অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমলেও দ্রুতগতিতে সরকারি ঋণ বৃদ্ধি ও রাজস্ব আদায়ের তুলনামূলক দুর্বল প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন করে আর্থিক চাপ তৈরি করছে। একই সময়ে বৈদেশিক খাতের কয়েকটি সূচকে স্থিতিশীলতার লণ দেখা গেলেও সরকারি অর্থব্যবস্থায় ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ সিস্টেমিক রিস্ক রিপোর্টে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধের অর্থনীতির এ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনের পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, কর ও করবহির্ভূত রাজস্ব আদায়ের তুলনায় সরকারের ঋণ দ্রুত বাড়ায় এ সময়ে ঋণ-রাজস্ব অনুপাত আরো বেড়েছে। একই সাথে মোট সরকারি ঋণ ও মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাতও সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে।
সরকারি অর্থব্যবস্থায় এ চাপ তৈরি হলেও অনুদানসহ সামগ্রিক বাজেট ঘাটতি-জিডিপি অনুপাত সামান্য কমেছে। অর্থাৎ জিডিপির তুলনায় বাজেট ঘাটতির চাপ কিছুটা প্রশমিত হলেও রাজস্বের বিপরীতে ঋণের বোঝা বাড়তে থাকায় সরকারের আর্থিক সমতার ওপর চাপ অব্যাহত রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজস্ব আহরণের তুলনায় ঋণ সঞ্চয়ের উচ্চগতি সরকারি অর্থব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের কারণ হয়ে আছে। অন্য দিকে পর্যালোচনাকালে বাণিজ্য ভারসাম্য-জিডিপি অনুপাতের উন্নতি হয়েছে। তবে রেমিট্যান্স-জিডিপি অনুপাত সামান্য কমেছে।
এদিকে মূল্যস্ফীতির চাপ ধীরে ধীরে কমেছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একই সময়ে মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার মান সামান্য শক্তিশালী হয়েছে, যা আমদানি ব্যয়ের ওপর কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে।
ট্রেজারি বাজারেও বদল
সরকারের ঋণগ্রহণের ধরনে পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে দেশের অভ্যন্তরীণ ট্রেজারি বাজারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২ থেকে ৫ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ড ৫ থেকে ১০ বছর মেয়াদি বন্ডকে ছাড়িয়ে বাজারে সবচেয়ে বড় অংশ দখল করেছে।
অন্য দিকে অর্থবাজারের উপকরণগুলোর মধ্যে স্বল্পমেয়াদি ট্রেজারি বিলের অংশ এখনো সবচেয়ে বেশি রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেণ অনুযায়ী, সরকারের ঋণগ্রহণের গতিপ্রকৃতি ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক সমন্বয়ের কারণে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহেও সতর্কতা দেখা যাচ্ছে।
বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে ধীরগতি
বেসরকারি নন-ফাইন্যান্সিয়াল করপোরেশনগুলোর (এনএফসি) জন্য ব্যাংকঋণের প্রবৃদ্ধি আরো কমেছে। আর্থিক ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণে সতর্ক অবস্থান নেয়ায় এ প্রবণতা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
তবে নন-ব্যাংক ডিপোজিটরি করপোরেশনগুলোর (এনবিডিসি) েেত্র ঋণপ্রবাহে সামান্য পুনরুদ্ধার দেখা গেছে। এর আগে এ খাতে ঋণপ্রবাহ প্রায় স্থবির অবস্থায় ছিল।
ব্যাংকে তারল্য স্বস্তিদায়ক, চাপ অর্থায়ন কোম্পানিতে
বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর তারল্য পরিস্থিতি সামগ্রিকভাবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত মানদণ্ডের তুলনায় স্বস্তিদায়ক রয়েছে। ব্যাংকগুলোর লিকুইডিটি কভারেজ রেশিও (এলসিআর) এবং নেট স্টেবল ফান্ডিং রেশিও (এনএসএফআর) উভয়ই নিয়ন্ত্রক ন্যূনতম সীমার বেশ ওপরে রয়েছে।
তবে নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোর পরিস্থিতি তুলনামূলক দুর্বল। দুর্বল নিট সুদ আয় এবং অন্যান্য চাপের কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক মুনাফা নেতিবাচক পর্যায়ে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ঝুঁকি মূল্যায়নে অর্থনীতিতে এক দিকে মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক খাতের কিছু সূচকে স্বস্তির লণ, অন্য দিকে সরকারি ঋণ, রাজস্ব সমতা, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ এবং নন-ব্যাংক আর্থিক খাতের দুর্বলতার মতো ঝুঁকি পাশাপাশি থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে।


