বিশেষ সংবাদদাতা
র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করে বাংলাদেশ পুলিশের অধীনে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ (এসআরবি) নামে নতুন একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের উদ্যোগ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। এ লক্ষ্যে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬’-এর খসড়ায় নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা।
গতকাল সোমবার (১৭ আগস্ট) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে খসড়াটি অনুমোদন করা হয়। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের ভেটিং সাপেক্ষে খসড়াটি চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে।
প্রস্তাবিত আইনে র্যাবকে বিলুপ্ত করে তার পরিবর্তে বাংলাদেশ পুলিশের আওতায় এসআরবি প্রতিষ্ঠার বিধান রাখা হয়েছে। অর্থাৎ এটি সম্পূর্ণ নতুন কোনো বাহিনী না হয়ে মূলত র্যাবের স্থলে পুলিশের কাঠামোর মধ্যে একটি বিশেষায়িত ইউনিট হিসেবে কাজ করবে।
র্যাবের জনবল-সম্পদ যাবে এসআরবিতে
খসড়া আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো র্যাব বিলুপ্তির পর এর জনবল, আদেশ, ক্ষমতা, কর্তৃত্ব, সুযোগ-সুবিধা, তহবিল, সম্পত্তি, হিসাব, রেকর্ড এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সম্পদ এসআরবির কাছে স্থানান্তরের বিধান। ফলে র্যাবের সাংগঠনিক অবকাঠামোর বড় একটি অংশ নতুন ইউনিটের মাধ্যমে কার্যকর থাকার সুযোগ তৈরি হবে।
নতুন বিধিমালা প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত র্যাব-সংক্রান্ত বিভাগীয় কার্যধারার বিদ্যমান বিধিমালা প্রয়োজনীয় অভিযোজনসহ বহাল রাখার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এর ফলে র্যাব বিলুপ্তির পর প্রশাসনিক ও বিভাগীয় কার্যক্রমে যাতে তাৎক্ষণিক শূন্যতা তৈরি না হয়, সে ব্যবস্থাও আইনের খসড়ায় রাখা হয়েছে।
অতিরিক্ত আইজিপি পদমর্যাদার মহাপরিচালক
এর আগে প্রকাশিত খসড়া আইনের তথ্য অনুযায়ী, এসআরবি হবে বাংলাদেশ পুলিশের একটি বিশেষায়িত ইউনিট। এর সদর দফতর থাকবে ঢাকায়। সরকারের অনুমোদন সাপেক্ষে দেশের অন্যান্য স্থানেও ইউনিট স্থাপন করা যাবে।
এসআরবির প্রধান হিসেবে অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত আইজিপি) পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তাকে মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
শুধু পুলিশ বাহিনীর সদস্য নয়, অন্যান্য শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থেকেও সদস্যদের প্রেষণে এনে এসআরবি গঠন করা যাবে। সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী নির্ধারিত শর্তে প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদেরও প্রেষণ বা অস্থায়ী সংযুক্তির সুযোগ রাখা হয়েছে। প্রেষণে নিয়োগের মেয়াদ ন্যূনতম দুই বছর করার প্রস্তাব রয়েছে।
সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন
প্রস্তাবিত এসআরবির দায়িত্বের পরিধি ব্যাপক রাখা হয়েছে। এর মধ্যে সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ, সংঘবদ্ধ অপরাধ, মাদক, অবৈধ অস্ত্র, বিস্ফোরক এবং অন্যান্য গুরুতর অপরাধ দমন ও তদন্ত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এ ছাড়া আদালত, সরকার অথবা পুলিশ মহাপরিদর্শকের নির্দেশে বিশেষ ধরনের মামলা পরিচালনা ও তদন্তের দায়িত্বও এসআরবিকে দেয়া যেতে পারে।
খসড়া অনুযায়ী, নির্ধারিত আইন ও বিধিমালার আওতায় এসআরবির সদস্যরা অস্ত্র বহন, তল্লাশি, জব্দ এবং গ্রেফতারের ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন। ইউনিটটির নিজস্ব হেফাজতখানা, মালখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ স্থাপনের বিধানও রাখা হয়েছে। অপরাধ তদন্ত ও বিচার-সংক্রান্ত কোনো বিষয়ে বিশেষ বিধান না থাকলে প্রচলিত ফৌজদারি কার্যবিধির বিধান প্রযোজ্য হবে।
অভিযোগ প্রতিকারে বহুপক্ষীয় কমিটি
রথ্যাবের বিরুদ্ধে অতীতে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে নতুন ইউনিটের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে আইনের খসড়ায় একটি বহুপক্ষীয় অভিযোগ প্রতিকার কমিটির বিধান রাখা হয়েছে।
এই কমিটি নাগরিকদের অভিযোগ এবং এসআরবির সদস্যদের অভ্যন্তরীণ অভিযোগ বা সংক্ষোভ নিষ্পত্তিতে ভূমিকা রাখবে। কমিটি প্রয়োজনে পৃথক অনুসন্ধান দল গঠন করতে পারবে এবং অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করতে পারবে।
প্রকাশিত খসড়ার তথ্য অনুযায়ী, কমিটিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, পুলিশ সদর দফতরের কর্মকর্তা, এসআরবির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং মানবাধিকার ও আইন-বিচার প্রশাসনে অভিজ্ঞ একজন সরকার মনোনীত ব্যক্তিকে রাখার প্রস্তাব রয়েছে।
ইউনিটের কার্যক্রমে অবৈধ বা অযাচিত প্রভাব, হয়রানি, অনিয়ম, পদায়ন-পদোন্নতি কিংবা বিভাগীয় শাস্তিসংক্রান্ত অভিযোগও কমিটি পর্যালোচনা করতে পারবে। তদন্তে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিধিবহির্ভূত প্রভাবের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করার সুযোগও রাখা হয়েছে।
এসআরবির কোনো সদস্য শৃঙ্খলা ভঙ্গ বা অন্য কোনো ফৌজদারি অপরাধ করে পলাতক হলে তাকে গ্রেফতারের জন্য বিশেষ প্রক্রিয়ার প্রস্তাব রয়েছে। প্রকাশিত খসড়া অনুযায়ী, ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে লিখিতভাবে অনুরোধ করতে পারবেন। ওই অনুরোধকে ম্যাজিস্ট্রেটের জারি করা পরোয়ানার সমতুল্য ধরে পলাতক সদস্যকে গ্রেফতার করে সংশ্লিষ্ট ব্যাটালিয়নে সোপর্দ করার বিধান রাখা হয়েছে।
নাম বদল, কাঠামোয় বড় পরিবর্তন
র্যাব প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘ সময় ধরে এটি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবলায় বিশেষায়িত বাহিনী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছে। নতুন আইনের মাধ্যমে সেই কাঠামোর পরিবর্তে পুলিশ বাহিনীর আওতায় এসআরবি প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে।
তবে প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় র্যাবের জনবল, সম্পদ, তহবিল, রেকর্ড ও অন্যান্য অবকাঠামো এসআরবিতে স্থানান্তরের বিধান থাকায় এটি কেবল নাম পরিবর্তন নাকি কাঠামোগত পুনর্গঠন, তা নিয়ে ভবিষ্যতে আলোচনা তৈরি হতে পারে। একইসাথে নতুন অভিযোগ প্রতিকার কমিটি ও পৃথক শৃঙ্খলা-জবাবদিহি কাঠামো যুক্ত হওয়ায় সরকারের পক্ষ থেকে জবাবদিহির নতুন কাঠামো তৈরির প্রচেষ্টাও স্পষ্ট হচ্ছে।
খসড়া আইনে এসআরবির সদস্যদের জন্য পৃথক শৃঙ্খলা ও আচরণবিধির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। দায়িত্বে অবহেলা, অসদাচরণ কিংবা আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার বিধান প্রস্তাব করা হয়েছে।
মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর এখন লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের ভেটিংসহ পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। এরপর বিলটি জাতীয় সংসদে উত্থাপনের প্রক্রিয়া এগোবে।
সরকারের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার বিশেষায়িত বাহিনীর কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। একইসাথে র্যাবের কার্যক্রম, জনবল ও সম্পদের ধারাবাহিকতা কিভাবে এসআরবিতে রূপান্তরিত হয় এবং নতুন ইউনিটের জবাবদিহি ও মানবাধিকার সুরক্ষার কাঠামো বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়- সেটিই হবে পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।



