উত্তপ্ত হচ্ছে ভোটের রাজনীতি

ভোটের মাঠে কথার লড়াই, মুখোমুখি বিএনপি ও জামায়াত নেতারা

Printed Edition
উত্তপ্ত হচ্ছে ভোটের রাজনীতি
উত্তপ্ত হচ্ছে ভোটের রাজনীতি

নিজস্ব প্রতিবেদক

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে দেশের ভোটের রাজনীতি ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। নির্বাচন কমিশন আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটগ্রহণের দিন নির্ধারণ করার পর গত ২২ জানুয়ারি (বৃহস্পতিবার) থেকে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হয়। এর পরপরই রাজনৈতিক মাঠে ছড়িয়ে পড়ে উত্তাপ। সভা-সমাবেশে বক্তব্য, পাল্টা বক্তব্য, অভিযোগ ও প্রতিশ্রুতির ফুলঝুড়িতে মুখর হয়ে উঠেছে নির্বাচনী পরিবেশ।

বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও নতুন রাজনৈতিক শক্তি এনসিপির শীর্ষ নেতাদের তীব্র বাক্যযুদ্ধ এক দিকে ভোটের নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ স্পষ্ট করছে, অন্য দিকে মাঠপর্যায়ে বাড়াচ্ছে উত্তেজনা ও শঙ্কা।

দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর পর দেশ একটি প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ক্ষমতাচ্যুত ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এবারের নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি হিসেবে সামনে এসেছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্র বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। সময়ের ব্যবধানে এই দুই দল এখন রাজনীতির দুই ভিন্ন মেরুতে অবস্থান করছে এবং পৃথক জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছে।

শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটযাত্রা শুরু হলেও প্রচারণার প্রথম দিন থেকেই দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে আক্রমণাত্মক রাজনৈতিক ভাষা, আদর্শগত সঙ্ঘাত এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

তারেক রহমানের বক্তব্যে শুরু কথার যুদ্ধ

প্রচারণা শুরুর প্রথম দিন বৃহস্পতিবার বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমান সিলেট, নরসিংদীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক জনসভায় বক্তব্য দেন। এসব বক্তব্যে তিনি ধর্মের নামে রাজনীতি করে মানুষকে বিভ্রান্ত করার অভিযোগ তুলে প্রতিপক্ষের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘বিএনপি কখনো বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার রাজনীতি করে না’।

তিনি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও ১৯৭১ সালে বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। একই সাথে নির্বাচনকে ঘিরে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর আশঙ্কা প্রকাশ করে পোস্টাল ব্যালট, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও মোবাইল নম্বর সংগ্রহের মাধ্যমে ভোট কারচুপির সম্ভাব্য ষড়যন্ত্রের বিষয়ে বারবার সতর্ক করেন।

জামায়াতের পাল্টা প্রতিক্রিয়া

তারেক রহমানের এসব বক্তব্যের কড়া জবাব দেয় জামায়াতে ইসলামী। শনিবার বিভিন্ন জনসভায় দলটির আমির ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ধর্মকে অবমাননা বা বিদ্রƒপ করে রাজনীতি করা অনৈতিক ও বিভাজনমূলক।

তিনি দাবি করেন, জামায়াত নৈতিকতা, সৎ নেতৃত্ব ও জবাবদিহিমূলক রাজনীতির কথা বলছে বলেই তাদের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। জামায়াত নেতারা চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন এবং বিএনপির অতীত শাসনামলের দুর্নীতি ও সহিংসতার অভিযোগ তুলে ধরেন।

একই সাথে তারা অভিযোগ করেন দেশের বিভিন্ন এলাকায় জামায়াতের নারী কর্মীদের শান্তিপূর্ণ প্রচার ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে বাধা দেয়া হচ্ছে, যা গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য উদ্বেগজনক।

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ দলটির শীর্ষ নেতারা নির্বাচনকে ‘নৈতিক ও আদর্শিক লড়াই’ হিসেবে উপস্থাপন করে বলেন, ব্যালটের মাধ্যমেই রাজনৈতিক পরিবর্তন আসবে। একই সাথে তারা বিএনপির বিরুদ্ধে ‘নব্য ফ্যাসিবাদ’, চাঁদাবাজি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ তোলেন।

নতুন শক্তি এনসিপির অবস্থান

এর মধ্যেই ভোটের রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করছে নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপি। শনিবার দলের শীর্ষ নেতা নাহিদ ইসলাম বলেন, বিএনপি ও জামায়াতের পারস্পরিক দোষারোপের রাজনীতিতে সাধারণ মানুষের বাস্তব সমস্যা আড়ালে পড়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, এনসিপি ক্ষমতায় গেলে চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক সহিংসতার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন করা হবে এবং নারীসহ সব শ্রেণীর মানুষের নিরাপদ ও সমান রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে।

নাহিদ ইসলামের ভাষায়, ‘জনগণ এবার স্লোগান নয়, কার্যকর সমাধান চায়।’

মাঠে বাড়ছে উত্তেজনা : সিলেট ও নরসিংদীর বক্তব্য ঘিরে বিতর্ক

মাঠপর্যায়ে উত্তেজনার চিত্রও ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় মিছিল ও প্রচারণাকে কেন্দ্র করে বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। বড় ধরনের সহিংসতা না ঘটলেও পরিস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রচারের শুরুতেই এমন উত্তাপ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে সামনের দিনগুলোতে বক্তব্যের সঙ্ঘাত আরো তীব্র হতে পারে।

রাজনীতিতে কথার যুদ্ধ মূলত শুরু হয় সিলেট ও নরসিংদীতে তারেক রহমানের দু’টি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে। সিলেট আলিয়া মাদরাসা মাঠে আয়োজিত জনসমাবেশে তিনি জামায়াতকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘একটি দল জান্নাতের টিকিট বিক্রি করছে।’

তিনি ১৯৭১ সালে জামায়াতের ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা করেন। নরসিংদীর জনসভায় তিনি বলেন, ‘এদের মোনাফেকি ও শিরকের কারণেই এই ভূমিকম্প।’

এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় শুক্রবার খুলনার ডুমুরিয়ায় নির্বাচনী সভায় জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও খুলনা-৫ আসনের প্রার্থী মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘আমরা ধারণা করেছিলাম, উনি লন্ডনে গেছেন, পড়াশোনা করেছেন, কিছুটা রাজনৈতিক পরিপক্বতা হয়তো আছে। কিন্তু উনি তো এখন বড় মুফতি হয়ে গেছেন। বিলেত থেকে এসে ফতোয়া দিচ্ছেন- কে মুসলমান, কে কাফির। রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও সৌজন্যের জায়গা থেকেও এসব কথা গ্রহণযোগ্য নয়।’

১৯৭১ প্রসঙ্গ টেনে পাল্টা প্রশ্ন

১৯৭১ সালের প্রসঙ্গে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, কোনো বড় রাজনৈতিক নেতার যদি এ বিষয়ে উত্তর খোঁজার প্রয়োজন হয়, তাহলে তাকে ১৯৭৯ সালে তার বাবার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, পরবর্তীতে চারদলীয় জোট গঠন এবং দীর্ঘদিন জামায়াতের সাথে একত্রে আন্দোলন ও রাজনীতি করার ইতিহাসের মধ্যেই সেই উত্তর খুঁজতে হবে।

অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে ভূমিকা রাখা একাধিক রাজনীতিবিদকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে বসানোর সিদ্ধান্ত কেন নেয়া হয়েছিল- সে প্রশ্নের উত্তরও সেখানেই নিহিত রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ভারতের সাথে চুক্তির অভিযোগ ও বিএনপির জবাব

ভোটের রাজনীতিতে বিএনপিকে ছাড়ছে না জামায়াতে ইসলামী। দলের নায়েবে আমির ডা: সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের দাবি করেন, ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত এক খবরে বলা হয়েছে- বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ভারতের সাথে তিনটি শর্তে চুক্তি করেছেন।

তার দাবি অনুযায়ী- ১. ফ্যাসিবাদের সাথে যুক্তদের পুনর্বাসন, ২. ভারতের অনুমতি ছাড়া বাংলাদেশের কোনো অস্ত্র ক্রয় না করা, ৩. ইসলামপন্থী দলগুলোকে দমন করা।

গত বৃহস্পতিবার কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে নিজ নির্বাচনী জনসভায় তিনি এসব কথা বলেন এবং অভিযোগ করেন, ওই সংবাদের কোনো প্রতিবাদ বিএনপি করেনি। তবে এর জবাবে শনিবার রাজধানীর গুলশানে বিএনপির নির্বাচনী কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র ও তারেক রহমানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন এসব অভিযোগকে ‘রাজনৈতিক অপপ্রচার’ বলে অভিহিত করেন।

তিনি বলেন, জামায়াতের একজন প্রভাবশালী নেতা ভারতের সাথে বিএনপির চুক্তির যে দাবি করেছেন, তার পক্ষে তিনি কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি এবং পারবেনও না। মিডিয়ায় এসেছে বলে যে তথ্যের কথা বলা হচ্ছে, তার ন্যূনতম কোনো বাস্তবতা নেই। এটি রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরির অপকৌশল মাত্র।