যেমন ছিল জুলাই আন্দোলন

রিপোর্টারের ডায়েরি

আযাদ আলাউদ্দীন, বরিশাল ব্যুরো
Printed Edition

বরিশালে ফিরে দেখা জুলাই ২০২৪

২০২৪ সালে ছাত্রদের প্রাণের দাবি কোটাবিরোধী আন্দোলন কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। একপর্যায়ে তা ফ্যাসিবাদী সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নিবে, তা প্রথম দিকে অনুধাবন করা যায়নি। ১ জুলাই থেকে চলমান আন্দোলনের ঢেউ পর্যায়ক্রমে রাজধানী ঢাকা থেকে বরিশাল বিভাগেও আসতে থাকে।

২৪-এর আন্দোলনে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিএম কলেজে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির নেপথ্যের শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। রাজনৈতিক আদর্শের বিভাজন মাথায় না রেখে শিক্ষার্থীরা তখন ঐক্যবদ্ধভাবে রাস্তায় নেমে আসে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনের সাথে যুগপৎ আন্দোলনের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে বরিশালেও চলতে থাকে একের পর এক কর্মসূচি। দিনে বিক্ষোভ ও রাতে মশাল মিছিলে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আন্দোলন অব্যাহত থাকে। বিএম কলেজের শিক্ষার্থীরা নগরীর নথুল্লাবাদ বাসস্ট্যান্ডে অবস্থান নিলে বরিশালের সাথে সারা দেশের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অন্য দিকে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কুয়াকাটা-বরিশাল সড়ক অবরোধ করলে পটুয়াখালী-কুয়াকাটা ও বরগুনার সব উপজেলার যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।

এমন উত্তাল সময়ে ১৬ জুলাই রংপুরে আবু সাঈদের শহীদ হওয়ার খবর ও ভিডিও গণমাধ্যমে আসার পর কেঁপে ওঠে বিশ্ববিবেক। একই দিন চট্টগ্রামের রাজপথে মিছিল চলাকালে ছাত্রলীগের গুলিতে শহীদ হন বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার রহমতপুর ইউনিয়নের ফয়সাল আহমেদ শান্ত। বরিশাল জেলার মোট ৩০ জন শহীদের মধ্যে তিনিই ছিলেন প্রথম। শান্তর লাশ বরিশালে গ্রামের বাড়িতে আনতে গিয়েও পদে পদে বাধার সম্মুখীন হয়েছেন শহীদের স্বজনরা। সেদিন রহমতপুরের মানিককাঠি বাজারে শহীদ ফয়সাল আহমেদ শান্তর নামাজে জানাজায় কয়েক হাজার ছাত্র-জনতা অংশ নেন। তার নামাজে জানাজায়ও বিভিন্ন রকম প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেন রহমতপুর ইউনিয়নের তৎকালীন চেয়ারম্যান ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আক্তারুজ্জামান মিলন। অবশেষে জনতার প্রতিরোধের মুখে পিছু হটেন মিলন ও তার সহযোগীরা।

১৬ জুলাই বরিশাল বিএম কলেজ ক্যাম্পাস ছাত্রলীগমুক্ত করে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনের তীব্রতায় ক্যাম্পাসের পেছন গেট দিয়ে পালিয়ে যায় ছাত্রলীগ।

১৮ জুলাই কেন্দ্র নির্দেশিত দিনব্যাপী ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচিতে সকালেই শিক্ষার্থীরা বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের গ্রাউন্ড ফ্লোরে একত্রিত হতে থাকে। ক্যাম্পাসের গেটগুলোর বাইরে পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ও এবিপিএনের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। তারা শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসের বাইরে রাস্তায় নামতে দিচ্ছিল না। একপর্যায়ে মসজিদের মাইকে ছাত্ররা সহযোগিতা চাইলে আশপাশের এলাকাবাসীও রাস্তায় নেমে আসেন। এ কারণে শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসীর কাছে পরাজয় স্বীকার করে পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাবসহ সব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। তারা হাত উঁচু করে আত্মসমর্পণ করে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ত্যাগ করতে বাধ্য হয়।

১ আগস্ট বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-শিক্ষক সংহতি সমাবেশ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রবল বৃষ্টি ও বৈরী পরিবেশের কারণে অল্প শিক্ষার্থীর উপস্থিতির সুযোগ নিয়ে বন্দর থানার পুলিশ আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১২ জনকে আটক করে নিয়ে যায়। পরে আন্দোলনের তীব্রতায় আটক ছাত্রদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় পুলিশ।

৩, ৪ ও ৫ আগস্ট বরিশালের সর্বস্তরের বিক্ষুব্ধ হাজার হাজার ছাত্র-জনতা বরিশাল নগরীর নথুল্লাবাদ থেকে চৌমাথা পর্যন্ত সড়ক অবরোধ করে রাখেন। এসব এলাকায় পুলিশ-বিজিবি ও ছাত্রলীগ-যুবলীগ যৌথভাবে নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালায়, শত শত শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ হয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। নগরীর চৌমাথা এলাকায় আওয়ামী লীগ নেতা টুটুল চৌধুরী নিজের পিস্তল দিয়ে ছাত্রদের ওপর গুলি চালান। তবে একপর্যায়ে তার গুলি শেষ হয়ে গেলে- নিরস্ত্র ছাত্রদের গণপিটুনিতে তিনি মারা যান।

৫ আগস্ট বেলা ২টার দিকে শেখ হাসিনার পলায়নের মধ্য দিয়ে আওয়ামী ফ্যাসিবাদের পতন হয়। বাঁধভাঙা উল্লাসে সারা দেশের মতো বরিশালের রাস্তায়ও নেমে আসে লাখো ছাত্র-জনতা।

জুলাই আন্দোলনে বরিশালে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে গণমাধ্যম কর্মীদের মধ্যে বেশ কয়েকজন আহত হন। উল্লেখযোগ্য আহতরা হলেন- যুগান্তরের ফটো সাংবাদিক শামীম আহমেদ, যমুনা টিভির ক্যামেরাপারসন হৃদয়, নিউনেশনের রাতুল ও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় দৈনিক সংগ্রামের প্রতিনিধি আবু উবাইদা, এই চারজন আন্দোলনের মাঠে সরাসরি আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে শামীম আহমেদ এখনো অসুস্থ থাকায় পেশাগত কাজে ফিরতে পারেননি।

জুলাই আন্দোলনে বরিশাল বিভাগের দেড়শতাধিক ছাত্র-জনতা শহীদ হন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি শহীদের সংখ্যা ভোলা জেলায়। সরকারি হিসাব অনুযায়ী ভোলা জেলায় শহীদের সংখ্যা ৪৮ জন। বরিশাল জেলার ৩০ জন শহীদসহ পুরো বরিশাল বিভাগে আহতের সংখ্যা দুই হাজারেরও বেশি। ২৪-এর শহীদদের স্মরণে প্রতিটি জেলায় ‘জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ’ নির্মাণ করা হয়েছে, বরিশালেও গত বছরের ৫ আগস্ট স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধনের করা হয়েছে।