কারাবিধিতে নেই, শুধুমাত্র মানবিক কারণ বিবেচনায় কারাবন্দী বাগেরহাট জেলার সদর উপজেলার সাবেক ছাত্রলীগ সভাপতি জুয়েল হাসান সাদ্দামকে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের গেটের সামনে এনে তার নিহত স্ত্রী এবং একমাত্র সন্তানকে শেষ সাক্ষাৎ করিয়ে দেয়া হয়েছে। এই ঘটনায় কারা কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে কোনো ধরনের অবহেলা ছিল না।
গতকাল রোববার সকালে কারা অধিদফতরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক সাদ্দামের বিষয়ে এসব তথ্য জানিয়ে নয়া দিগন্তকে বলেন, তাকে প্যারোলে মুক্তি দেয়ার কোনো ধরনের লিখিত আবেদন কারা কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছেনি। স্থানীয় প্রশাসন এ বিষয়ে আরো ভালো বলতে পারবে।
ওই কারা কর্মকর্তা বলেন, আমরা বাগেরহাট কারাগার এবং যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সাথে সাদ্দামের বিষয়ে কথা বলেছি। তারা জানিয়েছেন, এক মহিলা তার বাচ্চাকে (সন্তান) মেরে ফেলছে। এক পর্যায়ে ওই মহিলা নিজেও আত্মহত্যা করেন। ওই মহিলার স্বামী সরকার নিষিদ্ধ সাবেক ছাত্রলীগের নেতা সাদ্দামকে আদালতের নির্দেশে বাগেরহাট কারাগারে পাঠানো হয়। সেখান থেকে তাকে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তর করা হয়।
সাদ্দামের প্যারোলে মুক্তি দেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, নিহত মহিলা এবং শিশু সন্তানকে শেষবারের মতো সাক্ষাৎ করানোর জন্য আমাদের কাছে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্যারোলে মুক্তির বিষয়ে কোনো আবেদন দেয়া হয়নি এবং আমরাও পাইনি। গত শুক্রবার রাতে সাদ্দামের স্ত্রী এবং সন্তান মারা যান। তাদের আত্মীয়স্বজন অ্যাম্বুলেন্সে লাশ নিয়ে কারাগারের গেটের সামনে আসে। জেলকোডে সাক্ষাতের কোনো সুযোগ নেই। শুধুমাত্র আমরা মানবিক কারণ বিবেচনায় নিয়ে কারাগার থেকে সাদ্দামকে বের করে নিহত স্ত্রী-সন্তানকে দেখা করিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করি। এর বাইরে আমাদের আর কিছুই করার ছিল না।
স্বজনদের কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, সাদ্দামের সাথে তার মৃত স্ত্রী-সন্তানকে দেখা করানো যেমন মানবিক বিষয় ছিল তেমনি স্ত্রী-সন্তানের মৃত্যুর নেপথ্যে অন্য কিছু লুকিয়ে রয়েছে কি-না সেটিও তদন্ত সংশ্লিষ্টদের গভীরভাবে খতিয়ে দেখা উচিত।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য
এদিকে গতকাল রোববার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রেস বিবৃতিতে বলা হয়েছে, স্ত্রী ও সন্তানের মৃত্যুতে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক বন্দী জুয়েল হাসান সাদ্দামের প্যারোলে মুক্তির বিষয়ে তার পরিবারের পক্ষ থেকে যশোর জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কিংবা যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার কর্তৃপক্ষ বরাবর কোনো আবেদন করা হয়নি।
সাদ্দামের পরিবারের মৌখিক অভিপ্রায় অনুযায়ী যশোর জেলগেটে স্ত্রী ও সন্তানের লাশ দেখানোর সিদ্ধান্ত হয়। মানবিক দিক বিবেচনা করে এ বিষয়ে যশোর জেলা প্রশাসন ও যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হয়েছে।
বিবৃতিতে আরো বলা হয়, এ ঘটনায় বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় যশোর জেলা প্রশাসক বা যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার কর্তৃপক্ষ বরাবর প্যারোলে মুক্তির আবেদন করা হয়েছে মর্মে প্রকাশিত সংবাদটি সঠিক নয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আশা করে, বিভিন্ন গণমাধ্যম সঠিক ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে জনগণের তথ্য পাওয়ার অধিকার সমুন্নত রাখবে।
প্যারোলের আবেদন না করে লাশ নিয়ে যশোর কারাগারে
বাগেরহাট প্রতিনিধি জানান, যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের ফটকে মাত্র পাঁচ মিনিট স্ত্রী ও সন্তানের মরদেহ দেখার সুযোগ পেলেন নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা জুয়েল হাসান সাদ্দাম। স্ত্রী ও সন্তানের মৃত্যুর পরও প্যারোলের মুক্তির কেউ আবেদন না করে লাশ নিয়ে আত্মীয়রা যান যশোর কারাগারে। খবর পেয়ে বাগেরহাট পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হাসান চৌধুরী ও জেলা প্রশাসক গোলাম মো: বাতেন সার্বিক সহযোগিতা করেন। তাদের সহায়তায় যশোর জেলা প্রশাসক আশেক হাসান ও যশোর কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মো: আসিফ উদ্দিন আবেদন না করার পরও মানবিক দিক বিবেচনা করে লাশসহ জেলখানায় যাওয়া ছাত্রলীগ নেতা সাদ্দামের স্ত্রী ও সন্তানের লাশ দেখানোর ব্যবস্থা করেন। বাগেরহাট পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হাসান চৌধুরী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
শনিবার (২৪ জানুয়ারি ) রাত ১১টার দিকে বাগেরহাট সদর উপজেলার সাবেকডাঙ্গা গ্রামে জানাজা শেষে কানিজ সুবর্ণা স্বর্ণালী (২২) ও তার ৯ মাস বয়সী শিশু সন্তান নাজিমকে পাশাপাশি কবরে দাফন করা হয়।
সাদ্দামের শ্বশুর জাতীয় পার্টি নেতা মো: রুহুল আমিন জানান, সন্ধ্যা ৭টার দিকে লাশ নিয়ে কারাগারে পৌঁছানো হয়। সাথে দুটি মাইক্রোবাসে করে ১২ থেকে ১৫ জন স্বজন ছিলেন। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্স কারাগারের ভেতরে প্রবেশ করে এবং অল্প সময় পর আবার বাইরে বের করে দেয়া হয়। সময়ের কথা বিবেচনা করে নিয়ম অনুযায়ী কোনো আবেদন করতে পারেনি। কিন্তু কারা কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের মহানুভবতাকে তিনি প্রশংসা করেছেন।
শুক্রবার দুপুরে বাগেরহাট সদর উপজেলার সাবেকডাঙ্গা গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে কানিজ সুবর্ণা স্বর্ণালীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। একই স্থান থেকে উদ্ধার করা হয় তার ৯ মাস বয়সী শিশু সন্তান নাজিমের লাশ।
কানিজ সুবর্ণার বাবা বাগেরহাট জেলা জাতীয় পার্টির নেতা মো: রুহুল আমিন ও স্থানীয়রা ধারণা করছেন সুবর্ণা তার সন্তানকে পানিতে ডুবিয়ে হত্যা করে নিজেই আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিল। অবশ্য এর আগে আদালতের মাধ্যমে টুঙ্গিপাড়া থানায় সুবর্ণা তার স্বামী ছাত্রলীগ সদর উপজেলার সভাপতি সাদ্দামের নামে একটি যৌতুক মামলা করেন। যার নম্বর ৩১৭/২৫। এই মামলায়ও সাদ্দামের নামে একটি গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে পুলিশের কাছে।
পুলিশ জানায়, সুবর্ণা স্বর্ণালীকে ঘরের সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায় এবং শিশুটির মরদেহ মেঝে থেকে উদ্ধার করা হয়।
নিহত নারীর স্বামী জুয়েল হাসান সাদ্দাম নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের বাগেরহাট সদর উপজেলা শাখার সভাপতি।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গোপালগঞ্জ থেকে গ্রেফতার হন তিনি।
বর্তমানে একাধিক মামলায় যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী রয়েছেন। সাদ্দাম তৎকালীন সরকারি দলের লোক ও এমপির কাছের লোক হিসেবে তার নির্যাতনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বেড়ে গেছিল। আর তার পরিবার সেই নির্যাতিত লোকদের কারণে আইনশৃঙ্খলার অবনতির কথা বিবেচনা করে প্রকৃতপক্ষে তাকে কারাগার থেকে প্যারোলে মুক্তিতে এলাকায় আনতে চাননি বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তার পরিবারের এক সদস্য জানান।



