্মগোষ্ঠীর মানুষের সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের আগে ও পরে আশাপ্রদ কোনো ভূমিকা পালন করতে পারেনি। আট. বঙ্গের দুই প্রধান ধর্মগোষ্ঠীর হৃদয়ের বিভাজন রোধে কোনো প্রকার দফারফা করতে পারেনি। নয়. এই নবজাগরণ জাতীয়তাবাদের স্বরূপ, বাস্তবতা ও প্রায়োগিকতা নিয়ে আশাব্যঞ্জক কোনো কিছু নির্মাণ করতে পারেনি। দশ. এই নবজাগরণ দেশভাগের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারিনি।
আমাদের বলতে দ্বিধা বা সংশয় নেই যে, রবীন্দ্রনাথ আমাদের প্রধান কবি, যিনি বিশ্বকবি হিসেবে সারা পৃথিবীতে বন্দিত। কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের স্বাধিকার-স্বাধীনতা আন্দোলন ও মুক্তি সংগ্রামের প্রিয় কবিদের অন্যতম। কিন্তু বাংলাদেশের আত্মসত্তার রাজনীতি নির্মাণের কবি হলেন জসীম উদদীন। তিনি বাংলা ভাষা ও বাঙালির সত্তাকে নিজের কবিত সত্তায় ধারণ করেছিলেন সবৈবভাবে, এক জীবনের সাধনায়। এ কারণেই দীনেশচন্দ্র সেন বলেছেন, “আমি হিন্দু, আমার কাছে বেদ পবিত্র, ভগবত পবিত্র। কিন্তু ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ পুস্তকখানি তাহার চাইতেও পবিত্র। কারণ ইহাতে আমার বাংলাদেশের মাটির মানুষগুলোর কাহিনী আছে।”
একটু ব্যক্তিগত কথা বলি প্রাসঙ্গিক কারণেই। জসীম উদ্দীন ছিলেন আমাদের বাবার প্রিয় কবি। প্রধানত উনাকেই বুঝতেন-মান্যতা দিতেন কবির প্রসঙ্গ জারি হওয়ামাত্রই। বিষয়টি বিস্ময়ের ছিল বৈকি। সেই শৈশব-কৈশোরের দিনগুলোতে দেখেছি বাড়িতে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জীবনানন্দ দাশ, কাজী নজরুল ইসলাম প্রমুখের সঙ্গে হাজির রয়েছেন জসীম উদদীনও। কোনো কোনো সন্ধ্যায় কিংবা গ্রীষ্মের দীর্ঘ দুপুরের আঁচ যখন কমে আসতো ঠিক ওই সময়। বাবা কিংবা মার প্রযতেœ বসতো পুঁথিপাঠের আসর। গল্পের বৈঠকিতে হাজির হতো চাঁদ সওদাগর, ওয়ায়েস করনি, হাতেম তাঈয়ের মতো চরিত্র বা আখ্যান।
বাবা এসবের মাঝে বিশেষভাবে নির্বাচন করেছিলেন জসীম উদদীনকে। পেছন ফিরে দেখি স্পষ্টাকারে বাবার মুখ। যেখানে উৎসারিত বয়ান হচ্ছে, কবি বলতে জসীম উদদীন, কবিতার কথায় প্রথমে হাজির ‘কবর’। বাবার লেখালেখির অভ্যাস ছিল, লিখতেন কবিতা, ছিলেন ছন্দ অনুরাগী। সেই সূত্রে মনে হয়েছিল তখন ছ্ন্দাসিক হওয়ার কারণেই বোধ হয় এরকম ‘পক্ষপাত’, ‘দুর্বলতা’। যা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও অযৌক্তিক মনে হয়নি।
কিন্তু সময় যত গড়িয়েছে, বাবার এই ‘পক্ষপাত’ বা ‘দুর্বলতা’ যে কেবলই ছান্দসিক হওয়ার কারণে নয়; সেটা খোলতাই হয়েছে আমার কাছে। আমেরিকানদের কাছে যেমন রবার্ট ফ্রস্ট, আমাদের বাবার কাছে জসীম উদদীন ছিলেন ঠিক তেমন। কেন এই প্রশ্নের উত্তর তালাশে নজর দেয়া প্রয়োজন তার জীবনপঞ্জির দিকে। পূর্বপুরুষের বসবাস ছিল জেলা নদীয়ায়। মণ্ডল আমাদের পূর্বপুরুষের পদবি। বাঙালির যেসব পদবি সবচেয়ে পুরনো সেগুলোর একটি হলো- ‘মণ্ডল’।
নদীয়া এমন একটি জনপদ, যার সভ্যতা ও সংস্কৃতি কেবল একটি জেলার মধ্যে সীমিত বা সীমাবদ্ধ নয়। বাঙালি, বাংলা, বঙ্গ তো বটেই ভারতবর্ষীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতি এবং ইতিহাস ও ঐতিহ্য অনেকাংশে নদীয়াজাত। ভৌগোলিক অবস্থানই তাকে দিয়েছে সভ্যতাগর্বী হওয়ার অপার সুযোগ ও পরিসর। কেবল প্রাচীন কিংবা মধ্যযুগের নয়, হাল আমলের নদীয়ার মানচিত্রের দিকে দৃষ্টি দিলেও অবলোকিত হয় এই বাস্তবতা।
রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জসীম উদদীনের কালে নদীয়ার একপাশে বর্ধমান, আরেকপাশে কলকাতা, অন্যপাশে ফরিদপুর। জেলাটি একাই সীমান্ত ভাগ করেছে সাতটি জেলার সাথে। এখানে তিনটি জেলা বিশেষভাবে উল্লেøখ করার কারণ বাংলা ভাষার প্রধান তিনজন কবির জন্ম হয়েছে এই তিন জনপদে। ফলে, পড়শিবিচারে তিনজন কবিই সমান মনোযোগের দাবি রাখেন। বাবা ১৯৪৭-এর দেশভাগের কালে নদীয়া থেকে কুষ্টিয়ায় গাড়েন নিজেদের বসতি। বলা প্রয়োজন ১৯৪৭-এর ১৭ আগস্ট পর্যন্ত উনারা আদিবাড়িতে থেকেই পেয়েছিলেন সেদিনের পাকিস্তান অর্থাৎ পূর্ববঙ্গের অংশ হওয়ার গর্ব ও গৌরব। কিন্তু র্যা ডক্লিফ মহোদয় যখন দ্বিতীয়বার কাঁচি চালান মানচিত্রের ওপর তখন উনাদের বসত ভিটাসহ সমস্ত কিছু পড়ে যায় ভারতের অংশে।
একজন বাঙালি মুসলমান ও তাদের পরিবারের জন্য ওই ঘটনা কতটা বেদনার, তা কেবল ওই অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে না গেলে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। আমাদের বাবা ১৭ আগস্টের পরপরই নদীয়ারই মহকুমা কুষ্টিয়ায় চলে আসেন। উনি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জীবনানন্দ দাশ, কাজী নজরুল ইসলামের মধ্যে থেকে কাউকে বেছে না নিয়ে কেন জসীম উদ্দীনকে বেছে নিলেন প্রিয় কবির তালিকায় তার কার্যকারণ নিহিত রয়েছে দেশভাগের কার্যকারণের মধ্যে-বাঙালি মুসলমানের জীবনাভিজ্ঞতার ঐতিহাসিকতায়। যে বাংলাদেশকে উনারা জ্ঞান করেছিলেন নিজেদের প্রিয় ও পবিত্র ভূমি হিসেবে, তার ছবি অঙ্কিত রয়েছে জসীম উদ্দীনের কাব্যে-রচনারাজিতে।
এ কারণে উনার জসীম উদ্দীনের প্রতি পক্ষপাত বা দুর্বলতা কেবল ছন্দ বা কাহিনীকাব্যের জন্য নয়। প্রধান কারণ কবি বাংলার মুখ এঁকেছিলেন, যে মুখ ছিল আমাদের বাবার আরাধ্য, পরমপ্রিয় এক স্বদেশপ্রিয়তা। জসীম উদ্দীনের অনন্যতা ও অনিবার্যতা এখানেই।
আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মনে করেন, সব কিছুর জন্য যোগ্যতা লাগে না, চরিত্র লাগে। চরিত্রই নির্ধারণ করে কে কী, কিরূপ অবদান রেখেছেন। এই চরিত্র হলে নিষ্ঠা, প্রেম, ধৈর্য, আন্তরিকতা, একনিষ্ঠতা ও মেধার সমন্বয়। যাকে এক কথায় বলা যেতে পারে সাধনা। বাংলাদেশ, বাংলা ভাষা ও বাঙালি জাতিসত্তাকে কাব্যে ধারণ করার মতো সাধনা জসীম উদ্দীন সারা জীবন করে গেছেন। সেই চরিত্র উনার ছিল। বাংলাদেশ রাষ্ট্রে আমাদের আত্মসত্তার রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করতে হলে জসীম উদ্দীনের কাছে আমাদের ফিরতেই হবে। কারণ, উনি ফ্রানস ফানোর ভাষায় বাংলার জন্য ‘নতুন আত্মা’ নির্মাণ করেছেন; যা পাঠানুশীলন অপরিহার্য ও অবিকল্প।



