বাকৃবি প্রতিনিধি
রান্নার সময় তাপের প্রভাবে গোশত বা মাছের ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড পুরোপুরি নষ্ট হয় না; বরং সঠিক পদ্ধতিতে রান্না করলে এর অধিকাংশ পুষ্টিগুণ অক্ষুণœ থাকে। তবে রান্না করা খাবার দীর্ঘক্ষণ ফেলে রাখা বা বারবার গরম করলে অক্সিডেশন প্রক্রিয়া সক্রিয় হয়ে ওমেগা-৩-এর ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে। ওমেগা-৩ হলো একধরনের অপরিহার্য পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি এসিড, যা মানবদেহ নিজে তৈরি করতে পারে না। এটি শরীরের কোষের কার্যকারিতা বজায় রাখতে, হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে এবং মস্তিষ্ক ও চোখের সঠিক গঠনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষক অধ্যাপক ড. মো: শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘উচ্চ তাপমাত্রা এবং বাতাসের প্রভাবে ওমেগা-৩ কিছুটা প্রভাবিত হয়, তবে সম্পূর্ণ নষ্ট হয় না। সাধারণ রান্নার তাপমাত্রা ওমেগা-৩-এর তাপীয় স্থিতিশীলতার সীমার মধ্যেই থাকে। ফলে এর মূল কাঠামো বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অক্ষত থাকে।’
তিনি আরো বলেন, ‘গোশতের ভেতরে থাকা অন্যান্য চর্বি ও প্রোটিন ওমেগা-৩-এর জন্য একটি প্রাকৃতিক সুরক্ষা স্তর তৈরি করে। একই সাথে ভিটামিন-ই-সহ বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট জারণ প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয়, ফলে পুষ্টির ক্ষয় সীমিত থাকে।’
তবে গভীর তেলে ভাজা, দীর্ঘক্ষণ বারবিকিউ বা অত্যধিক উচ্চ তাপে রান্নার ক্ষেত্রে অক্সিডেশন দ্রুত ঘটে এবং চর্বি গলে বেরিয়ে যাওয়ার কারণে ওমেগা-৩-এর ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে যায়।
গবেষণার তথ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, মাছ বা গোশত মাঝারি আঁচে রান্না করলে ওমেগা-৩-এর পরিমাণ কিছুটা কমলেও তা উল্লেখযোগ্য নয়; বরং স্টিমিং বা ফয়েলে মোড়ানো অবস্থায় বেক করলে অনেক ক্ষেত্রে ওমেগা-৩ আরো ভালোভাবে সংরক্ষিত থাকে। অন্য দিকে ডিপ ফ্রাই পদ্ধতিতে এই উপকারী ফ্যাটি এসিডের ৭০ থেকে ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত নষ্ট হতে পারে।
অধ্যাপক শফিকুল ইসলামের মতে, মাছের ক্ষেত্রে ওমেগা-৩ সংরক্ষণ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সামুদ্রিক ও তৈলাক্ত মাছ ডোকোসাহেক্সাএনোয়িক এসিড (ডিএইচএ) ও ইকোসাপেন্টাএনোয়িক এসিড (ইপিএ) সমৃদ্ধ উৎস। এসব উপাদান হৃদরোগ প্রতিরোধ, মস্তিষ্কের বিকাশ এবং প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তিনি বলেন, ‘রান্নার পর যে ঝোল বা তরল অংশ থাকে, তা ফেলে না দিয়ে খাবারের সাথে গ্রহণ করা উচিত। কারণ কিছু পুষ্টি উপাদান ওই তরলে থেকে যায়।’
রান্নার সময় রসুন, পেঁয়াজ, আদা, হলুদ ও লবঙ্গের মতো উপাদান অক্সিডেশন কমাতে সহায়তা করে এবং ওমেগা-৩-এর স্থায়িত্ব বাড়ায়।
রান্নার পর খাবার সংরক্ষণ ও পুনরায় গরম করার বিষয়ে ড. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘রান্না করা গোশত বা মাছ দীর্ঘক্ষণ ফেলে রাখলে অক্সিডেশন আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে।
বারবার গরম করলে ওমেগা-৩-এর ক্ষতি অনেক বেড়ে যায়। তাই তাজা রান্না করা খাবার দ্রুত খাওয়াই উত্তম।’ তিনি আরো জানান, ঘরে ব্যবহৃত তেলের ক্ষেত্রেও সচেতনতা জরুরি। একই তেল বারবার ব্যবহার করা কিংবা অতিরিক্ত উচ্চ তাপে সয়াবিন ও সূর্যমুখী তেল ব্যবহার করলে জারণের হার বাড়তে পারে। তুলনামূলকভাবে মাঝারি তাপে অলিভ অয়েল বা নারকেল তেল বেশি স্থিতিশীল। পরামর্শ হলো, সপ্তাহে অন্তত দুইবার ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ মাছ খাওয়া উচিত।
অধ্যাপক ড. মো: শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘রান্নাকে ভয়ের বিষয় হিসেবে না দেখে বৈজ্ঞানিকভাবে পরিচালনা করা উচিত। কম তাপমাত্রা, কম সময় এবং উপযুক্ত রান্নার পদ্ধতি বেছে নিলে খাবারের পুষ্টিগুণ অনেকাংশে বজায় রাখা সম্ভব।’



