খেতে বসে এখনো অজান্তেই তানহাকে ডাকেন মা

হাবিবুল বাশার
Printed Edition
খেতে বসে এখনো অজান্তেই তানহাকে ডাকেন মা
খেতে বসে এখনো অজান্তেই তানহাকে ডাকেন মা

‘তানহা, খেতে আয়’ ডাকটি এখনো অজান্তেই বেরিয়ে আসে মা আছমা আক্তারের মুখে। কয়েক মুহূর্ত পরই বাস্তবতা তাকে স্তব্ধ করে দেয়। মনে পড়ে, যে মেয়েকে তিনি ডাকছেন, সে আর কোনো দিন সাড়া দেবে না। ঘরের এক কোণে এখনো যতœ করে রাখা আছে মেয়ের দেয়া শেষ উপহার কয়েকটি শুকিয়ে যাওয়া ফুল। ফুলগুলো দেখলেই চোখ ভিজে ওঠে তার। মায়ের ভাষায়, ফুল শুকিয়ে গেলেও মেয়ের স্মৃতি শুকায়নি। পরিবারের একমাত্র দাবি, মেহেরুন নেছা তানহার মৃত্যুর ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের বিচার।

রাজধানীর মিরপুর-১৩-এর পূর্ব বাইশটেকি এলাকার একটি সাধারণ পরিবারের মেয়ে ছিলেন মেহেরুন নেছা তানহা। পরিবারের স্বপ্ন ছিল, অনার্স শেষ করে চাকরি করবেন তিনি, সংসারের দায়িত্বে বাবা-মাকে সহায়তা করবেন, পরে ধুমধাম করে বিয়ে দেয়া হবে। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সন্ধ্যায় ঘরের ভেতরে জানালা ভেদ করে আসা একটি গুলিতে থেমে যায় সেই স্বপ্ন। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, সেদিন বিকেলে বিজয় মিছিল থেকে বাসায় ফিরে মায়ের হাতে কয়েকটি ফুল তুলে দেন তানহা। এক গ্লাস পানি পান করে পড়ার টেবিলের সামনে দাঁড়ানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই বাইরে থেকে ছুটে আসা একটি গুলি তার বুকে বিদ্ধ হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই নিভে যায় ২২ বছরের একটি জীবনের আলো।

মেহেরুন নেছা তানহা মিরপুরের হজরত শাহ আলী মহিলা কলেজের অনার্স তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। বাবা মোশাররফ হোসেন একজন গাড়িচালক। মাসে প্রায় ১৬ হাজার টাকা আয়ে চার সদস্যের সংসার চালানো কঠিন হওয়ায় পড়াশোনার পাশাপাশি একটি শোরুমে কাজ করতেন তানহা। নিজের পড়াশোনার ব্যয় মেটানোর পাশাপাশি সংসারেও আর্থিক সহায়তা করতেন তিনি।

মা আছমা আক্তার বলেন, আমার আশা ছিল, মেয়েটা পড়াশোনা শেষ করে ভালো চাকরি করবে। তারপর ভালো একটি পরিবার দেখে বিয়ে দেবো। এক মুহূর্তে সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেল।

পরিবারের ভাষ্য, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শুরুতে তানহা খুব বেশি সক্রিয় ছিলেন না। তবে ১৯ জুলাই তার মামাতো ভাই আকরাম খান রাব্বি নিহত হওয়ার পর তিনি আন্দোলনের প্রতি আরো সম্পৃক্ত হয়ে ওঠেন। বাবা মোশাররফ হোসেন বলেন, রাব্বি মারা যাওয়ার পর ও প্ল্যাকার্ডে লিখত ‘আমার ভাইয়ের রক্ত বৃথা যেতে দেব না।’ আমি অনেক বুঝিয়েছি, আন্দোলনে যেতে নিষেধ করেছি। কিন্তু ও বলত, ভাই শহীদ হয়েছে, ঘরে বসে থাকা যাবে না।

৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তানহা ছোট ভাই আব্দুর রহমান তারিফকে নিয়ে বিজয় মিছিলে অংশ নেন। গণভবনসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে সন্ধ্যা সোয়া ৭টার দিকে বাসায় ফেরেন। ফেরার সময় মায়ের জন্য কয়েকটি ফুল নিয়ে আসেন।

সেদিনের স্মৃতিচারণ করে আছমা আক্তার বলেন, বাসায় এসে বলল, মা, তোমার জন্য গণভবন থেকে ফুল এনেছি। এক গ্লাস পানি দাও। পানি খেয়ে চুল আঁচড়িয়ে পড়ার টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। ওই সময় বাইরে গোলাগুলির শব্দ শোনা যাচ্ছিল। ছোট ছেলেকে দ্রুত বাসায় ফিরতে ফোন করছিলেন তিনি। কথা শেষ হওয়ার আগেই জানালা ভেদ করে একটি গুলি এসে তানহার বুকে লাগে। আমি তাকিয়ে দেখি, পুরো মেঝে রক্তে ভেসে যাচ্ছে. বলেন তিনি।

ফোন পেয়ে নিচতলা থেকে দৌড়ে বাসায় ওঠেন বাবা মোশাররফ হোসেন। তিনি বলেন, ‘দেখি আমার মেয়ে মেঝেতে পড়ে আছে। শরীর থেকে রক্ত বের হচ্ছে। আমি ‘মা, মা’ বলে ডাকছি, পানি খাওয়ানোর চেষ্টা করছি। কিন্তু আর কোনো সাড়া পাইনি। হাসপাতালে নেয়ার পর চিকিৎসক জানান, ও আর বেঁচে নেই।’

ওই দিন রাত পৌনে ৮টার দিকে তানহা মারা যান। পূর্ব বাইশটেকি কবরস্থানে তানহাকে দাফন করা হয়।

মেয়ের দেয়া ফুলগুলো এখনো ফেলে দিতে পারেননি আছমা আক্তার। সেগুলোই এখন তার সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতি। তিনি বলেন, ‘এখনো অনেক সময় খেতে বসে বলে ফেলি, তানহা, খেতে আয়। তারপরই মনে হয়, ও তো আর আসবে না। আগে বেতন পেলেই বলত, মা, তোমার কী লাগবে?’ এখন আর কেউ সে কথা বলে না।’

এত সময় পেরিয়ে গেলেও ঘটনার বিচার না হওয়ায় হতাশ পরিবার। তাদের দাবি, নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মাধ্যমে তানহার মৃত্যুর জন্য দায়ীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।

আছমা আক্তার বলেন, ‘আমার মেয়ের শরীরে যে গুলি লেগেছে, সেই আলামত থেকেই দায়ীদের শনাক্ত করা সম্ভব। সুষ্ঠু তদন্ত হলে কার গুলিতে আমার মেয়ে মারা গেছে, তা বের করা কঠিন নয়। একজন মা হিসেবে আমি শুধু আমার সন্তানের হত্যার বিচার চাই।’

পরিবারের সদস্যদের প্রত্যাশা, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার সত্য উদ্ঘাটন করে দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো পরিবারকে এমন শোকের ভার বহন করতে না হয়।