চাঞ্চল্যকর তথ্য দিচ্ছেন লে. জে. মামুন খালেদ

কর্নেল আফজাল রিমান্ডে

বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ দলের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে এক-এগারোর সময় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মুখে পড়তে হয় এবং সেসব ঘটনার বর্ণনায় বারবার এসেছে কর্নেল আফজালের নাম। বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টুকে হেনস্তা এবং জোরপূর্বক ভিডিও ধারণের অভিযোগ রয়েছে এই আফজালের বিরুদ্ধে। তা ছাড়া সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের ভাইরাল হওয়া ভিডিও ধারণ করে এই আফজাল। ব্যবসায়ী মোসাদ্দেক আলীর ওপর নির্যাতনেও জড়িত ছিলেন এই সেনা কর্মকর্তা।

এস এম মিন্টু
Printed Edition

ওয়ান ইলেভেনের আরেক কুশীলব ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে থেকে বরখাস্ত লে. কর্নেল মো: আফজাল নাছেরকে (৬১) গ্রেফতারের পর গতকাল ছয় দিনের রিমান্ডে নিয়েছে তদন্তকারী সংস্থা ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। এর আগে গত রোববার দিবাগত রাত প্রায় ৩টার দিকে রাজধানীর মিরপুর ডিওএইচএসর বাসায় অভিযান চালিয়ে আফজাল নাছেরকে গ্রেফতার করা হয়। এর আগে দুই দফায় সাবেক দুই লে. জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এবং লে. জেনারেল শেখ মামুন খালেদকে গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ। দুইজনই বর্তমানে রিমান্ডে আছেন। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে বলে জানিয়েছেন তদন্তকারীরা। তাদের জিজ্ঞাসাবাদের মধ্যেই আলোচিত এক-এগারোর সময় রাজনৈতিক ব্যক্তিদেরকে গুম, খুন ও আয়নাঘরে বন্দী রাখার অভিযোগে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল আদালতে মামলার আবেদন করা হয়েছে। ওই মামলাটির তদন্ত করবে ট্রাইব্যুনাল।

ডিবি সূত্র জানায়, সাবেক সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এবং ডিজিএফআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক শেখ মামুন খালেদকে জিজ্ঞাসাবাদের সূত্র ধরে আফজাল নাছেরকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এক-এগারোর সময় বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ দলের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনার বর্ণনায় আফজালের নাম উঠে এসেছে।

তার বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই রাজধানীর প্রগতি সরণির শাহজাদপুর বাঁশতলায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান বাহাদুর হোসেন মনির। এ ঘটনায় একই বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর গুলশান থানায় ইউনাইটেড গ্রুপের প্রধান উপদেষ্টা হাসান মাহমুদ রাজা, চেয়ারম্যান ও এমডি মঈনউদ্দিন হাসান রশিদ ও গ্রুপের কর্মকর্তা বরখাস্তকৃত লেফটেন্যান্ট কর্নেল আফজালের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হয়। মামলাটি তদন্ত করছে ডিবি পুলিশ।

ডিবি সূত্র জানায়, লে. কর্নেল মো: আফজাল নাছের ২০০৯ সালে সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত হন। তার বাবা মৃত মফজেলুর রহমান ভূঁইয়া। তিনি মিরপুরের ডিওএসএইচএসের এভিনিউ-২ এর ১২ নম্বর রোডের ৮৬৪,এ/পি নম্বর বাসায় থাকেন। তার গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীর সেনবাগের মুজিবখিল এলাকায়। তিনি ১৯৮৪ সালে চাকরিতে যোগদান করেন। ডিজিএফআইতে ২০০৬ মার্চ থেকে ২০০৮ মার্চ পর্যন্ত ছিলেন।

জানা গেছে, বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ দলের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে এক-এগারোর সময় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মুখে পড়তে হয় এবং সেসব ঘটনার বর্ণনায় বারবার এসেছে কর্নেল আফজালের নাম। বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টুকে হেনস্তা এবং জোরপূর্বক ভিডিও ধারণের অভিযোগ রয়েছে এই আফজালের বিরুদ্ধে। তা ছাড়া সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের ভাইরাল হওয়া ভিডিও ধারণ করে এই আফজাল। ব্যবসায়ী মোসাদ্দেক আলীর ওপর নির্যাতনেও জড়িত ছিলেন এই সেনা কর্মকর্তা।

এ দিকে বিএনপির একটি সূত্র জানিয়েছে, তিনি মূলত তারেক রহমানকে নির্যাতন করেছিলেন। সর্বশেষ ২০২৪ সালের এপ্রিলে খালেদা জিয়া অসুস্থ হলে ইউনাইটেড হাসপাতালের সহায়তা চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু আফজাল চিকিৎসা দেবে না বলে সরাসরি জানিয়ে দেয়।

চাঞ্চল্যকর তথ্য দিচ্ছেন লে. জে. মামুন খালেদ : ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি প্রধান) মো: শফিকুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, সাবেক লে. জেনালে মাসুদ উদ্দিন ও লে. জেনারেল মামুন খালেদও বিরুদ্ধে ১১ মামলার তথ্য রয়েছে সেগুলো নিয়ে জিজ্ঞাাসাবাদ করছি। এরই মধ্যে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে আরো ছয় দিনের রিমান্ডে আনা হয়েছে। এক-এগারের কুশীলব, আয়নাঘর নির্মাণ এবং গুম-খুন ও অতিরিক্ত ব্যালট পেপার ছাপানোর স্বীকারোক্তির বিষয়ে জানতে চাইলে ডিবি প্রধান বলেন, এই মামলা মূলত ট্রাইব্যুনাল তদন্ত করবে। এসব বিষয়ে আমরা যতটুকু জিজ্ঞাসাবাদ করেছি, তাকে তেমন আশানুরূপ তথ্য দেয়নি। তবে চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য দিয়েছে। তাদের এখনো জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তিনি বলেন, গ্রেফতার দুই শীর্ষ কর্মকর্তাকে অর্থ পাচার এবং অবৈধ ব্যবসা বানিজ্যসহ বিভিন্ন ধরনের জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী জিজ্ঞাসাবাদে বলেছেন, তিনি কোনো ব্যবসা এমনকি অবৈধ কারবারের সাথে জড়িত নন। তিনি বিদেশে গিয়ে ভিসা এনে সেই ভিসা বাংলাদেশের এজেন্টদের কাছে বিক্রি করতেন। মানবপাচারের কথাও অস্বীকার করেন। ডিবি প্রধান বলেন, আমরা মানবপাচারসহ সবগুলো মামলার বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ এবং তদন্ত করছি। মানিলন্ডারিং এবং মানবপাচারের বিষয়টির সম্পূর্ণ তথ্য পাওয়ার পর সেগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে যাচাইয়ের পর পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) কাছে মামলা তদন্তভার হস্তান্তর করব।

ডিবির একাধিক সূত্র জানায়, এক-এগারো, আয়নাঘর, গুম, খুনের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ ডিবির এখতিয়ারভুক্ত না থাকায় ওইসব ঘটনার মামলা ট্রাইব্যুনালে আবেদন করা হয়েছে। এরপর থেকে ওইসব মামলাগুলো তদন্ত করবে ট্রাইব্যুনাল।

অপর দিকে সেনাসদস্যদের অর্থআত্মসাৎ ও জলসিঁড়ির দুর্র্র্নীতির যে তথ্যগুলো পাওয়া যাচ্ছে সেগুলোর বিষয়ে জলসিঁড়ি কর্তৃপক্ষ এখনো কোনো অভিযোগ করেনি। ফলে যে মামলাগুলো আছে সেগুলো নিয়েই জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

ওই সূত্র জানায়, বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দুইজনকে মুখোমুখি করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে কিন্তু অনেক প্রশ্নেরই উত্তর মিলছে না। গ্রেফতার দুই কর্মকর্তার বিষয়ে আরো গভীর তদন্ত প্রয়োজন।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট আরেক কর্মকর্তা বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে তাদের সময় গুম, খুন ও তৈরি করা আয়নাঘরের দায় নিচ্ছে না। তারা বলছেন, এসব আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীরা করেছেন। একই সাথে তৎকালীন আওয়ামী সরকার নানা উন্নয়নের কথা উল্লেখ করে তারা সেই সরকারের গুণগান গেয়েছেন।

এ ছাড়াও বিতর্কিত সাবেক এই দুই সেনা কর্মকর্তাকে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করা হলেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। কিছু ক্ষেত্রে গোয়েন্দাদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টাও করছেন। সেনাসমর্থিত এক-এগারোর সরকার গঠন, রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিনকে পদত্যাগে বাধ্য করা, ক্ষমতাসীন দুই নেত্রী খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার, রাজনৈতিক দরকষাকষিসহ নানা প্রশ্ন করা হলেও কোনো আশানুরূপ উত্তার মিলেনি তদন্তসংশ্লিষ্টদের।

সূত্র বলছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোসহ প্রধান দু’দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতা ও শীর্ষ ব্যবসায়ীদের কেন গ্রেফতার করা হয়- এই গ্রেফতারের কোন কোন দেশের সবুজ সঙ্কেত ছিল, গ্রেফতারের অভিযান শুরুর আগে কখন কোথায় নীতিনির্ধারণী বৈঠক হয়, ওই বৈঠকে কারা ছিলেন, এমন প্রশ্নের জবাবে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী দাবি করেন, তিনি আদেশ পালন করতে গিয়ে গ্রেফতার প্রক্রিয়ার মধ্যে ছিলেন মাত্র।

মাসুদের কাছে গোয়েন্দাদের প্রশ্ন ছিল, গুরুতর অপরাধ দমনসংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটির সমন্বয়ক হিসেবে আপনার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। গ্রেফতারের আগে আপনি অনুমোদন দিতেন বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমেও খবর প্রকাশ হয়েছে। এ প্রশ্নের জবাবে অনুমোদনের বিষয়টি তিনি এড়িয়ে যান। তিনি বলেন, প্রতিটি সেক্টর ধরে পৃথক টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। তবে গ্রেফতারের সময় পুলিশ ও সেনাবাহিনী মিলে যৌথভাবে সিদ্ধান্ত নিত।

এক-এগারোর সময়কালে জরুরি অবস্থা জারির পর দুর্নীতিবিরোধী টাস্কফোর্স গঠিত হয়- এই টাস্কফোর্সের সমন্বয় করতেন আপনি। তবে দুর্নীতি দমনের নামে কোটি কোটি টাকা চাঁদাবাজি করেন আপনারা- এমন প্রশ্নের জবাবে সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘আমি সারা জীবন সৎপথে উপার্জন করে জীবন নির্বাহ করেছি।’ তবে তার এ বক্তব্য সঠিক নয় বলে মন্তব্য করেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।