দেশের ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) গতকাল এক নির্দেশনা দিয়েছে। এতে তফসিলি ব্যাংকগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা জারি করা হয়েছে। নির্দেশনায় নৈতিকতা, সুশাসন, ঋণ শৃঙ্খলা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের দুর্বলতা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠায় এই উদ্যোগকে সময়োপযোগী ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ব্যাংকের চেয়ারম্যান, পরিচালক, ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের নৈতিক আচরণ নিশ্চিত করতে হবে। এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের একটি নির্দিষ্ট অঙ্গীকারনামায় সই করতে হবে এবং তা অফিসের দৃশ্যমান স্থানে প্রদর্শনের ব্যবস্থা নিতে হবে। এর মাধ্যমে ব্যাংকের কার্যক্রমে দায়বদ্ধতা দৃশ্যমান হবে এবং গ্রাহক ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা বাড়বে। একই সাথে এটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে একটি ইতিবাচক ও দায়িত্বশীল কর্মসংস্কৃতি গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।
মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে নির্দেশনায় বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ব্যাংকগুলোকে সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত, সময় মতো রিপোর্ট এবং গ্রাহক যাচাইকরণ প্রক্রিয়া (কেওয়াইসি) কঠোরভাবে অনুসরণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এতে অবৈধ অর্থ লেনদেনের ঝুঁকি কমবে এবং আর্থিক খাত আরো নিরাপদ হবে। বিএফআইইউ মনে করে, এই পদক্ষেপগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে দুর্নীতি ও অর্থপাচারের মতো অপরাধ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
এ ছাড়া নির্দেশনায় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদারে গুরুত্বারোপ করে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় আধুনিক পদ্ধতি অনুসরণ, কার্যকর তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং অনিয়ম শনাক্তে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার কথা বলা হয়েছে। বিশেষ করে ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, অনিয়মিত ঋণ প্রদান বন্ধ করা এবং খেলাপি ঋণ কমানোর জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর জোর দেয়া হয়েছে। এর ফলে ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা বাড়বে এবং অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
নির্দেশনায় নগদ লেনদেন কমিয়ে ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক লেনদেন বাড়াতে জোর দিয়ে নগদ লেনদেনকে তুলনামূলকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ডিজিটাল লেনদেন বাড়ালে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সহজ হয় এবং লেনদেনের ট্র্যাকিং কার্যক্রম আরো কার্যকর হয়। ফলে আর্থিক অপরাধ প্রতিরোধে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
নির্দেশনায় বিএফআইইউ ব্যাংকগুলোকে নৈতিকতা ও সচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন পোস্টার, বিজ্ঞপ্তি এবং প্রচারমূলক উপকরণ অফিসে প্রদর্শনের নির্দেশ দিয়েছে। এসব বার্তায় ঘুষ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, আইন মেনে চলার গুরুত্ব এবং সন্দেহজনক লেনদেন রিপোর্ট করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে। এর মাধ্যমে কর্মীদের মধ্যে সততা ও দায়িত্ববোধ জোরদার হবে এবং একটি শক্তিশালী নৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নির্দেশনাগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা অনেকাংশে কমে আসবে। তবে এর সফলতা অনেকাংশেই নির্ভর করবে ব্যাংকগুলোর আন্তরিকতা, দক্ষ তদারকি ব্যবস্থা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর প্রয়োগের ওপর। কেবল নির্দেশনা জারি করলেই হবে না, এর যথাযথ বাস্তবায়ন ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীন বিএফআইইউর এই উদ্যোগ দেশের ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, আর্থিক অপরাধ প্রতিরোধ এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এটি বাস্তবায়িত হলে শুধু ব্যাংকিং খাত নয়, সামগ্রিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ও আস্থার পরিবেশও উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হবে।



