নিজস্ব প্রতিবেদক
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রধান আসামি রাহুল ওরফে ফয়সাল করিম মাসুদ এবং তার সহযোগী আলমগীর হোসেনকে গ্রেফতার করেছে পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ। গতকাল রোববার পশ্চিমবঙ্গ পলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্সের (এসটিএফ) একটি দল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বনগাঁও সীমান্ত এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করে।
দেশের কয়েকটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সাথে কথা হলে তারা দুই আসামিকে গ্রেফতারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর পল্টন এলাকায় মোটরসাইকেলে আসা হেলমেট পরিহিত দুর্বৃত্তরা ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হাদির মাথায় গুলি করলে তিনি গুরুতর আহত হন। তদন্তকারীদের মতে, হামলাকারীদের মধ্যে একজনকে ফয়সাল করিম মাসুদ হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার তাকে গ্রেফতারে সহায়তার জন্য ৫০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছে। এর আগে ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ফয়সাল করিম মাসুদ, তার কোম্পানি অ্যাপল সফট আইটি লিমিটেড এবং তার পরিবারের সদস্যদের সব ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে।’
হাদিকে গুলি করার ঘটনার তদন্ত আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো চালিয়ে যাচ্ছে, আর আর্থিক গোয়েন্দা কর্তৃপক্ষ এই মামলার সাথে সম্পর্কিত সম্ভাব্য আর্থিক যোগসূত্র এবং লেনদেন পরীক্ষা করছে। এর আগে হাদি হত্যার ঘটনায় থানায় মামলা করেন ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের। মামলাটি তদন্ত করে ৬ জানুয়ারি ১৭ আসামির বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছিল ডিএমপির গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। মামলার বাদি ১৫ জানুয়ারি ডিবির অভিযোগপত্রের বিষয়ে আদালতে নারাজি আবেদন দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে সেদিন আদালত মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য সিআইডিকে নির্দেশ দেন এবং প্রতিবেদন দাখিল করতে বলেন। তবে এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময় ষষ্ঠবার পিছিয়েছে।
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি ডিজিএফআইর নবনিযুক্ত মহাপরিচালক ভারত সফর করেন। তিনি এই সময় ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে হাদী হত্যা মামলার আসামিসহ সব সন্ত্রাসীদের আটক করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর জন্য চাপ দিয়েছেন। সেই প্রেক্ষাপটে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ সুস্পষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে উক্ত দুই খুনের আসামিকে আটক করতে সক্ষম হয়। এ ছাড়া বাংলাদেশের আহ্বানের পরিপ্রেক্ষিতে ভারতে বসে বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণাকারীদের বিরুদ্ধেও সাঁড়াশি অভিযান চালাবে বলে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ নিশ্চয়তা দিয়েছেন।
হাদি ও জুলাই শহীদদের স্মরণে শাহবাগে ইনকিলাব মঞ্চের গণইফতার
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি জানায়, শহীদ ওসমান হাদি ও জুলাই শহীদদের স্মরণে ইনকিলাব মঞ্চের উদ্যোগে গণইফতার ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল রোববার রাজধানীর শাহবাগের শহীদ হাদি চত্বরে এ গণইফতার ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।
ইফতার মাহফিল শেষে একই স্থানে নামাজ আদায় করা হয়। পরে ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মীরা একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। মিছিলটি শাহবাগ মোড় থেকে শুরু হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে গিয়ে শেষ হয়।
মিছিল শেষে টিএসসির সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে একটি সংক্ষিপ্ত সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আব্দুল্লাহ আল জবাব বলেন, শহীদ ওসমান হাদি হত্যার পেছনে যারা রয়েছে, তাদের দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। তারা যদি ভারতে বা অন্য কোথাও গিয়ে থাকে, তাহলে তাদেরকে বাংলাদেশে এনে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।
আব্দুল্লাহ আল জবাব বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষকে সামান্য মনে করবেন না। বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘ ১৭ বছর ভোট দিতে পারেনি। এই দীর্ঘ সময়ে তারা গুম, খুন ও হত্যার শিকার হয়েছে। আপনাদের দলের অসংখ্য নেতাকর্মী ঢাকা শহরে এসে রিকশা পর্যন্ত চালিয়েছে। সেই দিনগুলো ভুলে যাবেন না।’ তিনি অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অফিস খুলে দেয়া হচ্ছে এবং কিছু এমপি সেই অফিস উদ্বোধন করছেন। এরপরও যদি বলা হয় আওয়ামী লীগের নির্বাচনে কোনো হাত নেই, সেটা আমরা বিশ্বাস করি না। আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, ভবিষ্যতে কোনো অফিস খোলা হলে জনগণ গিয়ে সেই অফিস ভেঙে দেবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের নামে অসংখ্য মামলা হয়েছে। ৬ তারিখেও আমাদের নামে মামলা করা হয়েছে, হামলা করা হয়েছে। যে পুলিশ বাস থেকে যাত্রীদের নামিয়ে দিয়েছে, সেই পুলিশকে কি বরখাস্ত করা হয়েছে? করা হয়নি।’
তিনি অভিযোগ করেন, ‘যে পুলিশ জুলাইয়ে আমার ভাইদের হত্যা করেছে, আমাদের বোনদের বুকে গুলি চালিয়েছে, সেই পুলিশ দিয়েই বাংলাদেশে আরেকটি পুলিশি রাষ্ট্র কায়েম করার চেষ্টা করা হচ্ছে।’
সমাবেশে তিনি বলেন, ‘আমাদের ১৪০০ জন শহীদ হয়েছেন। আগামী দিনে যদি আমাদের আরো জীবন দিতে হয়, বাংলাদেশের জন্য আমরা সেই ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত। বাংলাদেশকে কোনোভাবেই ভারতের দাস হতে দেয়া হবে না। আমরা কোনো মার্কিন আধিপত্যও বাংলাদেশে চলতে দেবো না।’ তিনি আরো বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতেই আমরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াব। কোনো রাষ্ট্র সহযোগিতা করতে পারে, কিন্তু আধিপত্যবাদ আমরা মেনে নেবো না, সে ভারত হোক বা আমেরিকা।



