লড়াইটি ছিল হ্যারি কেন এবং আর্লিং হলান্ডের মধ্যে। কে গোল করবেন। কার গোল দল জিততে। চলে যাবে সেমিতে। নরওয়ের জন্য যা হবে প্রথম। আর ইংল্যান্ডের জন্য পুরনো বিষয়। হ্যারি কেনের ওপর ইংলিশদের আর আর্লিং হলান্ডে নির্ভর ছিল নওরোজিয়ান। তবে পরশু রাতে যুক্তরাষ্ট্রের মিয়ামিতে লাইম লাইটে আসতে পারলেন না এই দুই স্ট্রাইকারের কেউ-ই। দুইজনের কেউ-ই পেলেন না গোলও। তাদের টপকে ম্যাচের নায়ক জুড বেলিংহাম। এই ইংলিশ অ্যাটাকিং মিডফিল্ডারের জোড়া গোলেই এবারের বিশ্বকাপের তৃতীয় দল হিসেবে সেমিফাইনালে গেছে ইংল্যান্ড। নরওয়েকে ২-১ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপে হাত ছোঁয়ানো থেকে দুই ম্যাচ দূরে টমাস টুখেলের দল। অন্য দিকে ইতিহাস গড়া হলো না নরওয়ের। কোয়ার্টারে হেরেই বিদায় নিতে হলো স্ক্যান্ডেনেভিয়ান দেশটিকে। ফাইনালে উঠার লড়াইয়ে আটালান্টায় ইংল্যান্ডের প্রতিপক্ষ এখন আর্জেন্টিনা।
দুই দলের আগের লড়াইয়ের পরিসংখ্যানে এগিয়ে ছিল ইংল্যান্ডই। ১২ ম্যাচের সাতটিতে জিতেছিল ১৯৬৬ সালের চ্যাম্পিয়নরা। আর নওরয়ের জয় ছিল দু’টি। বাকি তিন ম্যাচ ড্র। এর পরও মিয়ামির হার্ডরক স্টেডিয়ামে নরওয়ে তুমুল লড়াই করবে, জয় তুলে নেবে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে- এমনটা প্রত্যাশা ছিল অনেকেরই। কারণ তাদের দলে আছে গোলমেশিন হিসেবে খ্যাতি পাওয়া ম্যানচেস্টার সিটির স্ট্রাইকার আর্লিং হলান্ড। এই ফরোয়ার্ডের নামের পাশে চলমান বিশ্বকাপে যে এই ম্যাচের আগে জমা পড়েছে সাত গোল। অথচ প্রমিয়ার লিগের এই গোল মেশিনখ্যাত দীর্ঘদেহী খেলোয়াড়টি এই ম্যাচে নিজেকে চেনাতেই পারলেন না। তাকে যেমন বল দিতে পারেনি সতীর্থ মিডফিল্ডাররা, তেমনি নিজেও ছোটাছুটি করে যে বল আদায় করে পোস্টে শট নেবেন- সেটিতেও ব্যর্থ। সারা ম্যাচেই তাকে বেশ ক্লান্ত মনে হয়েছে। তাই তাকে ১০৫ মিনিটে তুলে নেন কোচ স্টালে সোলবাকেন। ফলে অতিরিক্ত সময়ের শেষ ১৫ মিনিটে সাইড বেঞ্চে হতাশা নিয়েই বসে থাকতে হয়েছে। আর ম্যাচ শেষে এই কষ্ট হিমালয় পাহাড়সম ভারী মনে হয়েছিল তার কাছে। কারণ ততক্ষণে তার অনুপস্থিতিতে দল যে হেরে বিদায় নিয়েছে এবারের বিশ্বকাপ থেকে। এতে তার গোল্ডেন বুট জেতার আশায় যেমন সমাপ্তি তেমনি দলেও চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্নে ইতি।
নওরোজিয়ানদের বিপক্ষে শুরু থেকেই আধিপত্য বিস্তার করে খেলতে থাকে ইংল্যান্ড। ১৯ মিনিটে হ্যারি কেন ও বেলিংহাম মিলে বলের সাথে মাথার সংযোগ ঘটাতে ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে এগিয়ে যাওয়া থেকে বঞ্চিত ২০১৮ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালিস্টরা। ২৩ মিনিটে নরি মাদুয়েকের ক্রসে পোস্টে আলতো টোকা দিয়েছিলেন নিক ও’রেইলে। বল অবশ্য বিপদ ঘটানোর আগেই ক্লিয়ার করেন বিপক্ষ ডিফেন্ডার। ১৯ মিনিটে হ্যারি কেনের ফ্রি-কিক বার উঁচিয়ে যায়। ৩৬ মিনিটে হলান্ডের হেডের গন্তব্য ছিল ইংলিশ কিপার পিকফোর্ডের সোজা।
এর পরও বলতে গেলে খেলার ধারার বিপরীতে গোল পেয়ে যায় নরওয়ে। ৩৭ মিনিটে আন্দ্রেস সেজেলদেরুপ ক্রসটি করেছিলেন ছোট বক্সের ভেতরে থাকা হলান্ডের উদ্দেশ্যে। সেই বল কেটে গিয়ে ইংল্যান্ডের পোস্টে লেগে জালে জড়ায়। এরপর চলতে থাকে নরওয়ের দাপট। ৩৯ ও ৪০ মিনিটে তাদের আরো দু’টি প্রচেষ্টা নষ্ট হয়। আলেকজান্ডার সরলথের ভলি বার ঘেঁষে যাওয়ার পরের মিনিটেই মার্টিন ওডেগার্ডের শট রুখে দেন পিকফোর্ড।
৪৪ মিনিটে দারুণ এক কাউন্টার অ্যাটাক থেকে স্কোর ২-০ করার দারুণ সুযোগ পেয়েছিল নরওয়ে। কিন্তু সরলথের স্বার্থপরতায় গোলটি হয়নি। কাউন্টার অ্যাটাক থেকে বল পেয়ে বিপক্ষ সীমানায় ঢুকে পড়েন সরলথ। পাশে হলান্ড। তার সামনে একজন ইংলিশ ডিফেন্ডার। কিন্তু তিনি মুহূর্তেই হলান্ডকে পাস না দিয়ে বিলম্ব করেন। এতে ইংলিশ ডিফেন্ডাররা গুছিয়ে নেন। এর পরপরই ইংল্যান্ডের সমতাসূচক গোল। প্রথমার্ধের ইনজুরি টাইমের দ্বিতীয় মিনিটে এই গোল। অ্যান্থনি গর্ডনের কাছ থেকে বল পেয়ে দুই ডিফেন্ডারকে পরাস্ত করে বাম পায়ের প্লেসিং শটে বল জালে পাঠান বেলিংহাম।
বিরতির পরও চলতে থাকে দুই দলের গোল চেষ্টা। ৫৩ মিনিটে হলান্ডের হেড কর্নার করেন বিপক্ষ কিপার। ৫৪ মিনিটে নরওয়ে তরবোজন হেগান গোল করলেও ওই কর্নারের সময় হলান্ড দুই হাতে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন ইংল্যান্ডের ডেকলান রাইসকে। ফলে ওই সময়ে হওয়া গোল ভিডিও দেখে বাতিল করে দেন রেফারি। ৭৫ মিনিটে নরওয়ের মোলার ওলফের হেড ক্রসবারে প্রতিহত হয়। এরপর গোলরক্ষক নাইল্যান্ড দুই দফা সেভ করেন। ৮৫ মিনিটে নরওয়েকে ফের লিড এনে দিতে পারেননি এন্থনিও নুসা । তার শট ঠেকিয়ে দেন ইংলিশ কিপার পিকফোর্ড।
এর পর খেলা গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। তখনই ৯৩ মিনিটে ফের বেলিংহামের গোল। আর তা ছিল গোলরক্ষক নেইল্যান্ডের ভুলের খেসারতে। বক্সের বাইরে থেকে এবেরেচি এজের শট গোলরক্ষক নেইলান্ডের হাত ফসকে বেরিয়ে যায়। সেই বল সামনে পড়লে বেলিংহাম ছুটে গিয়ে তা জালে পাঠান। এতে এবারের বিশ্বকাপে ছয় গোলের মালিক হলেন তিনি। এর ফলে এই প্রথম ইংলান্ডের হয়ে এক ম্যাচে দুই গোল করা তার। ম্যাচের ১০০ মিনিটে রেফারি পেনাল্টি দেন ইংল্যান্ডের পক্ষে। পরে অবশ্য ভিডিও দেখে তা বাতিল করা হয়। এতে নরওয়ে লড়াইয়ে ফেরার শক্তি পায়। তবে ম্যাচে আর ফেরা হয়নি। এর মধ্যে ১০৯ মিনিটে নরওয়ের গোলরক্ষকের দুই দফা প্রতিরোধে গোলের হাত থেকে রক্ষা। শেষ পর্যন্ত নওরোজিয়ানরা সমতা আনতে ব্যর্থ হলে বিশ্বকাপের সেমিতে খেলার স্বপ্ন বিসর্জনই দিতে হলো নরওয়েকে। আর চতুর্থবারের মতো বিশ্বকাপের সেমিতে ইংল্যান্ড।



