আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজধানী ঢাকার ‘হৃৎপিণ্ড’ হিসেবে পরিচিত ঢাকা-৮ আসনটি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক গুরুত্বের কারণে সর্বমহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। মতিঝিল, পল্টন, শাহবাগ ও রমনার মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকা নিয়ে গঠিত এই আসনে ১১ দলীয় জোট ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মনোনীত প্রার্থী মুহাম্মদ নাসীরুদ্দিন পাটোয়ারী তার নির্বাচনী প্রচারণায় ভিন্নধর্মী এক পরিবর্তনের ডাক দিয়েছেন।
সরকারি দাফতরিক কেন্দ্র, প্রধান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং দেশের আর্থিক রাজধানীর সমন্বয়ে গঠিত এই আসনটিকে তিনি নিছক একটি নির্বাচনী এলাকা নয় বরং ‘বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি’ হিসেবে দেখছেন। এই আসনকে নিরাপদ ও আন্তর্জাতিক মানের স্মার্ট হাব প্রতিষ্ঠায় কাজ করবেন বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তিনি। নয়া দিগন্তের সাথে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি তার নির্বাচনী ইশতেহার, মতিঝিলকে আন্তর্জাতিক হাবে রূপান্তর, স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার এবং প্রচারণায় হামলার ঘটনা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেছেন। স্বাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন নয়া দিগন্তের নিজস্ব প্রতিবেদক হারুন ইসলাম।
নয়া দিগন্ত : ঢাকা-৮ আসনটি প্রশাসনিক ও রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত হাই-প্রোফাইল একটি এলাকা। এই আসন থেকে প্রার্থী হওয়ার পেছনে আপনার মূল উদ্দেশ্য কী?
নাসীরুদ্দিন পাটোয়ারী : দেখুন, ঢাকা-৮ আসনটি বাংলাদেশের অন্য যেকোনো আসনের চেয়ে আলাদা। এটি একাধারে দেশের প্রশাসনিক সদর দফতর, শিক্ষার আঁতুড়ঘর এবং অর্থনীতির চালিকাশক্তি। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, এই ভিআইপি তকমা থাকা সত্ত্বেও এখানকার সাধারণ বাসিন্দারা নিরাপদ ও বাসযোগ্য পরিবেশ থেকে বঞ্চিত। আমার প্রার্থী হওয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো, গ্রামের মানুষ যেমন একে-অপরের বিপদে পাশে দাঁড়ায়, ঠিক তেমনই এই যান্ত্রিক শহরে একটি মানবিক ও সেবামুখী সমাজ গড়ে তোলা। এখানে সচিবালয় আছে, কিন্তু নাগরিক সেবা পেতে মানুষকে জুতা ক্ষয় করতে হয়। এখানে বড় বড় ব্যাংক আছে, কিন্তু সাধারণ ব্যবসায়ীরা নিরাপদ বোধ করেন না। দীর্ঘদিন ধরে এ আসনে বিভিন্ন রকমের চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি চলে আসছে। আমরা নতুন প্রজন্ম এই ধারাকে থামাতে চাই। আমি চাই, ঢাকা-৮ হবে এমন একটি মডেল আসন, যেখানে প্রশাসনিক সংস্কার, ডিজিটাল সেবা এবং নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। আমার ভিশন হলো ‘নিরাপদ, সেবামুখী ও বাসযোগ্য ঢাকা-৮’।
নয়া দিগন্ত : এই আসনের প্রধান সমস্যাগুলো কী কী এবং নির্বাচিত হলে সেগুলো সমাধানে আপনার রোডম্যাপ কী হবে?
নাসীরুদ্দিন পাটোয়ারী : ঢাকা-৮-এর সমস্যাগুলো বহুমাত্রিক। আমি প্রধানত তিনটি স্তরে সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত করেছি নাগরিক সুবিধা, নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক জটিলতা। প্রথমত, গ্যাস ও পানির লাইনে সংযোগ থাকলেও অনেক এলাকায় নিয়মিত সরবরাহ নেই। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় চরম উদাসীনতা লক্ষ করা যায়, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি। নির্বাচিত হলে স্থানীয় সরকারকে সাথে নিয়ে এই মৌলিক পরিষেবাগুলো নিশ্চিত করাই হবে আমার প্রথম কাজ। দ্বিতীয়ত. জানজট ও ধুলাবালু এই এলাকার নিত্যসঙ্গী। আমরা ট্রাফিক ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং পরিবেশবান্ধব নগরী গড়তে চাই। তৃতীয়ত এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সরকারি সেবায় হয়রানি বন্ধ করা। যেহেতু এটি সরকারি অফিসের কেন্দ্র, তাই ডিজিটালাইজেশন ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে সেবা খাতকে ‘নাগরিকবান্ধব’ করাই আমার অঙ্গীকার।
নয়া দিগন্ত : আপনি বারবার ‘নিরাপত্তা’র কথা বলছেন। ঢাকা শহরে নিরাপত্তার বিষয়টি আপনি কিভাবে দেখছেন?
নাসীরুদ্দিন পাটোয়ারী : নিরাপত্তাকে আমি শুধু নির্বাচনী বুলি বা ইস্যু হিসেবে দেখি না, এটি একটি মৌলিক মানবাধিকার। আমার নির্বাচনী ইশতেহারের শীর্ষ অঙ্গীকার হলো ‘নিরাপদ ঢাকা-৮’। বর্তমানে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, কিশোর গ্যাং এবং মাদকের প্রকোপে সাধারণ মানুষ তটস্থ। আমি এমন একটি ঢাকা-৮ চাই, যেখানে একজন নারী গভীর রাতেও নির্বিঘেœ ও কোনো ভয় ছাড়া চলাফেরা করতে পারবেন। এজন্য আমরা আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বা ‘টেক-ড্রাইভড’ নিরাপত্তাব্যবস্থা চালু করব। সিসি ক্যামেরা ও স্মার্ট মনিটরিংয়ের মাধ্যমে অপরাধীদের শনাক্ত করা হবে এবং মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হবে। নিরাপত্তাহীন সমাজে উন্নয়ন টেকসই হয় না, তাই এটিই আমার অগ্রাধিকার।
নয়া দিগন্ত : এর আগে আপনি মতিঝিলকে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক জোন হিসেবে প্রতিষ্ঠার কথা বলেছিলেন।
নাসীরুদ্দিন পাটোয়ারী : অবশ্যই। মতিঝিল শুধু ঢাকার নয়, পুরো বাংলাদেশের অর্থনীতির হৃৎস্পন্দন। কিন্তু অব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনার অভাবে এটি তার পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারছে না। আমার পরিকল্পনা হলো মতিঝিলকে একটি ‘আন্তর্জাতিক মানের ফাইন্যান্সিয়াল হাব’-এ রূপান্তর করা। ব্যাংকিং ও করপোরেট খাতে স্বচ্ছতা আনা এবং শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। আমি নির্বাচিত হলে, এখানে এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করব যাতে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ বাড়ে। এ ছাড়া ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা এবং যারা গোডাউনভিত্তিক ব্যবসার সাথে জড়িত, তাদের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো সমাধান করে একটি নিরাপদ ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করব।
নয়া দিগন্ত : এই আসনে দেশের শীর্ষ হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অবস্থিত। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা নিয়ে আপনার ভাবনা কী?
নাসীরুদ্দিন পাটোয়ারী : ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ দেশের সেরা চিকিৎসাকেন্দ্রগুলো এই আসনেই। কিন্তু প্রতিদিন হাজার হাজার রোগীর চাপে এখানকার ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়। আমি হাসপাতালকেন্দ্রিক ব্যবস্থাপনাকে আরো মানবিক, সুশৃঙ্খল ও রোগীবান্ধব করতে চাই। দালালের দৌরাত্ম্য কমিয়ে সেবার মান বাড়ানো হবে। অন্য দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েটের মতো প্রতিষ্ঠান এখানে থাকায় এটি দেশের ‘মেধা তৈরির কারখানা’। কিন্তু দুঃখজনক হলো, পাস করার পর শিক্ষার্থীরা বেকার থাকছে। আমার লক্ষ্য- শিক্ষার সাথে শিল্পের সংযোগ ঘটানো। ছাত্রাবস্থাতেই শিক্ষার্থীরা যেন দক্ষতা অর্জন করতে পারে, সেই ব্যবস্থা আমরা করব।
নয়া দিগন্ত : সম্প্রতি প্রচারণার সময় আপনার ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে আপনার মন্তব্য কী?
নাসীরুদ্দিন পাটোয়ারী : দেখুন, গত ২৭ জানুয়ারি হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজের সামনে আমার ওপর ডিম নিক্ষেপ ও হেনস্তার যে ঘটনা ঘটেছে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক ও কাপুরুষোচিত। আমরা এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছি এবং নির্বাচন কমিশনের কাছে সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছি। তবে আমি পরিষ্কার করে বলতে চাই- সহিংসতা কোনো সমাধান নয়। আমার দল ও আমি বিশ্বাস করি, প্রতিপক্ষের উসকানি বা হামলার জবাব সহিংসতা দিয়ে হয় না। আমরা আমাদের শান্তিপূর্ণ প্রচারণা অব্যাহত রেখেছি। নির্বাচন একটি গণতান্ত্রিক উৎসব, এখানে পেশিশক্তি নয়, জনমতই শেষ কথা। আমরা নির্বাচন কমিশনকে বলেছি, ভোটার ও প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তাদের দায়িত্ব। আমরা চাই জনগণ নির্ভয়ে ভোট কেন্দ্রে আসুক।
নয়া দিগন্ত : প্রতিপক্ষ হিসেবে বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাসসহ হেভিওয়েট প্রার্থীরা আছেন। নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে আপনি কতটা আশাবাদী?
নাসীরুদ্দিন পাটোয়ারী : ঢাকা ৮-এর ভোটাররা অত্যন্ত সচেতন। তারা অতীতে অনেক বড় বড় নাম ও প্রতিশ্রুতি শুনেছেন, কিন্তু ভাগ্যের পরিবর্তন দেখেননি। মির্জা আব্বাস সাহেব বা অন্য যারা আছেন, তাদের প্রতি সম্মান রেখেই বলছি- মানুষ এখন পরিবর্তন চায়। মানুষ আর পুরনো ধারার রাজনীতি চায় না, তারা চায় সংস্কার ও জবাবদিহিতা। গত কয়েক দিনে প্রচারণায় নেমে আমি সাধারণ মানুষের যে ভালোবাসা ও সাড়া পেয়েছি, তা অভাবনীয়। মানুষ জুলুম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে এবং ইনসাফ বা ন্যায়ের পক্ষে রায় দেয়ার জন্য মুখিয়ে আছে। ১১ দলীয় জোট জনগণের কথা বলছে, তাই আমার বিশ্বাস; আগামী নির্বাচনে ঢাকা-০৮-এর জনগণ আমাকেই তাদের সেবক হিসেবে বেছে নেবে। ইনশাআল্লাহ, বিজয় আমাদেরই হবে।
এই আসনে নাসীরুদ্দিন পাটোয়ারী (এনসিপি) ছাড়াও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, বাসদের এ এইচ এম রাফিকুজ্জামান আকন্দ, জাসদের এ এফ এম ইসমাইল চৌধুরী, ইসলামী আন্দোলনের কেফায়েত উল্লা এবং গণঅধিকার পরিষদের মেঘনা আলমসহ মোট ১১ জন প্রার্থী রয়েছেন। এ আসনের সাধারণ জনগণ মনে করছে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী মির্জা আব্বাসের সাথে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতে পারে নাসিরুদ্দীন পাটোয়ারীর।



