- অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাসহ সব দায়িত্ব থাকছে বাহিনীর কাঁধে
- সব বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে গঠিত হবে ইউনিট
দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরো উন্নত করার লক্ষ্যে এলিট ফোর্স র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)’ নামে একটি নতুন বিশেষায়িত বাহিনী গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬’ শিরোনামে একটি খসড়া বিল ইতোমধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে জনসাধারণের মতামতের জন্য প্রকাশ করা হয়েছে। মূলত র্যাবের বিদ্যমান কাঠামোকে আইনি ভিত্তি দিয়ে বাংলাদেশ পুলিশের অধীনে এই নতুন ইউনিটটি গঠন করা হবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, খসড়াটি চূড়ান্ত হওয়ার পর বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মতামত নিয়ে মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে। সেখানে অনুমোদন হওয়ার পর আইনে পরিণত করতে তোলা হবে জাতীয় সংসদে। নতুন আইন কার্যকর হলে র্যাব-সংক্রান্ত বিদ্যমান আইনি ভিত্তি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তবে নতুন বিধিমালা না হওয়া পর্যন্ত আগের কিছু বিধান কার্যকর থাকবে।
খসড়া আইন অনুযায়ী, এসআরবি হবে বাংলাদেশ পুলিশের একটি বিশেষায়িত ইউনিট। এই বাহিনীর নেতৃত্বে থাকবেন অতিরিক্ত আইজিপি পদমর্যাদার একজন মহাপরিচালক। বাহিনীর প্রধান কার্যালয় বা সদর দফতর থাকবে ঢাকায়। তবে প্রয়োজনে সরকারের পূর্বানুমতি নিয়ে দেশের যেকোনো স্থানে এর শাখা বা ইউনিট স্থাপন করা যাবে। বাহিনীর সাংগঠনিক বিন্যাসে ব্যাটালিয়ন, কোম্পানি, প্লাটুন ও সেকশন থাকবে। শুধু পুলিশ বাহিনী নয়; বরং সশস্ত্রবাহিনীসহ অন্যান্য শৃঙ্খলা বাহিনী থেকেও প্রেষণে সদস্য নিয়োগের মাধ্যমে এই ইউনিট গঠিত হবে। প্রতিরক্ষা কর্মবিভাগের কোনো সদস্যকেও নির্ধারিত শর্তাধীনে এই ইউনিটে নিযুক্ত করা যাবে। প্রস্তাবিত আইনে প্রেষণে নিয়োগের মেয়াদ ন্যূনতম দুই বছর রাখার কথা বলা হয়েছে। নতুন এই বাহিনীর জন্য আলাদা প্রতীক (লোগো), পতাকা ও পোশাক থাকবে।
খসড়া আইনে এসআরবিকে ব্যাপক দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে : দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষা ও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ। বেআইনি অস্ত্র, গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক উদ্ধার। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ ও সাইবার অপরাধ দমন। মানবপাচার ও সঙ্ঘবদ্ধ অপরাধ দমন। সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলা এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলাবাহিনীকে সহায়তা প্রদান। আদালত, সরকার বা পুলিশ আইজিপির নির্দেশে মামলা দায়ের ও তদন্ত পরিচালনা।
অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসরণ করে এই বাহিনীর সদস্যরা তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেফতার করতে পারবেন। তদন্ত পরিচালনার দায়িত্ব থাকবে কমপক্ষে সাব-ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের ওপর। তদন্তকাজে সহায়তার জন্য এই ইউনিটের নিজস্ব হাজতখানা, মালখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ থাকবে।
র্যাবের বিরুদ্ধে অতীতে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এসআরবিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে একটি শক্তিশালী ‘অভিযোগ প্রতিকার কমিটি’ গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। এই কমিটির সভাপতি হবেন এসআরবির একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালক। সদস্য হিসেবে থাকবেন- স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, পুলিশ সদর দফতরের প্রতিনিধি, পরিচালক (লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া) এবং মানবাধিকার বা আইন বিষয়ে ১০ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সরকার মনোনীত একজন ব্যক্তি। এই কমিটি নাগরিকদের যেকোনো অভিযোগ তদন্ত করতে পারবে এবং সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সুপারিশ করবে।
খসড়া আইনে বাহিনীর সদস্যদের আচরণের বিষয়ে কঠোর বিধান রাখা হয়েছে। কর্তব্যরত অবস্থায় মাদকাসক্ত হওয়া, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার আদেশ অমান্য করা, ঘুষ গ্রহণ, বেআইনি অর্থ আদায়, সরকারি সম্পদের অপব্যবহার কিংবা অপরাধীকে পালিয়ে যেতে সহায়তা করার মতো অপরাধের জন্য বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। যদি কোনো সদস্য অপরাধ করে পালিয়ে যান, তবে তাকে গ্রেফতারের জন্য পরোয়ানা জারির বিশেষ পদ্ধতিও আইনে উল্লেখ রয়েছে।
নতুন আইন কার্যকর হওয়ার সাথে সাথে র্যাবের বর্তমান সব সম্পদ, জনবল, তহবিল, দায়দায়িত্ব, চলমান মামলা এবং প্রশাসনিক চুক্তিগুলো সরাসরি এসআরবির অধীনে স্থানান্তরিত হবে। নতুন বিধিমালা না হওয়া পর্যন্ত আগের কিছু আইনি বিধান প্রয়োজনীয় সংস্কারসহ বহাল থাকবে।
বিশ্লেষকদের মতে, নাম ও কাঠামো পরিবর্তনের পাশাপাশি ‘অভিযোগ প্রতিকার কমিটি’ এবং সুনির্দিষ্ট শৃঙ্খলা বিধি যুক্ত করার মাধ্যমে সরকার এই বাহিনীকে আরো দায়বদ্ধ করার চেষ্টা করছে। তবে গ্রেফতার ও তদন্তের মতো মৌলিক ক্ষমতাগুলো আগের মতোই বহাল রাখা হয়েছে।



