ফ্রান্স প্রতিনিধি
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারের মধ্যেও শিাকে মানবাধিকার ও সাধারণ জনকল্যাণমূলক সম্পদ হিসেবে ধরে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন বিশ্বের ২৫টির বেশি দেশের শিামন্ত্রী ও শিাবিষয়ক প্রতিনিধিরা। মঙ্গলবার প্যারিসে ইউনেস্কোর সদর দফতরে আয়োজিত ‘ডিজিটাল লার্নিং উইক ২০২৬’ সম্মেলনে তারা একটি যৌথ বিবৃতি গ্রহণ করেন, যেখানে শিায় এআই ব্যবহারে জনস্বার্থ, স্বচ্ছতা ও শিক-স্বাধীনতাকে অগ্রাধিকার দেয়ার কথা বলা হয়েছে।
‘এআইয়ের যুগে শিা : তথ্য, দ্বন্দ্ব ও সম্ভাবনার নতুন সীমানা’ প্রতিপাদ্যের এই সম্মেলনে সরাসরি অংশ নেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের এক হাজার ৫০০-এর বেশি প্রতিনিধি, অনলাইনে যুক্ত হন আরো কয়েক হাজার মানুষ। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিলেন শিামন্ত্রী, উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ, প্রযুক্তি খাতের প্রতিনিধি, শিক ও শিার্থীরা।
যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ইতোমধ্যে শিার্থীদের চিন্তা করার ধরন, শিকদের পেশাগত সিদ্ধান্ত এবং শিার্থীদের শেখা মূল্যায়নের পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন আনছে। এআই শিায় প্রবেশাধিকার বাড়াতে, শিার্থীদের ব্যক্তিগত সহায়তা দিতে এবং শেখার নতুন সুযোগ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে বলে বিবৃতিতে স্বীকার করা হলেও একই সাথে সতর্ক করা হয়েছে, এআই দিয়ে মানবিক সম্পর্ক ও মানুষের বিচার-বিবেচনাকে প্রতিস্থাপন করা হলে তা শিার প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণ করবে না।
ইউনেস্কোর শিাবিষয়ক সহকারী মহাপরিচালক কুন চেন বলেন, শিায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কীভাবে যুক্ত করা হবে তা কেবল প্রযুক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়, বরং জনস্বার্থ ও জনজবাবদিহির বিষয়। তার ভাষ্যে, এ েেত্র জনস্বার্থ, সমালোচনামূলক বোঝাপড়া, শিকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা এবং সামাজিক সংহতি বজায় রাখতে হবে।
বাংলাদেশের অবস্থান
সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন শিা এবং প্রাথমিক ও গণশিা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা এএনএম এহসানুল হক মিলন। বিভিন্ন অধিবেশনে তিনি এআই যুগে শিার ভবিষ্যৎ, শিকদের ভূমিকা, মৌলিক শিা ও কারিগরি শিার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এআই ব্যবহারের যুগে পিছিয়ে থাকার সুযোগ নেই, তবে এর সুফল পেতে শিশুদের পড়ার দতা, যুক্তি প্রয়োগ ও তথ্য যাচাইয়ের সমতাসহ মৌলিক শিার ভিত্তি আরো শক্তিশালী করতে হবে। শিাপ্রতিষ্ঠানে এআই চালুর আগে শিকদের পরীামূলক ব্যবহার ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার পাশাপাশি শিক নিয়োগ, পদোন্নতি ও মূল্যায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে শুধু স্বয়ংক্রিয় এআইয়ের ওপর নির্ভর না করার আহ্বান জানান তিনি।
আট দফা অগ্রাধিকার
যৌথ বিবৃতিতে শিােেত্র কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের জন্য আটটি অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রথমত, এআই ব্যবস্থা এমনভাবে পরিচালনা করতে হবে যাতে তা পরীা-নিরীা করা যায় এবং প্রয়োজনে তথ্য এক ব্যবস্থা থেকে অন্য ব্যবস্থায় স্থানান্তর করা যায়Ñ বিনামূল্যের সেবা হোক বা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের চুক্তির মাধ্যমে পাওয়া এআই হোক, উভয়ের ওপরই জনস্বার্থভিত্তিক নজরদারি থাকতে হবে।
দ্বিতীয়ত, এআই যেন শিার্থীদের হয়ে সব চিন্তা-বিশ্লেষণ করে না দেয়, বরং তাদের যুক্তি, বিশ্লেষণ ও সমস্যা সমাধানের সমতা বাড়ায়Ñ এমন প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।
তৃতীয়ত, শিকদের প্রশিণ ও পেশাগত উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং শ্রেণিকে কোন এআই ব্যবস্থা ব্যবহার হবে তা ঠিক করার প্রক্রিয়ায় শিকদের যুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে, যাতে এআই শিকের পেশাগত জ্ঞান ও বিচার-বিবেচনার বিকল্প না হয়ে ওঠে।
চতুর্থত, শিশু ও তরুণদের েেত্র তাদের বয়স, মানসিক বিকাশ ও শিাগত প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে এআই ব্যবহারের এবং তিকর প্রমাণিত হলে তা স্থগিত বা বন্ধ করার সুযোগ রাখার কথা বলা হয়েছে।
পঞ্চমত, শিার্থী ও শিকদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ, সংরণ ও ব্যবহারে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ এবং বিশেষত শিশুদের তথ্য সুরায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
ষষ্ঠত, ভাষা, শারীরিক সমতা বা সামাজিক অবস্থানের কারণে কোনো শিার্থী যেন এআইয়ের সুবিধা থেকে বঞ্চিত না হয়, সে জন্য বহুভাষিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক এআই ব্যবস্থা তৈরির পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
সপ্তমত, এআই চালুর আগে শুধু প্রযুক্তি কেনার খরচ নয়, এর পরিচালনা, রণাবেণ ও ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি পরিবর্তনের ব্যয়ও হিসাবে নেয়ার এবং প্রয়োজনে উন্মুক্ত উৎসের প্রযুক্তি ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়েছে।
অষ্টমত, এআই পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণে প্রতিটি দেশের নিজস্ব সমতা বাড়ানো এবং আঞ্চলিক-আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জ্ঞান ভাগাভাগির মাধ্যমে কোনো দেশের শিাব্যবস্থা যেন সীমিতসংখ্যক প্রযুক্তি সরবরাহকারীর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে পড়ে, তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিবৃতিতে এআই প্রযুক্তি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকেও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। কোনো এআই ব্যবস্থা চালুর আগে তা শিার্থীদের জন্য কতটা কার্যকর, তার প্রমাণ দিতে হবে এবং এআই ব্যবহারে কোনো শিার্থী, শিক বা প্রতিষ্ঠানের তি হলে সংশ্লিষ্ট সরবরাহকারীকে জবাবদিহির আওতায় আনার ওপরও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। শিা ও প্রযুক্তিগত সমতা তুলনামূলক কম এমন দেশগুলোকে সহায়তার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে, পাশাপাশি এ বিষয়ে বৈশ্বিক আলোচনা ও নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশে ইউনেস্কোর ভূমিকা অব্যাহত রাখার কথাও বলা হয়েছে।



