এসএম রহমান পটিয়া-চন্দনাইশ (চট্টগ্রাম)
পবিত্র ঈদুল ফিতরের আনন্দ উপকূলের হাজার হাজার লবণ চাষি পরিবারের জন্য এই বছরও ছিল দুঃস্বপ্নের মতো। মাঠে উৎপাদিত লবণ বিক্রি করে যেখানে তারা পেটে ভাত জোগাতে পারছেন না, সেখানে নতুন জামা কাপড় কেনার স্বপ্ন দেখবেন কিভাবে? ফলে নিরানন্দেই কেটেছে তাদের রমজান ও ঈদের দিনগুলো।
কুতুবদিয়ার লেমশিখালী এলাকার ইউপি সদস্য ও লবণ চাষি ইফাজ উদ্দিন বেলাল জানান, গত বছরের তুলনায় এবার লবণের পাইকারি মূল্য আরো কম। ধোলাই-দালালি খরচ বাদ দিয়ে যেখানে প্রতি মণ লবণ বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ১৯০ টাকা, সেখানে উৎপাদন খরচই উঠে যায় গড়ে ৩০০ টাকার উপরে। কুতুবদিয়ার শতশত পরিবার লবণ চাষের সাথে জড়িত, প্রতিটি পরিবার এখন ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে ডুবে আছে।
বাঁশখালী উপজেলার ছনুয়া ইউনিয়নের লবণ চাষি মো. বেলাল ও কুতুবদিয়ার লেমশিখারির ইউপি সদস্য গিয়াস উদ্দিন জানান, ধোলাই খরচ বাদ দিয়ে এখন প্রতিমন লবণ পাইকারিতে বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা। উৎপাদন খরচের অর্ধেকের কম টাকা পেয়ে সংসারের ভাত জোগাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। ঈদ এলেও পরিবারের সদস্যদের নতুন পোশাক কিনে দেয়ার সামর্থ্য নেই তাদের।
চলতি মৌসুমের শুরু থেকেই চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার উপকূলের হাজার হাজার লবণ চাষি হতাশায় ছিলেন উৎপাদিত লবণের সঠিক মূল্য না পাওয়ায়। প্রতি মণ লবণ উৎপাদনে খরচ পড়ছে ৩০০ থেকে সাড়ে ৩০০ টাকা, আর পাইকারিতে বিক্রি হচ্ছে মাত্র ২৪০ থেকে ২৫০ টাকা (ধোলাই খরচ ছাড়া)। এতে প্রতি মণ লবণ চাষ করে চাষিদের লোকসান গুনতে হচ্ছে প্রায় ১৫০ টাকার মতো।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) লবণ প্রকল্পের জেনারেল ম্যানেজার জাফর ইকবাল ভূঁইয়া জানান, ২৩ মার্চ পর্যন্ত দেশে লবণ উৎপাদন হয়েছে ৯ লাখ ৪১ হাজার ৯৮২ মেট্রিক টন, যা গত মৌসুমের একই সময়ের চেয়ে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মেট্রিক টন কম। চলতি মৌসুমে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৭ লাখ ৩৫ হাজার মেট্রিক টন।
লবণ চাষিরা ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশের শিল্প কারখানায় ব্যবহৃত কস্টিক সোডা ও বিভিন্ন কেমিক্যাল তৈরিতে উন্নত মানের সোডিয়াম ক্লোরাইডের প্রয়োজন হয়। দেশে উৎপাদিত লবণের গুণগতমান ভালো না হওয়ায় সরকার বিদেশ থেকে সোডিয়াম সালফেট ও সোডিয়াম ক্লোরাইড আমদানির সুযোগ দিয়েছে। সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও শিল্প মালিক মিস ডিক্লারেশনের মাধ্যমে লাখ লাখ টন অতিরিক্ত লবণ আমদানি করে বাজারজাত করছেন। এতে দেশে লবণ উৎপাদন কমলেও বাজারে লবণের জোগান বেড়ে গেছে, যা চাষিদের জন্য বিপর্যয় ডেকে এনেছে।
বাঁশখালী উপজেলার ছনুয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা রেজাউল হক চৌধুরী বলেন, ‘কিছু অসাধু ব্যবসায়ী শিল্প কারখানায় ব্যবহারের সুযোগ কাজে লাগিয়ে সোডিয়াম সালফেটের আড়ালে ও অতিরিক্ত সোডিয়াম ক্লোরাইড আমদানি করে অনায়াসে বাজারজাত করছে। এ কারণে পাইকারি লবণের দাম একেবারে নিচে নেমে এসেছে। দেশীয় লবণ শিল্প টিকিয়ে রাখতে বিদেশ থেকে লবণ আমদানির ক্ষেত্রে কঠোর নজরদারি জরুরি।’
গত মৌসুমে (২০২৪-২৫) ২৬ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে লবণ উৎপাদন হয়েছিল ২২ লাখ ৫১ হাজার ৬৫১ মেট্রিক টন। চট্টগ্রামের বাঁশখালী, আনোয়ারা, পটিয়া ও কক্সবাজার জেলায় ৬৩ হাজার ১৯৮ একর জমিতে ৪১ হাজার ৩৫৫ চাষি লবণ চাষে সক্রিয় ছিলেন।
লবণ চাষিরা দীর্ঘদিন ধরে সরকারের কাছে উৎপাদিত লবণের পাইকারি মূল্য নির্ধারণ করে দেয়ার দাবি জানিয়ে এলেও তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। পাশাপাশি তারা লবণ চাষের জমির লিজ বা বর্গার মূল্য নির্ধারণেরও দাবি জানিয়েছেন তারা। লবণ নীতিমালা-২০২২-এর পূর্ণ বাস্তবায়ন ও আমদানিতে কঠোর নজরদারির মাধ্যমে না হলে উপকূলের এই লবণ চাষিরা টিকে থাকতে পারবেন না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।



